‘আজ পর্যন্ত একটাও তো ধরতে পারলেন না বড়মামা?’
‘দাঁড়া। মাছেদের লজ্জা ভাঙুক। মাছেরা একটু লাজুক হয়। তাছাড়া জানিস তো, মনে হিংসে থাকলে জীবজগৎ দূরে সরে যায়। মাছভাজা খাব, মাছভাজা খাব—এই লোভ নিয়ে বসলে, মাছ কেন একটা ব্যাঙও তোমার চারে আসবে না।’
‘তাহলে আজ আমরা আলু-ভাতে খাব, আলু-ভাতে খাব—এই ভাব নিয়ে বসি।’
‘কোনওরকম খাবার চিন্তা মাথায় আনবি না। মনে কর আমরা উপবাসী ব্রাহ্মণ কিংবা রোজা করা মুসলমান।’ বড়মামা খুব কায়দা করে মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে ছিপ ফেলতে গেলেন। আমডালে বঁড়শি আটকে ছিপ হাতছাড়া হয়ে গেল। হাত-দুয়েক ওপরে ঘড়ির পেণ্ডুলামের মতো ছিপ দুলছে। হুইলটা তো কম ভারী নয়!
আমাদের হাইজাম্পের মহড়া চলেছে। নিতাই, গৌর, রাধেশ্যাম—দু-হাত তুলে মারো লাফ। আমপাতা, আমডাল সবসুদ্ধ নিয়ে ছিপ আবার ফিরে এল মালিকের হাতে।
বড়মামা বললেন, ‘বড় শুভ লক্ষণ। আম্রপল্লব শিকার করে উদ্বোধন। এবার যখন ছিপ ফেলব তুই তখন মাথার দিকটা একটু সামলে দিস তো। আকাশের ওপর আমাদের কোনও অধিকার নেই।’
‘তাহলে আপনি একটু বাঁ-পাশে সরে আসুন। মাথার ওপর একগাদা ডালপালা ঝুলছে। আবার আটকে যাবে।’
বড়মামা সরে আসতে আসতে বললেন, ‘গাছের স্বাধীনতা আকাশে।’
ঘুরিয়ে ছিপ ফেললেন। এবার বেশ ফেলেছেন। সুতোয় টান মেরে ফাতনাটা সোজা করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা ফড়িং এসে বসে পড়ল।
বড়মামা আয়েস করে বসে পড়লেন, ‘নে আয়, এবার স্যান্ডউইচ খাওয়া যাক।’
‘এর মধ্যে খাওয়াখায়ি শুরু করলেন? সারাটা দিন পড়ে আছে।’
‘থাক না, এটা তো টেস্ট কেস। কুসি কেমন করেছে দেখতে হবে না! চোখের দেখা নয়, চেখে দেখা। বুঝলি, আমি ভাবছি—’
‘কী ভাবছেন বড়মামা?’
‘এই মাছধরা আর রুগি দেখাটা একসঙ্গে চালালে কেমন হয়? রথ দেখা আর কলা বেচার মতো।’
‘তাহলে এই দিঘিটাকে তো চেম্বারের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে হয়।’
‘ধ্যার বোকা! চেম্বারটাকে এখানে তুলে আনব। ঘর বানাব না, একটা সাদা তাঁবু খাটাব। কিছু রোজগারও তো চাই। এই দ্যাখ না কখন মাছ ঠোকরাবে কেউ জানে না। তুই চোখ রাখলি ফাতনার দিকে, আমি দেখতে লাগলুম রুগি।’
‘আমি আবার অঙ্কও কষতে পারি।’
‘ওঃ, তাহলে তো তুই মেঘনাদ বধ হয়ে যাবি রে!’
‘আজ্ঞে মেঘনাদ সাহা।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা আমার প্রায়ই গুলিয়ে যায়। নে, স্যান্ডউইচ নে, তাড়াতাড়িতে বেশ ভালোই বানিয়েছে। আজকে ওই বড় মাছটা পাবই। ওটা পেলে, কাল মাছের পুর দিয়ে কচুরি করিয়ে আনব! মাছ ধরার কম ধকল! রোগা না হয়ে যাস!’
বড়রা প্রায়ই বলেন, দুঃখের রাত শেষ হতে চায় না। এ দেখছি মাছ ধরার দুপুরও সহজে সন্ধে। হতে চায় না। বড়মামা মাঝে মাঝে বঁড়শি তুলে বলছেন, ‘যাঃ, টোপ খেয়ে গেছে। নে কৌটোটা খোল। টোপ দে। এবার একটু কেঁচো দে। এবার একটু বোলতার ডিম ছাড়। মাছেদেরও মুখ আছে। মাঝে-মাঝে মুখ পালটে দিতে হয়।’
গরমের দুপুরে ঝিম ধরছে। জল থেকে একটা গরম-ঠান্ডা ভাপ উঠছে। মাঝে মাঝে পানকৌড়ি ছোঁ মেরে জলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ওপারে গোটাকতক হাঁস প্যাঁকোর-প্যাঁকোর করছে। শরীর ভারী হয়ে আসছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল।
হুইলের ভীষণ শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেল। ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসলুম। বিরাট মাছ পড়েছে। যাক, এতদিনে বড়মামার হাতযশ দেখা গেল। মেজোমামা এবার কাত। উত্তেজনায় বড়মামার চোখ বড়-বড়। মাছ যেভাবে সুতো টানছে, হুইল শেষ হয়ে এল বলে।
পুকুরের দিকে তাকালুম। এ কী, জল স্থির। মাছ তো জলেই খেলবে! বড়মামার ছিপ কোথায়! ছিপ এরিয়েলের মতো শূন্যে খাড়া। পিঠের দিকে বেঁকে আছে ধনুকের মতো। মাছ কি তাহলে জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে ছুটছে? কী মাছ রে বাবা!
মাঠের দিকে তাকিয়ে চক্ষুস্থির।
‘ও বড়মামা, আপনি কী ধরছেন?’
‘কেন, মাছ!’
‘মাছ তো আপনার পেছন দিকে মাঠ ভেঙে ছুটছে।’
‘সে কী রে? মেঠো মাছ নাকি?
‘আজ্ঞে না, একটা দামড়া গরু।’
আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটানে ছিপটা হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল। গরু ছুটছে, ছিপ ছুটছে, আমরা ছুটছি।
সন্ধে হয়-হয়। আমরা বাড়ি ফিরে এলুম। দেখার মতো চেহারা হয়েছে আমাদের। লোকে মাছ ধরে বাড়ি ফেরে, আমরা ফিরলুম গরু ধরে। গরু আমাদের সঙ্গেই এসেছে। গরুর মালিকও আছেন। বঁড়শি কেটে বসে গেছে। অস্ত্রোপচার করে বের করতে হবে।
মেজোমামা বললেন, ‘কী কায়দায় এমন করলে?’
বড়মামা বললেন, ‘ফাতনাটা নড়তেই মেরেছি টান। গরুটা মনে হয় পেছনে চরে বেড়াচ্ছিল। বঁড়শি গেঁথে গেল পিঠে। গোমুখ মেরেছে ছুট। যত ছোটে, বঁড়শি তত পিঠে ঢোকে। বিশে, বিশে।’
বড়মামার হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল।
গরু ধরে বড়মামার আবার সুমতি ফিরে এল। রুগিরা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। সকলেই বলাবলি করছেন, এ আমাদের সেই পুরোনো মুকুজ্যে-ডাক্তার, যাকে যমেও ভয় পায়।
যমে ভয় পেলে কী হয়, বড় দুঃখু মাছে ভয় পায় না।
গোল
আমাদের স্কুল টিমের সঙ্গে যোগেশ্বরী বিদ্যামন্দির টিমের ফাইনাল খেলা। হেডমাস্টার মশাই টিফিনের সময় আমাদের ডাকলেন। আমাদের টিমের ক্যাপটেন সুশান্ত। সুশান্তর ধারণা, সে একদিন পেলে হবে। হবেই হবে। ডান পায়ে বাঁ পায়ে বল নাচানাচি করে। মাথার বল পায়ে। নামায়, পায়ের বল মাথায় তোলে। অসীম ক্ষমতা। আমাদের তাক লেগে যায়।
