ডাক্তারবাবুর তখন কফি ব্রেক। বুকের ছবি আলোকিত পর্দায় আটকালেন। এক চুমুক কফি, তারপর প্রশ্ন,
ডেলি ক’প্যাকেট চলে?
আজ্ঞে আমি জীবনে ধূমপান করিনি। যখন ছোট ছিলুম, তখন একবার কালীপুজোর সময় প্যাঁকাটি টেনেছিলুম।
শুয়ে পড়ুন।
সহকারী উলটো দিকে একটা বিছানা দেখালেন। দেয়ালে স্টেথিস্কোপ ঝুলছে। সেই পুরোনো ধরনের পরীক্ষা। জোরে, আরও জোরে। ভস ভস করে। উঠে বসলুম।
সমস্ত ওষুধ গঙ্গার জলে ফেলে দিন। কে বলেছিল খেতে! ওই ওষুধের ঠেলায় তো সব জড়িয়ে গেছে লাংসে। কে ছাড়াবে মশাই! কার অত সময় আছে! লাংস দুটো তো অ্যারারুটে চুবিয়ে এনেছেন।
আমার ঠিক কী হয়েছে ডাক্তারবাবু!
ইউ আর সিটিং অন ভলক্যান।
কী করব ডাক্তারবাবু?
স্রেফ ওইটা মনে রাখবেন। স্মরণ, মনন, নিদিধ্যাসন। তিনটে পাফ দিলুম। সকাল, সন্ধে, রাত্তিরে। ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ফ্যাঁস, ফ্যাঁস।
আবার আসব কী?
না এসে যাবেন কোথায়!
রাত বারোটা। চেম্বারে তখনও দশজন। না, আমি একা নই! আমার দলে অনেকেই। ওয়ার্কস অফ দ্য ওয়ার্লড ইউনাইট। ইনকিলাব। ওয়ার্কার তো বটেই। চব্বিশ ঘণ্টা হাপর চালাই। নো ওয়ার্ক নো পে। পরের দিন দুশো টাকা নিয়ে তিনটে ভসভসি কিনতে গেলুম। পদ্মা মেডিকেলের মালিক হেসেই অস্থির। শ পাঁচেক লাগবে মশাই।
ফাইভ হানড্রেড! কমে কিছু হয় না?
হয়, পুরোনো ঘি। জোগাড় করুন।
সেই কালো কালো বিশ্রী দুর্গন্ধ। ঠাকুরদা ঠাকুরমার কালের ব্যাপার!
ঘি পুরোনো হলে আর ঘি থাকে না। আত্মশক্তি, বজ্রশক্তি, মহাশক্তি, মা চণ্ডী। আপনি যে রাস্তায় চলেছেন, সে রাস্তাটা হল বধস্য ধনক্ষয়। কোনওদিন দেখেছেন হাঁপানি সেরেছে। টাকে কেষ্ট ঠাকুরের মতো চুল গজিয়েছে, কাজের মহিলা তিরিশ দিন এসেছে, মুখা স্ত্রী ঝগড়া ভুলতে পেরেছে। এই দেখুন, আমার দুটোই আছে। বিশ্বজোড়া টাক আর বুক ভরা অ্যাসথামা। অশ্বত্থামা। মহাভারত তো পড়েছেন! রাত্রে গুপ্তভাবে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে ধষ্টদ্যুম্ন, উত্তেমৌজা, যুধামনু, শিখণ্ডী, দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র আর পাণ্ডু শিবিরের সমস্ত সৈন্য, হাতি, ঘোড়া, ফিনিশ করে দিলেন। শেষে ব্রহ্মশিব অস্ত্রে উত্তরার গর্ভের শিশুটিকেও নিধন করলেন। কুরুক্ষেত্রে কৌরব পক্ষের প্রায় সবাই মরেছিলেন, একমাত্র অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের মণি দান করে বনে চলে যান। এই অপরাজেয় অশ্বত্থামাই হল অ্যাসথামা। আর ওই মণিটা হল ভসভস হাঁপানি। এই হল মেডিকেল মহাভারত।
তাহলে কী করব?
যদি ট্যাঁকের জোর থাকে তাহলে এইসব ফাঁসফেঁসে কিনুন, আর তা না হলে ঘরে বসে জীবনের যে ক’টা দিন তলানি পড়ে আছে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করুন। তিনিই যোগবলে উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানকে জীবিত করেছিলেন, অশ্বত্থামার কোপ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলেন তাকে ঝোপে পাঠিয়ে। এই তো আমার এত বড়ো দোকান, ওষুধের তো শেষ নেই! আমি কী করি!
কী করেন ভাই?
প্রথম যেদিন শুরু হল, অতটা বুঝিনি। ভোরে প্রবল কাশি। থামছে না। ঘরে বসে কাশব। পরিবার পরিজন উঠে পড়বে। বিরক্ত হবে। ছাতে গিয়ে কাশব, এ তো মসজিদের আজান নয় যে পল্লিবাসী সহ্য করবে। বাথরুমে কাশব। পাশের ঘরেই পুত্র-পুত্রবধূ। সবে বিয়ে হয়েছে, খোঁয়ারি ভাঙেনি এখনও। মহা সমস্যা। প্রাণ খুলে কোথায় গিয়ে কাশি! কাশিকে ভয় পাই না, ভয় মানুষের সহানুভূতি আর ঘৃণাকে। কেউ যেন না বলতে পারে, ইউ আর এ নইসেন্স! খাঁটি কথা। আমারও একই অবস্থা। আমি কাশছি, হাঁইফাই করছি, আর সবাই গেল গেল করছে। তা আপনি কী করলেন?
অ্যাজমা তো মেডিকেল সায়েন্সের আওতায় পড়ে না। ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স। প্রথম প্রথম বাড়িসুদ্ধ সবাই আমার চারপাশেদাঁড়িয়ে হায় হায় করত। বুকে, পিঠে হাত বোলাত, রসুন তেল মালিশ করত। যেই জেনে গেল হাঁপানি, তিরানব্বইয়ের আগে নড়বে না, তখন দেখলুম, আমি একা। সকলেই বলতে লাগল, তোমার তো হাঁপানি। আড়ালে আদর—হেঁপো। শত্রুদের চোখে বেটা হেঁপো। তখন আমি মেডিসিন ছেড়ে ম্যানেজমেন্টে গেলুম। কাশার একটা জায়গা বাড়ির মধ্যেই খুঁজে বের করলুম। সেইটাই আমার কাশীধাম, বারাণসী। রান্নাঘরের পাশে ভাঁড়ার ঘর। জানালা নেই। শব্দ বাইরে যাবে না। সেইখানেই আমি ভোরটা ম্যানেজ করি। প্রথমে প্রাণ খুলে উদারা, মুদারা, তারায় কাশতুম। শেষে প্রফেশনাল কাফার হলুম। সেটা শিখলুম আমার কুকুর জুলির কাছে। জুলি যখন তারস্বরে ভৌ ভৌ করে, তখন কোনও লাভ হয় না, ভুকভুক করবেন, মাঝে মাঝে ভৌ। নিভৃত একটা জায়গা খুঁজে নিন। পেয়ে যাবেন। মাঝে মাঝেদরবারিতে গাইবেন—আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে তুমি অভাগারে চেয়েছ। আমি না ডাকিতে হৃদয় মাঝারে নিজে এসে দেখা দিয়েছ। আমি যাঁর চিকিৎসায় আছি তাঁরও অ্যাজমা। ফলে ভালোই হয়েছে। মাঝে মাঝে ফোন,
—হ্যালো, ডাক্তারবাবু খবর কী?
—উঁকি মারছে। আপনার?
—নহবত বসছে।
—মেরে দিন, এক ডোজ ডেকাড্রেন, ডেরিফাইলিন পাঞ্চ করে।
আমরা সবাই এক সুরে বাঁধা। একই সূত্রে বাঁধিয়েছি সহস্র পরাণ, বন্দেমাতরম।
কৈলাসকে বললুম, কৈলাস এই ব্যাপার। তুই আমার একটা ব্যবস্থা করে দে। রান্নাঘর, শোয়ার ঘর, বসার ঘরের মতো কাশির ঘর। গুদোম-টুদোম হলেও চলবে। একান্তে বসে কাশব। হাঁপাব। তনু হাঁপানি হয়ে ফিরে এসেছে। মনে, বনে, কোণে, তোকে নিয়ে থাকব। শেষে একদিন, গুদোমে গুমখুন।
গোমুখ্যু গরু
বড়মামার ডাক্তারি এবার মাথায় উঠবে। রুগিরা ভীষণ অসন্তুষ্ট। যার পরপর তিনটে ইঞ্জেকশান পড়ার কথা তিনি একটা নিয়ে দিনের পর দিন আসছেন আর ফিরে ফিরে যাচ্ছেন। চেম্বারে ডাক্তারবাবু নেই। সেদিন একজন স্পষ্টই বললেন, কুলপুরোহিত আর পরিবারের ডাক্তারকে যদি সময়মতো পাওয়া না যায় তাহলে অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবতেই হয়।
