মেজোমামা বললেন, ‘অ্যাদ্দিন ছিল ডাকসাইটে ডাক্তার, শেষ বয়েসে হয়ে গেল জেলে। কার। বরাতে কখন কী যে হয়ে যায়! তাও যদি দু-একটা মাছের মুড়ো পাতে দেখা যেত! এমন নিরামিষ বৈষ্ণব জেলে খুব কমই দেখা যায়!’
যে যাই বলুন, আমার ভীষণ মজা। দিন বেশ কাটছে। বড়মামাকে ওই জন্যই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। যখন যা মাথায় ঢোকে তখন তাই করে ফেলেন। কারুর পরোয়া করেন না। ঠিক আমার। মতো। লাটু ঘোরাব তো সারাদিন লাটুই ঘোরাব। অঙ্কে গোল্লা। দুটো দিক তো একসঙ্গে সামলানো যায় না। সেবার গুলিতে পেয়েছিল। ইতিহাসে কোনওরকমে টায়ে-টোয়ে তিরিশ। মেজোমামা রেজাল্ট দেখে ধেই-ধেই করে নাচতে লাগলেন। বড়মামা বললেন, ‘ব্যাটা আমার সাচ্চা ভাগনে।’ এবারের পরীক্ষায় কী হবে মা সরস্বতীই জানেন! বড়মামা যেভাবে নাচাচ্ছেন, আমি কী করব! গুরুজনের কথা কি অমান্য করা চলে! সকলে বলবে, বড় অবাধ্য! উঠোনের এক পাশে মামা-ভাগনে থেবড়ে বসে আছি। ভীষণ কেরামতি চলেছে। দু-পাউন্ড রুটি পিঁপড়ের ডিম দিয়ে চটকানো হয়ে গেছে। বিশু রান্নাঘরে কুঁড়ো আর খোল ভাজছে। গন্ধে বাড়ি ম-ম করছে। এক বোতল তাড়ি ভীষণ অসুবিধেয় ফেলেছে। গন্ধটা তেমন সুবিধের নয়। নারকেলের মালায় কেঁচো কিলবিল করছে। আস্ত একটা বোলতার চাক ডিমসুদ্ধ খবরের কাগজে শুয়ে আছে। কাগজটা মনে হয় আজকের। কারণ মেজোমামা অনেকক্ষণ দোতলায় ‘কাগজ কাগজ’ করে অস্থির হচ্ছেন। মেজাজ ক্রমশই চড়ছে। মাসিমা শান্ত করার চেষ্টা করছেন; বলছেন, ‘আজকাল কাগজ দিতে খুব দেরি করে। লোডশেডিং হয় তো।’
বড়মামা বলছেন, ‘আমার নাকে রুমালটা বেঁধে দে তো, তাড়ি ঢালব।’ বিশুদার কুঁড়োভাজা এসে গেছে। গন্ধে আমার জিভেই জল এসে যাচ্ছে, মাছের যে আজ কী অবস্থা হবে! মেজোমামা ঠিকই বলেন, ডাক্তারের ভিটামিনযুক্ত টোপ খেয়ে মাছেরা স্বাস্থ্যবান হচ্ছে, এর পর ডাক্তারকে আর মাছ ধরতে হবে না, মাছেরাই ডাক্তার ধরবে। তাড়িপর্ব শেষ হল। বিশুদা বাইরে থেকে এসে বললে, ‘একজন রুগি খুব হম্বিতম্বি করছেন, বলছেন, স্ত্রী মরো মরো, না গেলে ঠেঙাবে।’
বড়মামা বললেন, ‘ঠেঙাবে কী রে?’
‘হ্যাঁ বাবু, ঠেঙাতেও পারে। আজকাল রুগিরা ডাক্তারদের কথায় কথায় দ্যাখ-মার করছে।’ ‘কী
হবে বিশে! আমার তো আর দেরি করা চলে না। তুই বরং এক কাজ কর, আমার জামার। বুকপকেট থেকে দশটা টাকা নিয়ে ওকে দিয়ে বল, ভোলা ডাক্তারকে ধরে নিয়ে যেতে। আমার হার্ট-অ্যাটাক হয়েছে।’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।
‘আমার কী হয়েছে বিশু?
‘আজ্ঞে হার্ট অ্যাটাচ।’
‘গর্দভ, অ্যাটাচ নয়, অ্যাটাক।’
বিশু চলে যেতেই বড়মামা বললেন, ‘নে নে, তৈরি হয়ে নে। মাছের খাবার তো হল। এবার আমাদের সারাদিনের ব্যবস্থা। কুসি, কুসি।’
বড়মামা মাসিমার খোঁজে ভেতরে চলে গেলেন। ন’টার সাইরেন বাজতে না বাজতেই আমাদের যাত্রা শুরু হল।
বড়মামার মাথায় শোলার টুপি। কাঁধে বিলিতি ছিপ। সে ছিপ আবার ইচ্ছেমতো বড় ছোট করা যায়। মোটরবাইকে যাওয়া চলবে না। শব্দে রুগিরা টের পেয়ে যাবেন। ডাক্তার বেশ ভালোই আছে। সাইকেলই আমাদের বাহন। নিঃশব্দে পাড়া ছেড়ে একবার বড় রাস্তায় পড়তে পারলে। আমাদের আর পায় কে! বড়মামার সাইকেল চালানোর ভঙ্গি দেখলে মনে হবে, আমরা যেন কুখ্যাত আলকাট্রাজ জেল ভেঙে পলাতক দুই আসামী।।
পুকুর না বলে দিঘি বলাই ভালো। বলা নেই কওয়া নেই বড়মামা ইজারা নিয়ে বসে আছেন।। ফাঁকা মাঠের মাঝখানে বেওয়ারিশ পড়ে আছে। পাঁচিল-টাচিল দিয়ে কোনওদিনই ঘেরা যাবে না, এত বিশাল ব্যাপার। চারপাশে গাছপালা আছে। আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, তাল, খেজুর, সুপারি। মেজোমামা বলেছিলেন, ‘জমা নিচ্ছ নাও, তবে মাছ আর আমাদের চোখে দেখতে হবে না, পাবলিকেই ফাঁক করে দেবে!’
বড়মামা বলেছিলেন, ‘নিজের জন্যে তো অনেকদিন বাঁচা গেল, এবার না-হয় পরের জন্যে কিছুদিন বাঁচি।’
সাইকেল থেকে জিনিসপত্র নেমে এল। শতরঞ্জি, জলের ফ্লাস্ক, মাছের খাবার, আমাদের খাবার, এক জোড়া ছিপ, জল থেকে মাছ তোলার জাল, একটা রংবেরঙের ছাতা, মোটা একটা লাঠি, একতাল দড়ি।
আমরা যে-জায়গায় বসব সেই জায়গায় লাঠি পুঁতে ছাতাটাকে বেশ করে দড়ি দিয়ে বাঁধা হল। একটু ছায়া চাই। চারপাশে রোদ খাঁ-খাঁ করছে। ভিজে ভিজে ঘাসের ওপর ডোরাকাটা শতরঞ্জি পড়ল। চারে মাছ না এলেও চোখে ঘুম এসে যাবে। কাল তাই হয়েছিল, একপাশে বড়মামা আর একপাশে ভাগনে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। তেঠেঙার ওপর ছিপও ঘুমোচ্ছে। স্থির ফাতনার ওপর ফড়িং ঝিমোচ্ছে। মাছেদেরও সেই এক অবস্থা, তাড়ি চটকানো চার খেয়ে বেহুশ শুয়ে রইল দিঘির তলায় পাঁকের বিছানায়।
বড়মামা বললেন, ‘নে, চা কর। আমি একটু চা খেয়ে নি। প্রকৃতি যেন হাসছে রে, প্রকৃতি যেন খিলখিল করে হাসছে, কাল থেকে একটা তাকিয়া আনতে হবে।’
‘সাইকেলে কি আর তাকিয়া আনা যাবে?
‘খুব যাবে। চিন দেশে সাইকেলে সংসার বয়ে বেড়ায়। সাহস চাই, কায়দা জানা চাই।’
কৌটো খুলে জলে চার ফেলতে লাগলুম। একটা ব্যাঙের তেমন পছন্দ হল না। তিড়িক করে লাফ মেরে জলে চলে গেল। ব্যাঙ ভালো সাঁতার জানে। মাঝ-পুকুরে কে ঘাই মারল।।
বড়মামা আনন্দে আটখানা হয়ে বললেন, ‘আসছে, আজ আমাদের ওইটাই টার্গেট। ঘাই দেখে মনে হচ্ছে কেজি-দশেক হবে। মৃগেল। মাথাটা মেজোকে দোব, কী বলিস? কুসিকে ন্যাজাটা। মেয়েরা ন্যাজা খেতে ভালোবাসে।’
