কত বয়েস হল! এর মধ্যে স্কুল!
তা হল বইকী, দু-বছর পাঁচমাস। একালে তো আমাদের কালের নিয়ম চলবে না। ইংলিশ মিডিয়াম। এখনই বলে, মে আই গো টুঁ টয়লেট। আবার বলে, প্লিজ দাদাই কাম হিয়ার। আর ঘুরতে-ফিরতে সরি তো আছেই। উইকলি পরীক্ষা। তিন কিস্তিতে অ লিখতে শিখেছে। পার্ট বাই পার্ট। প্রথমে গোল্লা। তারপর বাঁক। সব শেষে পাশের পাদানি আর আঁকসি। সেই নাতনিকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাবে স্কুলে। ফিরে এসেই রান্নাঘরে। ছেলে বেরোবে। তার আবার রকমারি বেরোনো। খবরে কাগজের কাজ তো। মেজাজটাও তেমন সুবিধের নয়।
তোর ছেলে তারও মেজাজ!
আরে এটা কালের ধর্ম। একালের সব ছেলেরই মেজাজ। বুড়োরাও কপি করছে। সেদিন এক লিকপিক বুড়ো ষণ্ডামার্কা এক সাইক্লিস্টকে বলছে, মারব থোবনায় এক ভাট্টা, সবক’টা দাঁত মুড়কি হয়ে যাবে। আমাকে বাজারে সেদিন আমার চেয়েও এক বুড়ো বলেছে, বেশি রেলা নিও না। ছতরি খুলে নোবো। এ তোমার যুগধর্ম। তা শোনো, রান্নার ফাঁকেই আবার বেরিয়ে গেল মেয়েকে আনতে। এনেই ঢুকে গেল রান্নাঘরে।
তা তুই কী করিস, এই নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসায় একটু সাহায্য করতে পারিস তো।
না ভাই, এই পাকতেড়ে চেহারার বুড়ো ওই স্কুলে গেলে সবাই আর্তনাদ করে উঠবে। সেখানে সব সুন্দরীদের কুম্ভমেলা। উদবেগ, উৎকণ্ঠা। আকাশজ্যোতি এম আর ডরু এক করে ফেলছে। যত বলা হচ্ছে, এম উলটে গেলে ডরু হয়, ডরু উলটে গেলে এম, ও ওলটাচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছে না, কোন ওলটে কী হল! অনিরুদ্ধর আরও কেলেঙ্কারি। সে ব্যাঙ হয়ে গেছে। লাফ মেরে ফাইভ থেকে নাইনে চলে যাচ্ছে। ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ, নাইন, টেন। কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না ভাই। ওর বাবা তো রেগে মায়ের সঙ্গে কথাই বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে, কনসেপশানের সময় মা ইনঅ্যাটেনটিভ ছিল। শেষে সাইকোলজিস্ট। দেড়শো টাকা ফি। বললেন, ওর ই-ফিকশেসান। ওই ফাইভের ই-টাই হল কালপ্রিট। ওই ই-টাই নাইনের ই-র দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাহলে উপায়! একটা বছর এই চলুক, ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ, সিক্স, সেভেন, এইট, নাইন, টেন। ওর কথা ভাবলে রাতে ঘুম হয় না ভাই! আর আমার শ্রমণা। কী যে করব আমি! সুইসাইড করব। কেন কী হল! ক্লাসে ঢুকল। ডেস্কে বসল। ঘাড় কাত। যা জিগ্যেস করবে, কোনও উত্তর নেই। বোবা। এদিকে মাসে মাসে আশি টাকা। ওর আর বিয়েটিয়ে হবে না। কে বিয়ে করবে মুখকে! আমার বোনের মেয়েটা শিয়োর আমেরিকা যাবে। শ্রমণার জন্যে শ্ৰমণার বাবা দায়ী। বাপ ঘাড় কাত মেয়েরও ঘাড় কাত। কৈলাস ভাই, এই আমার একদিনের অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয় দিন আমি আর যেতে চাই না। শিশুদের ওই যন্ত্রণা। শুদ্ধ বাংলায় নিদারুণ নিপীড়ন আর মায়েদের ওই ভয়ংকর উৎকণ্ঠা আমার সহ্য হয় না। আমাদের সেই ইজের পরা। ইস্কুলের দিনগুলোর কথা ভাব। তুই আর আমি ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছিলুম। বগলে বই খাতা, পায়ে বুটজুতো, ঘাস-ছাঁটা চুল, ভয় ভয় দৃষ্টি। শিক্ষকমশাইদের মনে হত বাঘ। হেডমাস্টারমশাই সিংহ।
কৈলাস উপসংহারের দিকে আসতে চাইছে, তাহলে তুই আছিসটা কেমন?
খুব আলতোভাবে আছি। বেশি ভর দিতে পারছিনা, যদি ভেঙে যায়।
তার মানে পুত্র, পুত্রবধূকে বিশ্বাস করো না?
ওদের নয়। আমি এই যুগটাকে বিশ্বাস করি না। এ যুগে কেউই কারওকে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছে। এ যুগটা কী রকম জানিস। ইংরেজিতে বলি, ট্রাস্ট ইন গড, বাট লক ইয়োর কার। সকলের ওপর আস্থা রেখো। কিন্তু নিজের ওপর আস্থা রাখতে ভুলোনা। আর। একটা উপদেশ শোন। হোয়েন-ফেসড উইথ এ সিরিয়াস হেলথ প্রবলেম, গেট অ্যাটলিস্ট ফ্রি। মেডিক্যাল ওপিনিয়নস। বাড়িতে রান্নার গ্যাস থাকলেও কয়লার উনুন বজায় রেখো। ইলেকট্রিক আলো জ্বাললেও মোমবাতি আর দেশলাই হাতের কাছেই যেন থাকে।
কৈলাস বললে, বয়েস হলে মানুষ সিনিক হয়ে যায়। তুই বেশ ভালোই আছিস।
কৈলাস চলে গেল। বোধহয় চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল, তাই চায়ের কথা পেড়েছিল। বিশাল চেহারার মালিক। বহুতল বাড়ির মতো। বড়লোকের ছেলে। খাওয়াদাওয়ার অভাব ছিল না, আড়াটাও ভালো ছিল, তাই বিশাল। এখন একটু থলথলে। চলে যেতে বারান্দায় যেন একটু আলোবাতাস খেলল।
নাতনির সঙ্গে আমার সময় বেশ ভালোই কাটে। নানা সময়ে আমার নানান চরিত্র। তবে বেশির ভাগ সময়েই আমি রিয়া। সামনের বাড়িতে প্রায় আমার নাতনির বয়সিই একটি মেয়ে থাকে, তার নাম রিয়া। আমার নাতনির নাম পূজা। পূজা তাকে বন্ধু করতে চায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দুজনে কথা হয়। রিয়া কিন্তু এ-বাড়িতে আসে না। খুব বড়লোক বলেই হয়তো তাকে মা-বাবা আসতে দেয় না। আমাকে রিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়।
ডল পুতুলের মতো ফুটফুটে পূজা ব্যস্তসমস্ত হয়ে এল, কী রে রিয়া, কী করছিস তুই।
এর উত্তরে গলাটা সরু করে কাঁদো কাঁদো ভাবে আমাকে বলতে হবে আর বলিস না ভাই পূজা, আমাকে না আমার মাম্মি খুব মেরেছে।
পূজা অমনি, ভীষণ উতলা হয়ে জিগ্যেস করবে, কেন কেন, তুই কী করেছিলিস রে রিয়া?
আমি না একটা সুন্দর গেলাস ভেঙে ফেলেছি রে পূজা।
গেলাস নিয়ে তুই আবার কী করছিলিস!
ওই যে আমাকে তলপ্যান খেতে দিয়েছিল।
পূজা কমপ্লান বলতে পারে না তলপ্যান বলে। পূজা তখন খুব বিরক্ত হয়ে বলবে,
