কৈলাস বললে, বুড়ো বয়সে দুম করে অ্যান্টিবায়োটিক কেন খেতে গেলি! সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল।
সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল মানে?
পেটে একটা উদ্ভিদের বাগান আছে। সমুদ্রের তলায় যেমন থাকে। ফ্লোরা, ফনা। তাদের কাজ হল এনজাইম-টেনজাইম, হজমি রস সাপ্লাই করা, চড়া কোনও খাবার থেকে পেটের দেয়ালটাকে রক্ষা করা। যেই অ্যান্টিবায়োটিক খেলে, অমনি সেই বাগান শুকোতে লাগল। তোর এখন উচিত, খুব দই খাওয়া। টক দই।
দই খাব কী রে! আমার তো হাঁপানি।
অ্যাঁ, হাঁপানি কী রে! তোর হাঁপানি হবে কী করে! ফ্যামিলিতে কারও ছিল! বাবা, মা, দিদু, দিদা?
শুনিনি।
তোদের বংশলতিকা নেই।
আছে। রামহরির তিন পুত্র, রাখহরি, বলহরি, হরিহরি। রাখহরির তিন পুত্র এক কন্যা। এইরকম সব আছে। সেই মহাপ্রভুর কাল থেকে। কারও নামের পাশে ব্র্যাকেটে হাঁপানি লেখা নেই।
তাহলে তোর এটা হাঁপানি নয়, অন্য কিছু। একটা সুইমিং কম কিনে দিনকতক সাঁতার প্র্যাকটিস কর।
কোথায় করব ছাদে, জলের ট্যাঙ্কে। বারাসতের দিকে একটা পুকুর আছে বেশ বড়। সেখানে করবি?
ওর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।
তাহলে এক কাজ কর। তপনকে ধরে আনি। যোগাসনের এক্সপার্ট। আসনে এসব ম্যাজিকের মতো সেরে যায়।
পরের দিন তপন এল। খোঁজপাত করে জানা গেল, তপন আমার পিতৃদেবের ছাত্র ছিল। যোগের। এখন খুব বাজার। কুঁজোকে সোজা করে, মোটাকে রোগা করে, রোগাকে মোটা।
মেঝেতে কম্বল পাতা হল। তপন ছোট্ট একটা লেকচার দিল। অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা। সাঁই সাঁই করে শ্বাস নিতে হবে। শ্বাসেই আরাম, শ্বাসরাম। কাকচক্ষু প্রাণায়াম। সেটা কী? ঠোঁটটাকে সরু করে জিভটাকে রোল করে তেড়ে বাতাস টানুন। গিলে ফেলুন। নাক দিয়ে ছেড়ে দিন। ছত্রিশবার। বাতাস পান করুন।
অনেকক্ষণ ধরে কসরত চলল! ঠোঁট সরু হচ্ছে, কিন্তু জিভ গোল হচ্ছে না।
কৈলাস পাশেই ছিল। বললে, পাকা জিভ তো, তাই গোলা হচ্ছে না। প্র্যাকটিস করতে হবে। মাখম মাখাতে হবে। অভ্যাস করলেই এসে যাবে। ঝাল খেয়ে উস করে বাতাস টানা আর কী!
তিন রকমের প্রাণায়াম করতে হবে। দাঁড়িয়ে, বুকে হাত দিয়ে শ্বাসটানা। খাঁচা যেন সামনের দিকে ঠেলে ওঠে। আর একটা হল বায়ু সঞ্চালিনী। মাথা বৃত্তাকারে ঘোরাতে ঘোরাতে শ্বাস টানা আর ছাড়া। বেশ ভজকট ব্যাপার! তাল কেটে যায় থেকে থেকে। এর পর ধনুরাসন, নৌকাসন, সর্বাঙ্গাসন, হলাসন, কম্বলের ওপর বুড়ো বয়সে ধস্তাধস্তি কাণ্ড। শেষে ডাক পড়ল পুত্রবধূর।
আমাকে মেঝেতে উবু হয়ে বসতে হবে। যে ভাবে বাথরুমে বসা হয়। তারপর আমার পুত্রবধূ শিরদাঁড়ার দু-পাশেদুহাতে ধপধপ থাবড়াবে। ওপর থেকে নীচে নীচ থেকে ওপরে। এর নাম মনে হয় সুড়সুড়ি। কে দেবে। আমার পুত্রবধূ।
কৈলাস বললে, ধনুক আর নৌকো আমি করে দেব। শরীরটাকে পেছনে দুমড়ে দেওয়া তো।
তপন বললে, না না, কোনওরকম বলপ্রয়োগ চলবে না। এই বয়েসে খিল খুলে গেলে কেলেঙ্কারি। তপনের মধ্যে বেশ একটা গুরু-গুরু ভাব এসেছে। কথায় কথায় বলল, কয়েক মাস পরেই আমেরিকা চলে যাবে। সেখানে বিরাট ব্যাপার। হলিউডের চিত্রতারকারা, মিলিয়ন ডলার টেনিস খেলোয়াড়রা, পপ সিঙ্গাররা যোগের ভক্ত। এখানকার কয়েকজন ওখানে গিয়ে খুব নাম করেছেন। বিপুল বড়োলোক হয়েছেন। এক-একজনের তিনটে, চারটে করে রোলসরয়েস। সেই সদভাবনার কথা ভেবেই তপন ঝড়ের আগের আবহাওয়ার মতো গুমোট মেরে গেছে। তপন। চলে গেল।
কৈলাস বললে, তাহলে নিয়ম মেনে এগুলো কোরো। অনেক কষ্টে তপনকে ধরে এনেছিলুম। বড় বড় লোককে ও যোগ শেখায়। তোর অনেক ভাগ্য যে এককথায় চলে এল। সেই ভাগ্যটা এখন কাজে লাগা।
নিজে নিজে যা করা যায় চেষ্টা করব। পুত্রবধূর সাহায্য আমি নিতে পারব না। ইজের পরে চিত হয়ে পড়ে আছি, পা থেকে মাথা পর্যন্ত সুড়সুড়ি দিচ্ছে, সেনসেশন, উবু হয়ে বসে আছি, পিঠে ধাঁই থাপ্পড়। এইসব কেলেঙ্কারি আমার দ্বারা হবে না ভাই।
তবে হাঁপিয়ে মরো।
কৈলাস রেগে চলে গেল।
এতক্ষণ পূজা সব দেখছিল। তির তির করে বেরিয়ে এল তার কোণ থেকে। এসেই বললে, তুই রিয়া, না পূজা।
রিয়া।
না, তুমি এখন বাবা।
তার মানে পূজা এখন আমার পুত্রবধূ সুস্মিতার ভূমিকায়।
পূজা তার মায়ের ভঙ্গি অনুকরণ করে বললে, বাবা। শুয়ে পড়ো, শুয়ে পড়ো।
শোবো কেন রে!
সেনচেশন।
ওই প্রক্রিয়াটা খুব ভালো লেগেছে। সুড়সুড়ি।
ও তো হয়ে গেছে পূজা। আবার কাল হবে।
পূজা নয়, আমি ছুম্মি। পূজা রান্নাঘরে। বাবা! শুয়ে পড়ো, আমি কিন্তু খুব রেগে যাচ্ছি। বাবার শুতে হল। আবার উবু হয়ে বসতে হল। গুটগুটে, ফুটফুটে মেয়েটা কখনও সুড়সুড়ি দেয়, কখনও পিঠের দু-পাশে ছোটো ছোটো হাতে থাপ্পড় মারে। সমানে গান চলেছে। কখনও হুঁ হুঁ করে। কখনও বাণী বসিয়ে। ম্যাও ম্যাও, ম্যাও ছোতে ছোতে পা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চরিত্র পালটে গেল। হয়ে গেলুম পূজা। পূজা সুস্মিতাতেই রইল। শুরু হল, আমাকে চান করানো খেলা। দু-চার ঘা মারও হল, অসভ্যতা করার সাজা।
মারছ কেন মা! আমি কী করেছি!
দাঁতে দাঁত চেপে বললে, কী করেছি কী করেছি। কী করেছিস জানিস না তুই। জল থেকে উঠতে চাইছিস না কেন? সর্দি হবে না! রিয়া তোর চেয়ে অনেক সভ্য। রিয়াকে দেখে শেখ, শেখ। কখন। চান করে, খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়েছে।
