কোথায় জল, কোথায় তোয়ালে! শিশুর কল্পনায় নিমেষে সব এসে যাচ্ছে। ছোট ছোট হাতে অদৃশ্য তোয়ালে দিয়ে বৃদ্ধের শুকনো, শীর্ণ মুখ মোছানো, পাউডার মাখানো, সবশেষে কপালে অদৃশ্য টিপ পরানো। কড়ে আঙুলটা কুটুস করে কামড়ে দেওয়া।
ডাক্তার বদল করতে হল। ফুসফুসে বাতাস ঢুকছে না। সেখানে গজলের মাইফেল চলেছে। চড়া পর্দায় বেলো ফুটে হারমোনিয়ামের সিঁসি শব্দ। জিন্দেগি, জিন্দেগি, এদিকে সামান্য কয়েক সি সি বাতাসের জন্যে আমার জিন্দেগি কাহিল হয়ে গেল। নতুন ডাক্তারবাবু বয়েসে তরুণ। ফুসফুসের বিষয়টা গুলে খেয়েছেন। প্রেসক্রিপশন দেখে বললেন, এক্স-রে না করিয়েই এই চড়া অ্যান্টিবায়োটিক এতগুলো খেয়ে বসলেন। এই বয়সে কাজটা ভালো হল কী? এখন সব ওষুধ বন্ধ। আগে এক্স-রে।
পুত্রবধূর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। তেওঁটে মার্কা শ্বশুর হওয়ার চেষ্টা করিনি। করলেও হত না। মানাত না। যারা ছেলেবেলায় কম খেয়ে ম্যালনিউট্রিশনে সারাটা জীবনই ছোকরা মেরে থাকে তারা কোনওদিন ডাকসাইটে বাবা, কি নিপীড়ক শ্বশুর হতে পারে না। এইটা আমার জীবনে শাপে বর হয়েছে। বাড়ির পরিবেশে কোনও টানটান, গুমোট ভাব নেই। এটা হল না, ওটা হল না, এ কী করলে মা, এই জাতীয় কোনও ভ্যানতাড়া নেই। ডিসিপ্লিন ডিসিপ্লিন করে শাস্তি চটকানো লোহার সংসার তৈরি হয়নি। যেমন জোটে, খাও দাও আনন্দে থাকো। বাইরের জগৎটা তো কেলসে গেছে, ভেতরটাকে অহংকারের ঠুসঠাসে অশান্ত করে তুললো না।
ডাক্তারবাবু চলে যেতেই পুত্রবধূ বললে, নাও, রাজবেশ ছেড়ে তৈরি হও। চলো এক্স-রে।
আজ থাক না রে, কাল হবে।
তোমার পরামর্শে আর চলছিনা ভাই। এবার আমার ম্যানেজমেন্ট। মা থাকলে তোমাকে পেটাত। নিজের ওপর অত্যাচারের একটা সীমা আছে। তুমি পরশু কৈলাসকাকুর বাড়িতে আইসক্রিম খেয়েছ?
কে বললে?
আমার গুপ্তচর সর্বত্র। কাজটা ভালো করেছ? তোমার ছেলেকে বললে, ফাটাফাটি করবে। সেইটাই চাইছ।
এক্স-রে কারখানায় গেলুম। জামা, গেঞ্জি খুলে একটা প্লেটে বুক ঠেসে, দু-হাত ওপরে তুলে, দমবন্ধ অবস্থায় অন্তর্লোকের ছবি তোলালুম। দুজনে যখন একসঙ্গে বেরোই তখন একটু মার্কেটিং হয়। সেটা বেশ সুখের, আনন্দের অভিজ্ঞতা। স্বামীর কাছে যতটা না ফ্রি হতে পারে, আমার কাছে পারে। আমি মানুষের স্বপ্ন পড়তে পারি। ভেতরের আনন্দ দেখতে পাই। অল্প কিছু নিয়ে থাকার মহানন্দ। এটা তনুরও ছিল। সব মেয়েরই থাকে মনে হয়। আধুনিকতার এনামেলটা সরাতে পারলেই অকৃত্রিম অন্তরের উন্মোচন। কাপ, ডিশ, একটুকরো প্লাস্টিক, আশায় ভরা কাপড়কাচার গুঁড়ো, প্রতিশ্রুতি জড়ানো শ্যাম্পু, স্বাদে ভরা চানাচুর, কাপড় শুকোতে দেওয়ার ক্লিপ, দু-পাতা। টিপ, পূজার জন্যে বিস্কুট। আধুনিক দোকান সাজসজ্জায় লোভনীয়। কিছুক্ষণ দাঁড়াতে ভালো। লাগে। হেটোর হেটোর করে হাঁটা। অনর্গল কথায় বেশ গোছানো ভবিষ্যতের ছক কষা। আসছে, আসছে, আসতে পারে, এইটাই ভালো। আসবে যে না সে তো সবাই জানি। পরাজয়ের একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেখান থেকে বেরোনো যায় না। মাস্টারমশাই পরাজিত, আমিও তাই, আমার ছেলে কেমন করে টগবগিয়ে ঘোড়া ছোটাবে। আশা করাটাই অন্যায়।
সংসারের বাইরে দুজনে গল্প করতে করতে সময়কে ফাঁকি দিয়ে অসুখকে কলা দেখিয়ে হুহু গাড়ি, টেম্পো, লরি, অটোর এলোমেলো ছোটাছুটির বৃত্তে গা বাঁচিয়ে, খানিক ঘোরাঘুরি হল। ঘরে ফিরেও খুব খারাপ লাগল না। বাইরে বেড়াতে গিয়ে হোটেলে ফেরার মতো। এমন এক রাজ্য যেখানে কোনও সংবিধান নেই, রাজা নেই, অনুশাসন নেই। নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী, পৃথিবীর পরে ওই নীল আকাশ।
পরের দিন ফুসফুসের ছায়াচিত্রে চোখ রেখে ডাক্তারবাবু বললেন, এ তো দেখছি আরতি হচ্ছে। এত ধোঁয়া ঢোকালেন কী করে!
সে তো সবাই জানে। কলকাতার মানুষ। মাছ যেমন জলে, আমরা সেইরকম লাখ লাখ মানুষ ধোঁয়ায় খলবল করছি। কতরকমের ধোঁয়া।
এই যে দেখছেন, সাদা সাদা ঢেউ খেলানো দাগ, এগুলো আপনার শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা।
ও আর আমি দেখে কী করব।
আহা, জিনিসটা তো আপনার! কী করছেন স্বচক্ষে একবার দেখুন।
মনে মনে বললুম, হেট দ্য সিন, নট দ্য সিনার।
তাহলে আগের ওষুধ আর চলবে না। অ্যান্টিবায়োটিকের অন্য গ্রুপে যাওয়া যাক।
আগের বেশকিছু ওষুধ যে রয়েছে। অনেক দাম।
সে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনার বউমা ভাববে। নিশ্চিন্তে আপনি সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করুন।
এই নিন, গোল, গোল, গোল। তিন গোল্লা, মানে সকালে-দুপুরে-রাতে। খাওয়ার পর একটা করে। আর এই দু-জোড়া চামচে এঁকে দিলুম। কাফ সিরাপ। দু-চামচ করে দুবার। একটু নির্মল বাতাসে থাকার চেষ্টা করুন। অ্যাভয়েড ডাস্ট, স্মোক, স্পাইসি ফুড, টেনশন, অ্যাংজাইটি।
পড়তে হলে নতুন বই পড়বেন, পুরোনো বই চলবে না। বিছানায় না শোয়াই ভালো।
বসে থাকা চলবে?
তা চলতে পারে, তবে শান্ত সংযত ভাবে। ধপাস ধপাস করবেন না। তুলোর ধুলো আপনার পক্ষে ডেনজারাস। ঢ্যাঁড়স, বেগুন, টম্যাটো, টক ফল, ডাল-চিংড়ি, কাঁকড়া, ইলিশ, আইসক্রিম, দই, মিষ্টি, তেলেভাজা স্পর্শ করবেন না।
বাকি রইল কী?
এইবার নিজে নিজে পরীক্ষা করবেন। এক-একটা জিনিস খাবেন, অপেক্ষা করবেন, যেই দেখবেন বাড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে বাতিল। এইভাবে যা থাকে সেইটাই আপনার খাদ্য।
