পূজা মাঝে মাঝে আমার পুত্রবধূ হয়ে যায়। আমি তখন তার বাবা। আমার পুত্রবধূ আমাকে যা যা বলে পূজাও আমাকে তাই বলে। বাবা, তুমি সেই ঠান্ডা জলে চান করছ, তোমার না বুকে সর্দি বসেছে। এক্ষুনি কাশি হবে। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না! তারপর আমার ছেলেকে ডেকে নালিশ করবে, এই যে শুনছ, তোমার বাবাকে কিছু বলো।
এইরকম সব ছোটোখাটো মজার দিন যাচ্ছে। রাতটাই একটু অন্যরকম। দরজা বন্ধ করলেই উদোম নিঃসঙ্গ। চিত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা। এপাশ ওপাশ। মাথার কাছে খোলা জানালা। এক আকাশ গনগনে তারা। হঠাৎ বয়ে আসা ক্যালেন্ডারের পাতা কাঁপানো বাতাস। অনেক রাতে আকাশ মাঝে মাঝে অট্টহাসি হাসে। হাততালি দেয়। জেগে থাকলে এইসব শোনা যায়। সাপের হিস হিস শব্দ। ছাদে ভারী কিছু পড়ে গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ। আগে খুব ভূতের ভয় ছিল, এখন নিজেই ভূত হয়ে গেছি। মানুষের সবচেয়ে বড় সঙ্গী তার নিঃসঙ্গতা।
শুয়ে শুয়ে দেখি, জীবনটা যেন কার্পেটের মতো গুটিয়ে এসেছে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য। বেশ মজা লাগে। সময়ের ব্যবধানে ছাড়া ছাড়া নয়। সব এক ঠাঁয়ে এসে জড়ো হয়েছে। তনুর ফেলে যাওয়া অজস্র স্মৃতি। পায়ের দিকে আলমারি, ফুলশয্যার রাতে যে সব। পোশাক পরেছিল, শাটিনের শায়া, বেনারসি ব্লাউজ, এমনকি বক্ষবন্ধনীটি পর্যন্ত সযত্নে রাখা। সেই রাতের একটি নারী শরীরকে একেবারে নিজের অধিকারে পাওয়ার প্রথম বিস্ময় আজও কাটেনি। হঠাৎ একটা বই শুরু হয়ে যাওয়া। পর্দা সরে গেল। অজস্র আলো। বাদ্যযন্ত্রীরা আবহসংগীত বাজাচ্ছে। প্রম্পটার প্রম্পট করছে। নাটক শুরু। দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, দায়িত্ব, রহস্য, রোমাঞ্চ। একটা মেয়েকে ঘিরেই সব তৈরি হয়। জড়িয়ে জড়িয়ে ওঠে। কুঁড়ি, ফুল, ফল, পাখি, দিন, রাত, গতি, বছর দিয়ে মাপলে মহাকালের এক পলক। জীবন দিয়ে মাপলে মিসিসিপি, ইয়াংসিকিয়াং।
এই সময় গলার কাছে একটা শব্দ শুনতে পাই। যেন সানাইয়ের সর্দি হয়েছে। বাগেশ্রী, কেদারা কি জয়জয়ন্তী, কি সোহিনী না হয় একটা কিছু ধরতে চাইছে। প্রথমে খুকখুক কেশেহুঁশিয়ারি। দিতে চাই, রাত অনেক, এখন বাদ্যবাজনা পাবলিক অ্যালাউ করবে না। অন্তত তোমার বাজনা। তুমি কি লোকাল ক্লাব? ক্লাব ইংরেজি শব্দ। পশ্চিমবাংলার প্রগতিশীল সংস্কৃতিতে উচ্চারণ, কিলাব। কেলাবও হতে পারে। আজকাল এইরকম ভাষা শুনি, গাড়িটা খুব হরেন দিচ্ছিল, কেলাবের মুরারী ডেরাইভারকে ধরে বেধড়ক পিটিয়েছে। ব্যাগি প্যান্ট, জামা, ঘাড় অবদি ঝুলুর লক্কা চুল। শারুক খান, সানি দেওল। এই ছেচা বেড়ার কেলাব সারারাত আলমারি-আকৃতির। কেলে স্পিকার বক্স দিয়ে গোটা পল্লিটাকে গানে গানে চুবিয়ে দিতে পারে, তুমি পারো না।
ছোট কাশিতে যখন কাজ হয় না, তখন একটা বড় মাপের কাশি ছাড়ি। উচিত কাজ নয়, উলটো দিকের ঘরেই পুত্র, পুত্রবধূ, নাতনি। কাশির মতো বিরক্তিকর কিছুই নেই। বড় কাশিতেও উপদ্রব কমে না। সি, সাঁই, সুই নানা ধরনের শব্দ। মাঝে মাঝে একঘেয়েমি কাটাবার জন্যে নিজেই। একটু কালোয়াতি করি। ছাত্রজীবনের সেই গান মনে পড়ে, জেগে আছি একা, জেগে আছি। কারাগারে। জানলায় ঝকঝকে কালো আকাশ। মাঝে মাঝে উল্কাপাত। প্রহরে প্রহরে পেঁচার ডাক। ফুলশয্যার রাতটা তনুর সঙ্গে আমি জেগেই কাটিয়েছিলুম। জীবনের যত কথা এক রাতেই বলার চেষ্টা। মনের নাট-বল্ট-পিনিয়ান-গিয়ার-হেয়ার স্প্রিং-ব্যালেন্স হুইল সব খুলে ফেলা। আর এই হাঁপানির সঙ্গে আমার চির ফুলশয্যা। শোয়ার উপায় নেই। শুলেই মনে হয় কংসরাজ বুকে জাঁতা চাপিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। জল থেকে ভোলা কাতলা মাছের মতো খাবি খাওয়া।
জিনিসটা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। কাশির ঠেলায় ঘুলঘুলি থেকে চড়াই উড়ে যায়। বিচারে বসল পরিবার। অত্যাচারের ফল। তিনবার চান, ঠান্ডা জলপান ইত্যাদি ব্যাভিচারের এই পরিণাম। ডাক্তার এলেন। প্রবীণ এম ডি। বুকে কল বসিয়ে ধমকের সুরে বললেন, টানুন, জোরে টানুন।
শ্বাস টানা মাত্রই, ধমকে ধমকে, গমকে গমকে কাশি। গঙ্গ, সিমব্যাল, স্যাকসোফোন সব একসঙ্গে। হৃদকমলে বড় ধুম লেগেছে। মজা দেখিছে আমার মন পাগলে। প্রবীণ ডাক্তারবাবু বললেন, করেছেন কী মশাই, বুকে যে রামচৌকি বসিয়ে ফেলেছেন! অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। কী খাবেন, দশ, পনেরো, উনিশ, ছাব্বিশ, আটত্রিশ। কোনটা? অসহায়ের মতো ওদের দিকে তাকালুম। রোজগার তো নেই। বোস্ট আর্টিস্ট। দশের কমে কিছু থাকলে ভালো হত। অনেকটা খেলতে পারে এইরকম ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক আর দশের নীচে নেই। মনমোহনবাবু গ্যাট করে সব বাড়িয়ে দিয়েছেন। ডাক্তারবাবু রসিকতা করে বললেন, দশে ক্যাপসুলের খোলসটা হতে পারে। শেষে উনিশে রফা হল। সাতদিন এই চলুক। খুব সাবধান। ঠান্ডা যেন একটুও না লাগে। কাঁচা-পাকা জলে চান। পেট ঠেসে খাবেন না। পৃথিবীর প্রোপোরশন, একের চার ভাগে সলিড, তিনের চার ভাগ লিকুইড। রাতের খাওয়াটা সন্ধের। একটু পরেই সেরে নিয়ে বেশ খানিক পায়চারি করবেন। হজম করিয়ে শুতে যাবেন। পেট যত খালি রাখবেন ততই রিলিফ।
তিনটে দিন গেল। কথায় আছে, চলছিল রুগির উঠে বসে, কাল হল রুগির বদ্যি এসে। আগে শ্বাস নিলে ফুসফুস তবু চলছিল, যা হয় একটু বাতাস ঢুকছিল। এখন মনে হচ্ছে দুটো পাথরের টুকরো। বাতাস ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে।
