আসলে একটা কেয়ারি সঞ্জয় যেন জোরে স্বগতোক্তি করল।
ইন্দিরা অবাক হয়ে বলল, হ্যাঁ ওটা কোয়ারিই তো। কেন?
না আমি ভেবেছিলুম। সঞ্জয় প্রাণখোলা হাসি হেসে, এলোমেলো চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে কথাটা মাঝপথেই অসম্পূর্ণ রাখল।
বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা? ইন্দিরা একটু অভিমানীর গলায় বলল।
বিশ্বাস হবে না কেন? আমি ভাবতুম, সঞ্জয় তার কল্পনার কথা আরও কাল্পনিক করে ইন্দিরাকে শোনাল।
বাঃ, আপনি একজন কবি। আপনি কবিতা লেখেন না?
লিখি না তবে ভাবি লিখব। আপনি লেখেন না?
ইন্দিরা মৃদু হেসে সুদূরে চোখ রেখে সলজ্জভাবে বললেন, হ্যাঁ আমি লিখি। বিষ্ণুও লেখেন। খুব ভালো কবিতা লেখেন।
হায়দ্রাবাদ বড় সুন্দর শহর।
ঘুরে দেখেছেন?
দেখব কখন? সবসময় ক্লাস। তা ছাড়া আমি কিছুই চিনি না। একলা একলা কোথায় হারিয়ে যাব!
সঞ্জয়ের এই কথার মধ্যে কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আন্তরিকভাবেই বলেছিল। অযথা পৌরুষ দেখাবার জন্য বলতেই পারত-হাতে আর একটা দিন সময় আছে বা সম্পূর্ণ একটি ছুটি আছে, সকাল থেকে সন্ধে সে একাই ঘুরে বেড়াবে সারা শহরে।
ইন্দিরা খুব আস্তে করে বলল, কাল সকালে আমাদের গোলকুণ্ডা রোডের বাড়িতে চলে আসুন না—আমি, রূপা, আর আপনি তিনজনে সারাদিন যে কটা দর্শনীয় জায়গা পারি ঘুরে ঘুরে দেখব।
সঞ্জয় এতটা ঠিক আশা করেনি। দূর থেকে মানুষ এতটা সহজে কাছাকাছি চলে আসতে পারে, তার ধারণা ছিল না। শর্মা আর প্রকাশ যখন ইন্দিরার কাছাকাছি আসার জন্য প্রতিযোগিতা করছিল তখন তার ইচ্ছে হয়েছিল নারীর হৃদয়ে প্রবেশ করার শক্তিটা একবার যাচাই করে নেবে। শর্মা তার চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যবান, সুন্দর, সুসজ্জিত। প্রকাশ যথেষ্ট মার্জিত এবং ব্যক্তিত্বে আদরণীয়। এমনকী কোনও কোনও সময় তার মনে হয়েছে অধ্যাপক বিষ্ণুরও ইন্দিরা সম্পর্কে কিছু দুর্বলতা আছে। পুরুষ এবং নারীর মন নিয়ে সেই চিরন্তন খেলা। যে খেলায় মানুষ জয়ের আশা না নিয়েই খেলতে নামে, সে খেলায় মানুষ বোধ হয় এমনি সহজেই বিজয়ী হয়।
সঞ্জয় অনেকক্ষণ ইন্দিরার কাজল আঁকা চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কৃতজ্ঞতা জানাবে, না তার হাত দুটো বুকের কাছে ধরে বলবে, তুমি আমার বিশ্বাসের প্রতিবিশ্বাস, তুমি আমার শক্তির প্রতিশক্তি, আমার ভরসার ভরসা, ভেবে পেল না। মেঘলা আকাশের নীচে চারিদিকে অসমতল ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যের মাঝে দাঁড়িয়ে দুজনে দুজনের চোখে চোখ রেখে ভাষাতীত স্বাচ্ছন্দ্য বিনিময়ের সুযোগ করে নিল।
সেই ভালো, আপনারা আমার সঙ্গে এই অচেনা শহরে থাকলে আমি আর হারিয়ে যাব না। সঞ্জয় মৃদু হেসে আমন্ত্রণ গ্রহণ করল।
আপনার সম্পর্কে আমার চেয়েও রূপার কৌতূহল বেশি।
রূপা ইন্দিরার সহকর্মী। রূপাকে দূর থেকে সঞ্জয় এ ক-দিনে বার কয়েক দেখেছে। ইন্দিরার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিকা। দুজনের দুরকম ব্যক্তিত্ব। সেই রূপার কৌতূহল অনেক বেশি! কৌতূহলী হয়ে ওঠবার মতো কী এমন আছে সঞ্জয়ের চরিত্রে। মহিলার চোখে কোনও পুরুষ যে কখন কী মর্যাদা পেয়ে যায়! তাদের চোখে হঠাৎ কেউ রাজা হঠাৎ কেউ প্রজা। এই নায়ক, এই আবার ভিলেন।
রূপা বলছিল বাংলা শিখে সে আপনার সমস্ত লেখা পড়বে। আপনার জীবনদর্শনের সে ভক্ত হয়ে পড়েছে।
কী করে? আমার কথা তো তাকে আমি কিছু বলিনি।
আমি বলেছি। এতদিন ক্লাসে আপনি যেভাবে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন, সব আমি রূপাকে বলেছি। ইন্দিরা মাথা নীচু করল আর সেইভাবেই বলল, আপনি একটি আকর্ষণীয় চরিত্র। কালকে আপনাকে তাই আমরা কাছে পেতে চাই।
সঞ্জয়ের খুবই ইচ্ছে করছিল ইন্দিরার আনত মুখের চিবুকটা ধরে উঁচু করে তুলে মনের সমস্ত অনুরাগ উজাড় করে ঢেলে দিয়ে বলে, তোমাকে আমার জীবনে খুব পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তা কী করে সম্ভব! ইন্দিরা যদি হঠাৎ বলেও ফেলে, আমার আপত্তি নেই, সঞ্জয়ের পক্ষে নতুন করে জীবনের আর একটি অধ্যায় খুলে ফেলা সম্ভব হবে না। প্রবাহের পথে ভাসতে ভাসতে, ঢেউয়ের ধাক্কায় তটভূমিতে সাময়িকভাবে কোনও তমাল কুঞ্জে আশ্রয় মিলতে পারে, কিন্তু স্থায়ী জীবন সেখানে শুরু করা যায় না। স্রোতের উজানে যাকে ভাসতে হবে প্রতিটি মুহূর্তের অনুভূতি তার। কাছে বিভিন্ন।
নিভৃতে আরও কিছু ঘটার আগে শৰ্মা ছাদে উঠে এলেন। ভালো জিনিস স্বার্থপরের মতো একা একা উপভোগ করা ঠিক হচ্ছে কি? আমাকেও তো একটু অংশ দেওয়া যায়। শর্মা হাসতে হাসতে বললেন।
সঞ্জয় বলল, আসুন না। সুউচ্চ ছাদে দাঁড়িয়ে হায়দ্রাবাদ দর্শন। পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন শ্রীমতি ইন্দিরা। ইন্দিরা একটু ভদ্রতার হাসি হাসলেন কিন্তু শর্মাকে দৃশ্য পরিচিতি দিতে তেমন উৎসাহ দেখালেন না। বরং বললেন, অনেকক্ষণ উপরে এসেছি চলুন, এবার যাওয়া যাক, বিষ্ণু আপনাকে ডেকেছিলেন না!
২.
ভ্যালিডিকটারি ফাংশান শেষ হয়ে গেল। অধ্যক্ষ দু-চার কথায় তাঁর ভাষণ শেষ করলেন। সার্টিফিকেট বিতরণ শেষ হল। ছাত্ররা দু-চার কথা বললেন। হলের বাইরে এসে সবাই দাঁড়ালেন। সূর্য্যাস্তের আকাশে ঘরে ফেরা পাখির দল। বিষ্ণু সঞ্জয়ের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করে বললেন, সঞ্জয় আই উইল মিস ইউ লাইক এনেথিং। ইন্দিরা গাম্ভীর্যের আড়ালে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। যাবার আগে কানে কানে বলে গেলেন, কাল সকালে।
