ইন্দিরা নয়, শর্মার চলে যাবার বেদনা সঞ্জয়ের সকালের মেজাজ তৈরি করে দিল। জীবনের। প্রচণ্ডতম সত্যের মুখোমুখি হল। চলে যায়! আজ যে আছে কাল সে থাকবে না। সময়ে সবকিছু ভাসমান। ইন্দিরার সঙ্গে তার দেখা হোক না হোক, ছাদে একসঙ্গে কিছুক্ষণ কাটাবার মুহূর্ত স্মৃতি হয়ে রইল সঞ্জয়ের কাছে। সে যেখানেই থাকুক না কেন, ইন্দিরা আরও বড় হবে। তার জীবনের ধারা পালটাবে। বিয়ে হবে। সন্তানের জননী হবে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে জীবনের পরিণতির দিকে এগিয়ে চলবে। যৌবনের শক্তিতে সে সবকিছু ভুলে যাবে, অস্বীকার করবে, তারপর বয়সের কোনও এক সময়ে যখন পিছনে তাকাবার সময় আসবে তখন হয়তো স্মৃতির পর্দায় হঠাৎ কোনও পুরোনো মুখ ভেসে উঠবে।
* * *
মিউজিয়ামের সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পর প্রকাশ এলেন স্কুটারে। গণেশ পুজো সারতে দেরি হয়ে গেছে। অজস্রবার ক্ষমা চাইলেন। চলুন, আপনি অটোরিক্সায় উঠুন, আমি স্কুটারে অনুসরণ করি। গোলকুণ্ডা এস রোড। ঠিকানাটা কী?
প্রকাশ, শুনুন আমি আর ইন্দিরার কাছে যাব না। আপনার যদি সময় থাকে চলুন একসঙ্গে কয়েকটা জায়গা ঘুরি—চারমিনার, সালার জং, ওসমান সাগর, গোলকুণ্ডা ফোর্ট।
যাবেন না কেন?
ছেলেমানুষির বয়স গেছে প্রকাশ। কী হবে এক তরুণীর মনের খবর নিয়ে, এই প্রৌঢ় বয়সে। বরং শর্মা স্টেশনে আছে। চলুন ওকে ধরে তিনজনে দিনটা নিজেদের খেয়ালখুশিতে ভরে দিই।
প্রকাশ একটু অবাক হলেও, রাজি হলেন।
তা হলে লাঞ্চ করতে হবে আমাদের বাড়িতে।
শর্মাকে স্টেশনে ধরা গেল। ইউসুফনগরে প্রকাশের বাড়ি লাঞ্চ। সারাদিন প্রচণ্ড রোদে ঘোরা, অবশেষে অপরিসীম ক্লান্তি নিয়ে বিকেলে ফিরে আসা। শর্মার ট্রেন সাতটায়। আমির গেট থেকে প্রকাশ বিদায় নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, আর হয়তো দেখা হবে না।
* * *
শৰ্মাদু-হাতে সঞ্জয়কে জড়িয়ে ধরে যাওয়ার আগে বলে গেলেন—একটা রাত দেখতে দেখতে কেটে যাবে। কাল অন্ধকার ভোরে আপনিও বাড়িমুখো। এখানে পড়ে থাকল আমাদের এই কটা দিন। ভবিষ্যতে দেখা হবে, যোগাযোগ থাকবে এমন আশা করি না। বিদায় বন্ধু!
বাংলোর পিছন দিকের দরজাটা, যেটা কমই খোলা হত, অথচ যেটা খুললে ফাঁকা মাঠ, কোয়ারি, ফৌজি সীমানা দেখা যায়, সেই দরজাটা খুলে, পড়ন্ত বেলার আকাশের দিকে তাকিয়ে সঞ্জয় সন্ধেটা কাটিয়ে দিল। গণেশ পুজোর মাইকে দক্ষিণী গান ভেসে আসছে।
রাতভোরে বেরোতে হবে বলে সঞ্জয় প্রায় সব জিনিসই গুছিয়ে নিল সুটকেসে। শর্মার ওয়ার্ডরোবটা খুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সারি সারি জামপ্যান্ট ঝুলত। তলার তাকে রাখত সাবান, সেভিং সেট, মাথার তেল, চিকি সুপুরির কৌটো। সাবান মোড়া কাগজটা খালি। পড়ে আছে। কাগজটা হাতে নিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করল—শর্মা নামক কোনও ব্যক্তি এক সময় এই ঘরে অধিবাসী ছিলেন।
শর্মার টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে দেখল, শর্মার কোনও স্মৃতি যদি পড়ে থাকে। না কিছু পড়ে নেই। দুটো বাসের টিকিট পড়ে আছে—আবদিস থেকে আমির গেট। টিকিট দুটো সঞ্জয় পকেটে রেখে দিল।
* * *
রাতে ডাইনিং হল প্রায় খালি। সেখানের সবাই প্রায় চলে গেছেন। সঞ্জয়ের আহারে তেমন রুচি ছিল না। একলা একটা টেবিলে কোনওরকমে কিছু খেয়ে নিল। অন্যদিন মিষ্টির ডিস শর্মা নিয়ে আসতেন। সঞ্জয় মিষ্টি খেল না। এই প্রতিষ্ঠানে এই তার শেষ আহার।
মেঘলা আকাশ থমকে আছে মাথার ওপরে। সাদা পিচের রাস্তা একটা মোচড় মেরে সোজা
এগিয়ে গেছে তাদের ছোট ছোট কটেজের দিকে। ওয়ার্ডেনের অফিসের ছাদের ওপর লতিয়ে লতিয়ে উঠে গেছে টিকোমা জেসমিন। থোকা থোকা সাদা সাদা ফুল ঝুলছে। দেয়ালে চিঠি ফেলার লেটার বক্স।
সঞ্জয় ধীরে ধীরে হাঁটছে। বড় শান্ত চারপাশ। কেন যেন কানে সে চুড়ির শব্দ পাচ্ছে। কাচের চুড়ি। চোখের সামনে উড়ছে নীল শাড়ির আঁচল। আজকের দিনটা তার অন্যরকম হতে পারত! ইন্দিরা, রূপা আর সে তিনজনে চারমিনারের উঁচু মিনারে। সালারজং মিউজিয়ামে, গোলকুণ্ডা ফোর্টে! পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ। কথা, গান, ধোসা, কফি। কত কী হতে পারত! রূপা বলেছিল তার খুব ড্রাগস খেতে ইচ্ছে করে। শুনেছে, কলকাতার কলেজের ছেলেমেয়েরা নাকি স্বপ্নের জগতে চলে যায়। সে নাকি এক অদ্ভুত অনুভূতি। রূপা এমনই এক ছেলেমানুষ।
একটা বই, হঠাৎ যেন তার মলাট দুটো বন্ধ হয়ে গেল। অনেক দূর এগোতে পারত এই কাহিনি। কত রাত, কত গান, কত কথা। রয়ে গেল দুই মলাটের ভেতরে। রইল। হয়তো আবার খোলা। হবে কোনওদিন। আবার না-ও হতে পারে।
এক্সপ্রেস ছেড়ে গেল হায়দ্রাবাদ স্টেশন থেকে। ভীষণ তার গতি। নায়কের শেষ চরিত্র ক্রমশই চলেছে দূর থেকে দূরে—জীবনের আর এক ঠিকানায়।
জলছবি
আমরা তখন সকলে সবিস্ময়ে সেই উঁচু ঢিবির দিকে তাকিয়ে রইলুম। দিগন্তে তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। সারা আকাশ তামাটে লাল। সেই সূর্য্যাস্তের দিকে মুখ করে ওরা দুজনে বসে আছে। মেয়েটির মাথা রয়েছে ছেলেটির কাঁধে। ছেলেটির হাত মেয়েটির কোমর জড়িয়ে রয়েছে। আমরা যারা ছুটি কাটাবার জন্যে সেই প্রান্তরে সমবেত হয়েছিলাম, কাঁধে জলের ফ্লাস্ক, হাতে খাবারের বাস্কেট নিয়ে, তারা এই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যথেষ্ট রোমান্টিক অথচ একেবারে নির্লজ্জ সেই দৃশ্য দেখে মুখে ছিঃ ছিঃ করলেও মনে মনে বেশ উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। আমরা অনেকেই সে মুহূর্তে কল্পনায়, ছেলেটিকে মেয়েটির পাশ থেকে সরিয়ে নিজেদের পাশে বসাবার চেষ্টা করছিলাম।
