আঃ তোকে কেন তোর মাম্মি গেলাসে দেয়! ভাঙলি কেন! খুব মেরেছে।
ভীষণ মেরেছে রে!
কই দেখি, দেখি কোথায় লেগেছে।
এই দেখ, এই জায়গাটায়। কী হবে রে পূজা।
কোনও ভয় নেই, আমি তো আছি।
আমাকে আর বাড়িতে ঢুকতে দেবে না রে!
ঠিক আছে তুই আমাদের বাড়িতে আমার কাছে থাকবি।
তোর মাম্মি বকবে।
কিছু বলবে না। আমার মাম্মি তোকে কিছু বলবে না।
এর পর পূজা একটু গম্ভীর মুখে বলবে, রিয়া! তুই কিন্তু খুব জিনিস ভাঙিস!
কেন রে রিয়া!
কী করব বল ভাই পূজা, খুব ইচ্ছে হল হাত দিয়ে দেখি। আর অমনি উলটে গেল। আর ভেঙে গেল। আর আমার মাম্মি এসে দুম দুম করে পেটাল।
কোথায় কোথায়?
এই যে পিঠে।
দেখি দেখি—
পিঠটা দেখে বললে, ও কিছু হয়নি। আমি ওষুধ দিয়ে দোব।
আমি কোথায় থাকব রে পূজা! আমার কী হবে!
আমি তো আছি রিয়া। আমি তো আছি।
আমাদের এই খেলায় পূজা মাঝে মাঝে রিয়া হয়, আমি তখন পূজা। সময় সময় সব গুলিয়ে যায়। তখন পূজা জিগ্যেস করে, তুমি কে? পূজা না রিয়া! পূজার থুপুর থুপুর পায়ে ওর মা দুটো তোড়া পরিয়ে দিয়েছে। যখন ছোটে ঝুনুর ঝুনুর শব্দ হয়। কপালের ওপর ঝুলে আছে রেশমের মতো চুল, কালো হিরের মতো দুটো চোখ। যখন আমার পাশে চিত হয়ে ঘুমোয়, মুখে চাঁদের আলো এসে পড়ে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবি, পৃথিবীতে শুরুর কোনও শেষ নেই। সবসময়েই শুরু হচ্ছে নতুন জীবন, নতুন পথ চলা। দেখতে দেখতে পূজা বড় হবে, আমি আরও বুড়ো হব, আমি বেরোচ্ছি পূজা ঢুকছে। কলেজ, ইউনিভার্সিটি। সহপাঠী, পড়া কথা, প্রেম, বিবাহর সংসার, আমার জায়গায় আমার ছেলে, আর একটা পূজা, আর একটা রিয়া, একই রকমের পুতুল, টিয়া, হাঁস, বাঘ, হনুমান, গাড়ি, কটর কটর বন্দুক। খিলখিল হাসি, অভিমানের কান্না। বিধাতাপুরুষ এ এমন এক গল্প ফেঁদেছেন যার কোনও শেষ নেই। নদী আছে, পাহাড় আছে, গ্রাম আছে, শহর আছে, গাছ আছে, পাখি আছে, দোলনা আছে, শ্মশান আছে। এসো, খেলা করো চলে যাও। খেলার মাঠ, দু-পাশেদুই গোলপোস্ট। গোল খাও, গোল দাও।
সাড়ে তিনজন মানুষের ছোট্ট সংসার! চারপাশে সমস্যার সমুদ্র বিশৃঙ্খল, এলোমেলো সমাজ। আমার ভূমিকা দর্শকের। কোনও অভিভাবক আমার কাছে আর ছাত্র-ছাত্রী পাঠাবেন না। আমি ব্যাকডেটেড। আমি ইংরেজি পড়াতে গেলেই আগে নেসফিল্ডের গ্রামার, রো অ্যান্ড ওয়েব, গঙ্গাধর ব্যানার্জি পড়াতে চাইব। ছেলে বলবে, সে আবার কী! এখন ব্যাকরণ ছাড়াই ইংরেজি শেখা যায়। সেই কারণে আমি সম্পূর্ণ বেকার। চোখের জন্যে নিজেও আর বেশি লেখাপড়া করতে পারি না। নয়া জমানার খবরের কাগজ আমাদের জন্যে নয়। হাবোড়-তাবোড় কী যে থাকে! রঙিন পাতার শাড়ি, চুল, ত্বক, রান্না, নায়িকার অবৈধ প্রণয়, মেয়েদের শেকল ছেড়ার আন্দোলন, বিদেশের লাম্পট্য, স্বদেশের ধর্ষণ, সব মিলিয়ে বাদশাহি দোকানের মাটন চাঁপ, রুমালি রোটি। ভীষণ গুরুপাক।
নাতনিটাই আমার বন্ধু। বললে, ঘোড়া হও। পিঠে চেপে হ্যাট হ্যাট, আবার গান গায়, চল মেরে ঘোড়া হ্যাট-হ্যাট। খুব নাচতে শিখছে। আমাকে নাচ দেখায় ঘুরে ঘুরে। হাতের মুদ্রা, চোখের ভঙ্গি। ভেতরে নাচ আছে। মাঝে মাঝে নাচ পায়। তখন আর তাকে থামানো যায় না। সারা ঘর গোল হয়ে ঘুরবে। দুধ সাদা ফ্রক হাঁসের পেখমের মতো উড়তে থাকবে। একটা বন্দুক আছে, সেইটা দিয়ে গুলির শব্দ করে বলবে, মরে যাও। আমাকে জিভ বের করে উলটে পড়তে হবে। তখন এসে কাতুকুতু দেবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি বেঁচে উঠব। পরমুহূর্তেই গুলির শব্দে আবার আমি মরে যাব, আবার কাতুকুতুতে বেঁচে উঠব। পর্যায়ক্রমে এই চলতে থাকবে। ক্লান্ত হয়ে পড়লেও নিষ্কৃতি নেই। মৃত্যুর দৃশ্যে আমার মৃত্যুভাবনা আসবে। সত্যিই তো আর ক’টা দিন। হয়েই তো এসেছে। এইবার পায়ে পায়ে লকলকে আগুনে গিয়ে শুতে হবে। এক মুঠো ছাই।
মেয়েটাকে তেল মাখাই। চানের পর্বটা বড় মধুর। বড় একটা বালতিতে বসিয়ে দিতে হবে। আধবালতি জল। নাচানাচি। জল ছেটকাছিটকি। মসৃণ ত্বক জেল্লা দিয়ে উঠবে। মাথার জল মুখ দিয়ে ঝরে পড়ার সময় দম আটকে আসার আতঙ্কে একটু ছটফটানি। তারপর গা মোছানো। মাথা মোছানোর সময় একটু কান্না। পাউডার। পাতলা নীল ফ্রকে মহা খুশি হয়ে নেচে ওঠা বিশাল বিপুল একটা পৃথিবীর মধ্যে কী সামান্য একটা ঘটনা। কিন্তু কী আনন্দের। আমি সেবা করার সুযোগ পাই। মনে পড়ে যায়। তনু ডান হাতের কনুইয়ের কাছ থেকে ভাঁজ করে আমাকে পেছন দিকটা দেখাচ্ছে। দেখো কতটা কেটে গেছে খোঁচা লেগে! ফরসা গোল একটা হাত। লাল রক্ত। পৃথিবীর কারওকে নয়, একমাত্র আমাকে বলছে। নিয়ে আয় তুলো, নিয়ে আয় আয়োডিন। যত না হয়েছে তার চেয়ে বেশি আমার ব্যস্ততা। অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে আলতো আলতো করে
পরিষ্কার করা। একটু একটু আয়োডিনের ছোঁয়া, উ, জ্বালা করছে, বলে সামনে ঝুঁকে পড়া। তখন সেই ঘাড়ে আলগা খোঁপা, পিঠের অনেকটা অনাবৃত চকচকে অংশ দেখতে পাওয়া। তখন আমার সেবা, আরও সেবা, ফুঁ দেওয়া। জীবন অনেক বড় ব্যাপার, যুদ্ধ, অভিযান, আবিষ্কার, বিপ্লব, গিলোটিন, ওয়াটারলু, ট্রাফালগার, কিন্তু এই যে মুক্তোর দানার মতো, ভেতরে, অন্তরে মানুষকে ভালোবাসার একটা শুক্তি খুঁজে পাওয়া, এর কোনও দাম নেই তবু কোহিনুর। এইটুকুর জন্যেই বাঁচা যায়। কিছুই পেলুম না, এইটুকুই পেলুম। আমার লতার প্রথম মুকুল চেয়ে আছে মোর পানে।
