ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে তো হাঁপানি নেই।
ইতিহাসের কতটুকু জানেন, গ্র্যান্ডফাদার, গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্রেট টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি।
গ্র্যান্ডফাদার। অদম, ইভেও চলে যেতে পারেন। ভগবান কেন আপেল খেতে বারণ করেছিলেন। হোয়াট ওয়াজ দ্য মেডিসিন্যাল কজ। আপেল টক। খেলেই রেসপিরেটারি ডিসট্রেস বাড়বে। অনেক কিছু চিন্তা করার আছে। মিথের মধ্যে টুথ আছে।
ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন ঠুকে দিয়ে চলে গেলেন। বাথরুমে ঢুকলুম চান করতে। চিরকালের অভ্যাস, বালতিতে জল পড়ার শব্দের সঙ্গে রাগ-রাগিনীর আলাপ। ভৈরবী আসতে পারে, চৌড়ি এসে যেতে পারে। ভৈরো এলে বহুত আচ্ছা। স্বরচিত গানে সুর বসাতে পারি। মিঞামল্লার ধরেছিলুম হঠাৎ কাশি, ভয়ংকর রকমের। গাইতে চেয়েছিলুম গান, শুরু হয়ে গেল বাজনা। ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সংগীত। শেষে এমন হল, দম নিতে পারি না। আঁকুপাকু অবস্থা। সেই সময় মনে হল, বাথরুমে মরাটা কি ঠিক হবে! মানুষ কত পবিত্র জায়গায় মরে। তীর্থে, জাহ্নবী কূলে। অর্ধঅঙ্গ গঙ্গাজলে, অর্ধাঙ্গ থাকবে স্থলে। কেহ বলবে হরে হরে, করে করে দিয়ে তালি।
মনে হওয়া মাত্রই দমাস করে দরজাটা খুলে ফেললুম। বাইরে উদবিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে পুত্র, পুত্রবধু, পূজা। আমার কষ্টে সকলের মুখে যন্ত্রণা।
পূজা এগিয়ে এসে হাত ধরল, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে দাদাই!
উত্তর দিতে পারছি না। সামান্য একটু বাতাস চাই। টাকা, সম্মান, সম্পত্তি, সব বৃথা। একটু বাতাস।
আমার অবস্থা দেখে পূজা কেঁদে ফেলল, দাদাই ওমা! দাদাই!
আমি জানালায় মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছি। পুত্রবধূ আমার পিঠে হাত ঘষছে। পুত্র বলছে এসব ডাক্তারে হবে না।
আমি ভাবছি, মানুষের মৃত্যুটা মোটেই সুখের নয়। জন্মেও যন্ত্রণা, মৃত্যুতেও যন্ত্রণা। বাঁচাটাও যন্ত্রণা। ভাবছি, আবার একবার পৃথিবীতে আসব কি না! হলুদ রোদে সবুজ পাতা ঝিলমিল করছে। তিনটে পাখি গান গাইছে। অ্যান্টেনায় ধ্যানস্থ মাছরাঙা। এই সব দেখছি, সামান্য একটু বাতাসের জন্যে হাপরের মতো হাঁপাচ্ছি। পৃথিবীতে এত বাতাস আর হরিনামের ঝুলির মতো। আমার এই ফুসফুসে এক চুমুক বাতাস কেন ঢোকে না। ভাবছি, মুহূর্তে প্রাণ যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে পাখি হয়ে কিছুক্ষণ অ্যান্টেনায় বসব। তারপর উড়ে যাব যে-স্কুলে পড়তুম, সেই স্কুলবাড়ির গম্বুজে। সেখান থেকে কালীমন্দিরের চূড়ায়। প্রাচীন বটগাছে অন্য পাখির জটলায় কিছুক্ষণ কাটাব। তারা বুঝতেই পারবে না, এ পাখিটা অন্য জাতির পাখি, প্রাণপাখি। তারপর কৈলাসের বারান্দায় গিয়ে বসব। কৈলাস ভাববে, পাখিটার মন খারাপ। স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর। নিজের চেয়ে স্বজন কে আছে। সেই নিজেকেই তো হরিয়েছে পাখি। ইতিমধ্যে আমার। দেহ খাটে চেপে শ্মশানে এসে যাবে। ষাট-বাষট্টি বছরের প্রাচীন আবাসস্থল। জিওল গাছের ডালে বসে ছাই হওয়াটা দেখব, তারপর সিন্ধুসারসের মতো উড়তে উড়তে পশ্চিম আকাশের দিকে। যেতে যেতে বিন্দুর মতো রেণুর মতো অদৃশ্য। কিছুকাল চন্দ্রবিন্দুর চুটকি লাগানো নামটা পড়ে থাকবে। দু-একটা কাগজে, খাতায়, পাতায়, রেকর্ডে।
এই সব ভাবনার মধ্যেই আমাকে বসিয়ে ফেলা হয়েছে। যাকে বলে স্কোয়াট। আমার পুত্রবধূ পিঠ থাবড়াচ্ছে। পূজা ছোট ছোট হাত দিয়ে বুকের কাছটা মালিশ করছে। আর কিছুটা ব্যবধানে, আমার পুত্র চ্যুতরাজ্য রাজার মতো পায়চারি করছে আর বলছে, সামথিং মাস্ট বি ডান, সামথিং মাস্ট বি ডান।
এই সময় কৈলাস এসে হাজির। সকলের উতলা অবস্থা দেখে বললে, হাঁপানি সারে না বাবা!
আগুনে ঘৃতাহুতি হল। উত্তেজিত পুত্র আরও উত্তেজিত হয়ে বললে, কাকাবাবু, দিস ইজ নট হাঁপানি।
দেন হোয়াট ইজ ইট?
দিস ইস অ্যালার্জি। কয়েক হাজার বইয়ের ধুলো। সারা বাড়ি তো বইয়ে ঢাকা। যত না পড়ে তার চেয়ে বেশি ঝাড়ে। ডাস্ট অ্যালার্জি। মা থাকলে বাড়াবাড়িটা কম হত। মা তো নেই। সারাদিন ঝাড়ন হাতে নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। এ হল সরস্বতী পাউডারের এফেক্ট।
বাবা যার নাম কেষ্ট তার নামই কৃষ্ণ। অ্যালার্জিও হাঁপানি। একে নিয়েই ঘর করতে হবে। তবে মন্দের ভালো, হাঁপানিতে পরমায়ু বেড়ে যায়। দমের কাজ হয় তো, ফুসফুসের স্ট্রেংথ বাড়ে। হাঁপানি বলে স্বীকার করে নিতে তোমরা লজ্জা পাচ্ছ কেন? পৃথিবীর অনেক বড় বড় লোকের হাঁপানি ছিল, আছে, থাকবে। রাষ্ট্রনায়ক, যোদ্ধা, লেখক, অভিনেতা, বিশ্বসুন্দরী। হাঁপানি, টাক, সুগার, আরথারাইটিস, চিতায় না চড়ালে কিওর হয় না।
কৈলাস চলে গেল। সত্য কথা বলার অপরাধে সবাই ক্ষুব্ধ। আরও নামকরা একজন ডাক্তারবাবুর খবর এল। রিপোর্ট আর প্রেসক্রিপশনের ফাইল নিয়ে তথায় গমন। সময়টা খুব অদ্ভুত। রাত সাড়ে দশটা। চেম্বার উপচে রুগিরা সব রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছেন। সকলেরই ফুসফুস বিকল। বিভিন্ন বয়েস। আমিও তাঁদের একজন হয়ে ফুটপাথের একপাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলুম। অদূরেই কলকাতার ফুর্তি পাড়া। সেই বিখ্যাত প্রাচীন রেস্তোরাঁ। মেট্রো রেলের কুদলে রাখা রাজপথ। টানা রিকশায় নেশায় কাত হয়ে চলেছেন রহিস আদমি। পকেটের, পেটের, বুকের ত্রিবিধ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রাতের অভিসারে চলেছেন জনপদবধূর কুঞ্জে। এদের বুকে এখনও প্রচুর বাতাস। নায়িকারা মাঝে মাঝে হাওয়া খেতে বাইরে বেরিয়ে আসছে। মাছরাঙার মাছ ধরার কায়দায় খদ্দের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ঘর ক্রমশ খালি হচ্ছে। অবশেষে। তারিখ বদলের কিছু আগে ডাক পড়ল।
