* * *
শর্মা, প্রকাশ আর সঞ্জয়, আঠারো এবং উনিশনম্বর ঘরের আবাসিক তিনজন, পড়ন্ত বেলার, আকাশ পাহাড় আর গাছের সারিকে সামনে রেখে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল। সকলেই কিছু বিষণ্ণ। কয়েকটা দিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া ছাত্রজীবন আবার ফিরে পাওয়া গিয়েছিল। প্রাত্যহিক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে এই মেলামেশা, ভাবনাশূন্য, চিন্তাশূন্য, অর্থনৈতিক মর্যাদাশূন্য বিদ্যাপীঠের অধ্যয়নং তপঃ জীবনের এইবার অবসান। আবার ফিরে চলো যে যেখানে ছিলে সেইখানে। যেসব ইউনিফর্ম, যেসব খোলস খুলে রেখে এসেছিলে আবার তার মধ্যে প্রবেশ করো।
শর্মা বললেন, অনেকে আজকেই চলে যাচ্ছেন। আমি রিজার্ভেশান পেলাম না। পেলে আজই চলে যেতে পারতুম। সেই কাল সন্ধে অবধি অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
আমি আজই চলে যাচ্ছি, একটু পরেই গাড়ি আসবে, যতক্ষণ না আসে, বসে বসে গল্প করি। প্রকাশ এগিয়ে গিয়ে একটা গাছের তলায় বাঁধানো বেদিতে বসলেন। শর্মা ও সঞ্জয়ও বসলেন।
প্রকাশ হাসতে হাসতে বললেন,
সঞ্জয় বোধ হয় হায়দ্রাবাদেই থেকে যাবে। হৃদয় ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। সঞ্জয়ের হৃদয় থাকবে এখানে, শরীর থাকবে কলকাতায়, তা কী করে সম্ভব!
কখনওই তা সম্ভব নয়। এটা হল হৃদয় চুরির কেস। স্টোরি অফ এ মিসিং হার্ট। শর্মা সমর্থন করলেন প্রকাশকে।
আপনি একটা হোপলেস, কিছুই করতে পারলেন না, আর চুপচাপ উদাসীন মানুষটি নগর জয় করে নিল। হিরো অফ দি সিন।
সঞ্জয় চুপ করে থাকা ঠিক নয় বলেই যেন বলল, এর মধ্যে জয়-পরাজয়ের কথা আসে কী করে। আমি জয় করতে আসিনি, পরাজিত হতেও আসিনি।
শর্মা কিন্তু বেশ গায়ে মাখার মতো করেই বললেন, আমি পরাজিত। শুধু পরাজিতই নই, আহতও।
আহত কেন? সঞ্জয় অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
ইন্দিরা আমাকে অপমান করেছে। অভদ্র ব্যবহার করেছে।
সঞ্জয় খুব অবাক হয়ে গেল, অভদ্র ব্যবহার করার মতো মেয়ে তো ইন্দিরা নয়। যথেষ্ট ভদ্র, মার্জিত, সংস্কৃতিবান।
আপনার এখন সেই রকমই মনে হবে। প্রেমে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।
প্রেমের কথা আসছে কী করে! আমরা কয়েকজন মধ্যবয়সি মানুষ। সংসারী। এখানে লেখাপড়া করতে এসেছি। কাফলাভের বয়স কুড়ি বছর পিছনে ফেলে এসেছি। এখন আর প্রেম হবে না। হবার উপায় নেই। এ হল ভালো লাগার ব্যাপার।
সঞ্জয় আপনি ভুল বলছেন। প্রেমের কোনও বয়স নেই, পরিবেশ নেই, জাতি নেই, ধর্মও নেই।
হতে পারে তবে এখানে আমরা কেউই অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা লুটে নিয়ে যাবার জন্যে আসিনি ভাই।
রাজকন্যা যদি ঘাড়ে চেপে বসে তখন তাকে ঘাড় থেকে নামাবার ক্ষমতা ক-জন রাখে! প্রকাশ হঠাৎ তালি বাজিয়ে ব্র্যাভো ব্র্যাভো করে উঠল। শর্মার কথা ভালো লেগেছে।
লাঞ্চের পর ইন্দিরা আমাকে একটু সময় দেবে বলেছিল। সে তার অঙ্গীকার রাখেনি। বরং সে তখন আপনাকে ছাদে নিয়ে গেছে। আমি যখন জোর করে ছাদে গিয়ে উঠেছি, সে অভদ্রের মতো নেমে এসেছে। আমার সেন্টিমেন্টের কোনও মূল্য দেয়নি। একে আপনি কী বলবেন?
সঞ্জয় শর্মাকে শান্ত করার জন্যে বলল, আই অ্যাম সরি। আমি জানতুম না ইন্দিরার সঙ্গে আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। জানলে অবশ্যই আমি ছাদে যেতুম না।
আপনি বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধে অপরাধী। উদাসীনতার মুখোশ পরে তলে তলে ঘনিষ্ঠ হবার কসরত চালিয়েছেন। অথচ প্রথম থেকে আমরা তিনজনে একটি ইউনিটের মতো হয়ে উঠেছিলুম। ডিনার টেবিলে পাশাপাশি বসেছি, পাশাপাশি বিছানায় শুয়েছি, ছুটির পরে বেড়াতে বেরিয়েছি। হঠাৎ আপনি আলাদা হয়ে গেলেন।
শর্মার অভিযোগে সঞ্জয় স্তম্ভিত হয়ে গেল। প্রকৃত এত সব সে ভাবেনি! এই দুজন মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়ার খবর সে রাখেনি। সমস্ত জিনিসটাই তার কাছে ছিল একটা খেলার মতো।
***
দুরের গেট দিয়ে একটা সাদা স্টেশন ওয়াগন ঢুকতে দেখা গেল। প্রকাশ উঠে দাঁড়ালেন, আমার গাড়ি এসে গেছে। ঘর থেকে সুটকেসটা বের করে আনিয়ে তিনজনেই প্রকাশের ঘরের দিকে চললেন। প্রকাশ প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে থাকেন। শহরের এক প্রান্তে স্থানীয় সরকারি অফিসে চাকরি করেন। স্থানীয় মানুষ প্রকাশের জিনিসপত্র কিছুই নেই। একটি ব্রিফকেস একটি। পাউডারের কৌটো। নিয়মমাফিক বাংলো তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। প্রকাশ কিন্তু রাত্রিবাস করত বাড়িতে।
প্রকাশ গাড়িতে ওঠার সময় বললেন, শহর পর্যন্ত লিফট দিতে পারি। চলে যাবার আগে আপনাদের যদি কিছু কেনাকাটার থাকে করে নিতে পারেন। শর্মার রিজার্ভেশনের জন্যে স্টেশনে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। সঞ্জয়ের প্রয়োজন ছিল বাড়ির জন্যে সামান্য কিছু কেনাকাটার। দুজনেই গাড়িতে উঠলেন। শৰ্মা গম্ভীর প্রকাশ কিন্তু স্বাভাবিক। গাড়ি ইনস্টিটিউটের গেট ছাড়ানো মাত্রই প্রকাশ তাঁর কদিনের ছাত্রজীবন, ইন্দিরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, আলাপ-পরিচয় করা নিয়ে পারস্পরিক রেষারেষি সব যেন ভুলে গেলেন। ওই দরজার ওপাশে রইল পড়ে জীবনের কটা দিন, কিছু চপলতা, ফিরে পাওয়া ছাত্রজীবনের স্মৃতি। সঞ্জয়ের প্রতি প্রকাশের বিদ্বেষ নেই, প্রতিযোগিতার ভাব নেই। আছে দুজন বয়স্ক মানুষের পারস্পরিক পরিচয়, ভদ্রতা, বন্ধুত্ব। শর্মা কিন্তু তখনও আহত মন নিয়ে বসে আছেন।
শহরে পৌঁছে শর্মা আলাদা হয়ে গেলেন। সঞ্জয় ভেবেছিল, প্রকাশ চলে যাবেন। সে আর শর্মা। অনেক রাত পর্যন্ত শহরে ঘুরবে। তারপর একসঙ্গে ফিরে আসবে হস্টেলে। শর্মা কিন্তু ইচ্ছে। করেই সঞ্জয়কে এড়িয়ে গেলেন। সঞ্জয় প্রথমে একটু বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল। রাতের হায়দ্রাবাদ তার কাছে নিতান্তই অপরিচিত। অপরিচিতের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার মধ্যে আনন্দ নেই বরং ভীতি আছে। ফেরার বাস সবসময় পাওয়া যায় না। অন্তত ঘণ্টা দুয়েক তাকে অপেক্ষা করে থাকতে হবে ফিরে যাওয়ার জন্যে।
