সঞ্জয় এসেছে সুদূর কলকাতা থেকে হায়দ্রাবাদের এই ইনস্টিটিউটে ট্রেনিং নিতে। ইন্দিরা তার সহপাঠী। নিজামের আমলের বিশাল বাগানবাড়িতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আবাসিক। কোর্সের আজই শেষ দিন। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হবে—শিক্ষান্তিক সমাবেশে অধ্যক্ষ সার্টিফিকেট বিতরণ করে পাঠ্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। ছাত্রছাত্রীদের একটি মিলনোৎসব হবে। এর পরই বিদায় নেওয়ার পালা। এইসব অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে একটু সময় পাওয়া গেছে। একটু আগে ডাইনিং হলে বিদায়ী ছাত্রছাত্রীরা বিশেষ লাঞ্চ শেষ করেছেন। ইন্দিরা সঞ্জয়কে নিজে হাতে মিষ্টির ডিশ পরিবেশন করেছেন। কোর্স ডিরেকটার বিষ্ণু তখন পাশেই ছিলেন। মৃদু হেসে ইন্দিরাকে যেন সাবধানের সুরে বলেছিলেন, ডোন্ট প্যামপার সঞ্জয়।
ইন্দিরা উত্তরে মাথা দুলিয়ে হেসেছিল। চুলে বাঁধা ফুলের ঝুমকো দুলে উঠেছিল। বিরিয়ানি প্রভৃতি সুখাদ্যের গন্ধকে ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ফুলের গন্ধ। ফরসা টুকটুকে মুখ একটু লাল হয়েছিল কি? কপালে চাঁদের মতো গোল টিপ কি একটু কেঁপে উঠেছিল? আহার শেষে ছোট্ট একটু উগার তুলে সঞ্জয় বলেছিল—এইবার আমরা কী করব?
শর্মা বলেছিল, ঘণ্টা দুয়েক সময় হাতে আছে, আমরা একটু হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিতে পারি। শর্মা এসেছেন ইন্দোর থেকে। শর্মা আর সঞ্জয় একই ঘরে থাকছেন। পাশের ঘরে প্রকাশ। প্রকাশ বলেছিলেন,
সঞ্জয় এখন বিশ্রাম করার মুডে নেই। সঞ্জয় অন্য কিছু করার কথা ভাবছেন। শর্মা হো হো করে হেসে উঠলেন। তাহলে সঞ্জয়কে আমরা আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নিতে পারি।
অন্য কিছুটা কী, শিকার-টিকার নাকি এখানে তো ওয়াইল্ড লাইফ নেই।
কিন্তু অনেক রকম পাখি আছে। শর্মার কথার জের টেনে প্রকাশ বলেছিলেন, দুপুরটা পাখি দেখে কাটানো ভালো। বিশেষত এমন সুন্দর মেঘলা দিনে। হালকা মেঘের ভেলা ভাসছে আকাশের নীল গাঙে।
সঞ্জয় না বোঝার ভান করে বলেছিল,
এত কিছু করার থাকতে পাখি দেখার কথা আসছে কী করে?
পাখি যখন মানুষকে দেখে, মানুষ তখন পাখি দেখতে বাধ্য হয়।
ডাইনিং হলের সামনে ছোট্ট গোলাপ বাগান! সঞ্জয় গোলাপ বাগানের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে। রইল। শর্মা আর প্রকাশদুজনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলেন। সঞ্জয় বিশেষ কিছু ভাবছিল না। একটিমাত্র লাল গোলাপ ফুটে আছে, মেঘলা আকাশের নীচে। মেটে সিঁদুরের মতো রং। মানুষের মনে বিশেষ কোনও কোনও মুহূর্তে কোনও চিন্তাই স্থান পেতে চায় না। চিন্তাহীন। শূন্যতায় মন স্থির হয়ে থাকে। অধ্যাপক বিষ্ণু তাঁর অফিসের দিকে যেতে যেতে সঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে বলে গেলেন,
প্রকৃতি দর্শন শেষ হলে আমার ঘরে এসো, কিছু কাজের কথা হবে। পর মুহূর্তেই ইন্দিরা পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সঞ্জয় কিছু একটা বলা উচিত বলেই বলেছিল—রোজ ইজ এ রোজ ইজ এ রোজ।
আপনি গোলাপ ভালোবাসেন?
সঞ্জয় খুশি করার জন্যে বলেছিল,
গোলাপ কে না ভালোবাসে?
ফুল কিন্তু অনেকে ভালোবাসে না।
দেন দে আর ফুলস। সঞ্জয়ের কথার মোচড়ে ইন্দিরা ছেলেমানুষের মতো হেসে উঠল। আপনি কিন্তু ফুল ভালোবাসেন। আপনার চুলের ফুলের মালা আপনার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।
সব মেয়েই নিজের সৌন্দর্যের প্রশংসায় একটু লাজুক লাজুক হয়ে যায়। ইন্দিরা মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, চলুন ওই অফিসবাড়ির ছাদে গিয়ে দাঁড়াই। অনেকটা উঁচু থেকে চারপাশ ভালো দেখা যায়।
সঞ্জয় এইরকম একটা আমন্ত্রণের জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। ক্লাসে ইন্দিরাকে সে লক্ষ করেছে। তার চালচলনে, আড়ষ্টতাবর্জিত কথাবার্তায়, যুক্তিতর্কের ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছে, প্রশংসা করেছে। ঘনিষ্ঠ হওয়ার মানসিক ইচ্ছাকে ভদ্রতার লাগাম পরিয়ে বাধ্য রেখেছে। ইন্দিরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার জন্যে শর্মা আর প্রকাশের পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় মজা পেয়েছে। সে দূরেই। থাকতে চেয়েছে। মানুষের সমস্ত ভালো লাগাকে আশকারা দিতে নেই, এ শিক্ষা তার জীবন। থেকে নেওয়া। সব পথই যেমন একই মন্দিরে পৌঁছে দেয় না, সব জীবনই তেমনি সব জীবনে স্থান পায় না। ইন্দিরার হঠাৎ আমন্ত্রণে সঞ্জয় উল্লসিত হয়েছিল। বিশাল একটি দুর্গ দখলের পর সৈনিকদের যেমন আনন্দ হয় সেই রকম আনন্দের অনুভূতিতে পুলকিত হয়েছিল।
সম্পূর্ণ পাথরে তৈরি বিশাল বাড়ি। একদা কোনও নবাবের বাগানবাড়ি ছিল। বিশাল চওড়া সিঁড়ি ঘুরে দূরে দিকদৌড় ছাদে গিয়ে উঠেছে। ইন্দিরা অনেকটা পথপ্রদর্শক গাইডের মতো আগে। আগে উঠছিল, পেছনে সঞ্জয়। হালকা শরীরে জড়ানো নীল শাড়ি। এলোচুলে সাদা ফুলের মালা দুলছে। সিঁড়ির ওপরের ধাপে একটু জল পড়েছিল। ইন্দিরা পা রেখেই পিছলে পড়ে যাবার মতো হয়েছিল। সঞ্জয় কোমরে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ইন্দিরার পতন সামলে নিয়েছিল। ইন্দিরার মাথা সঞ্জয়ের বুকে। সঞ্জয়ের নাক ইন্দিরার চুলে। যে সান্নিধ্য স্বাভাবিকভাবে সম্ভব ছিল না অদৃশ্য বিধাতার নির্দেশে সামান্য একটা দুর্ঘটনায় তা পলকে সম্ভব হল। দুজনে পাশাপাশি ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। চারিদিকে দাক্ষিণাত্যের শিলাময় পাহাড়। পথ প্রসারিত এদিকে-ওদিকে। বাগান বাগিচা।
দেখছেন একটা লরি কীরকম ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে উঠেছে। ওখানে একটা কেয়ারি আছে। ভীষণ ভালো লাগে দেখতে। সারাদিন পাথরের সঙ্গে মানুষের লড়াই। মাঝে মাঝে ডিনামাইট দিয়ে। পাথর উড়িয়ে দেওয়া হয়। ইন্দিরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে কেয়ারির দিকে তাকিয়ে রইল। সঞ্জয় ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া শিলাভূমি কয়েকদিন থেকেই তার বাংলোর পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রভাতে দেখেছে। বড় বড় পাথরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পথ এগিয়ে গেছে। কল্পনায় মনে হত এই বুঝি কোনও অশ্বারোহী মধ্যযুগের ইতিহাসের পাতা থেকে দ্রুতগতিতে নেমে আসবে, কিংবা চম্বলের একদল দুর্ধর্ষ ডাকাত।
