ঝুল-বারান্দায় বসে বসে দেখি, আকাশ সেই আগের মতোই আছে। বাতাস ধুলো আর ধোঁয়ায়। ভারাক্রান্ত হলেও চেনা যায়। যে কটা গাছ মাল্টিস্টোরিডের ধাক্কা বাঁচিয়ে আজও আছে, সেই আগের মতোই। কুকুর, বেড়াল, কাক, স্বভাব কিছুই বদলায়নি। ভীষণ রকম বদলে গেছে মানুষ। পুরোনো দিনের বড়লোকরা ধুকছে। ফুটিফাটা, পলেস্তারা খসা সাবেককালের বাড়ি। ছাদে জলের ট্যাঙ্ক উলটে আছে। লোহার খাঁচা মরচে ধরে ঝাঁঝরা। যেন টিবি হয়েছে। কেউ দেখার নেই। হয় কোনও বৃদ্ধ, না হয় কোনও বৃদ্ধা। বসে আছে একা শ্মশান জাগায়ে। নতুন বড়লোকরা। এসেছে। পাটি করে বড়লোক, ধান্দা করে বড়লোক, চিটফান্ডের বড়লোক, দালালি করে। বড়লোক। যাত্রা করে বড়লোক, ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা, ক্যাটারিং, সুপারমার্কেট, দোকান, পলিক্লিনিক, নার্সিংহোম। দু-চাকা, চার চাকা, তিন চাকার ছড়াছড়ি। এদের কিশোর, যুবক, যুবতির হাতে কালচারের কন্ট্রোল। এরা যে গান শোনে, সে গান আমার কাছে অর্থহীন শব্দ। এরা যেভাবে চলে-ফেরে, কথা বলে, আমাদের কালে সেটাকে বলা হত অসভ্যতা। এদের মেয়েদের সংক্ষিপ্ত সাজপোশাক আমাদের কালে ছিল গণিকারুচি। ছোট ছোট লাল, নীল লঞ্চেস মার্কা গাড়ি বেরিয়েছে। পুড়ুৎ-পাড়াৎ সামনের রাস্তা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায়। ভেতরে উদোম গান। ওলে ওলে, পেয়ার পেয়ার। কার আবার পেট ফেঁপেছে। ভুটুর ভুটুর। এই প্রজন্মের প্রাণীরা দেখছি কয়েকটা জিনিস ভীষণ ভালোবাসছে। গান, খেলা আর পিকনিক। প্রায় সব বাড়ি থেকেই যখন-তখন বিকট গান ছিটকে বেরিয়ে আসে। বুক ফাটানো তাল বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। যেন। স্বজনহারানো কোনও গোরিলা বুক থাবড়াচ্ছে। এ বাড়িতে গান, তো ওই বাড়িতে শাশুড়ি পুত্রবধূর কাজিয়া। শাশুড়ি-জীবটি সংখ্যায় ক্রমশ কমে আসছে। শহরে আর তেমন চোখে পড়ে।
। মনে হয় প্রতিকূল আবহাওয়া দেখে মাইগ্রেট করে অন্য কোথাও সরে গেছে, শ্বশুর অল্পস্বল্প দেখা যায়। এই প্রজন্ম শাশুড়ি বিদায়ের মতো শ্বশুর বিদায় করতে পারেনি মনে হয় একটি কারণে, সেটা হল প্রপার্টি। হয়তো বাড়িটা শ্বশুরের নামে। শ্বশুর হল দলিল। তাই প্যান্তাখাঁচা মুখে সকালে এক কাপ চা এগিয়ে দিতে হয়। বুড়োর আবার বাঁচার শখ। হার্ট বারদুয়েক হেঁচকি। তুলেছে, চোখে মশারি, শরীরের ফ্রেমটা আছে, মাথা ঝরে গেছে। তিনি এই নরখাদক রাস্তায় মাঝে-মধ্যে কেরদানি করে বেরিয়ে আসেন। দশ-পা হেঁটেই শরীরটাকে টান টান করে বুকটা চিতিয়ে দেখাতে চান, মরদ এখনও শক্তি ধরে। কী বলল হে! যৌবন মনে হয় এখনও যায়নি! কোথাও বসে আছে পোঁ ধরে। আর ঠিক সেই সময় একালের রোডবাগ, কোম্পানির প্রশ্রয় পাওয়া অটো, ছুঁয়িমুয়ি করে নাচতে নাচতে পাশ দিয়ে প্রায় কানকি মেরে ছুটে গেল। নাতির বয়সি। ডনজুয়ান; পাশে পাপড়িচুলো মাই লাভ, শাটিনের সালোয়ারে মোমপালিশ, হেঁকে বলছে, দাদু! ব্যায়াম করছ! কাকে বলছে! সত্তর সালে প্রেসিডেন্সিতে দর্শনের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট ছিলেন। বৃদ্ধ হয়েছেন। যাঁর জীবনদর্শন হল তোমাদের কাছে হারতে চাই না। শেষতক খাড়া থাকতে চাই। কানে কম শোনেন। সেনিলিটি এসে গেছে। ছোকরার ব্যঙ্গ বুঝতে না পেরে মৃদু হাসলেন। ভাবলেন প্রশংসা করছে। যেই এগোতে গেলেন ঘড়ঘড়িয়া স্কুটার। পেছনে ঠ্যাং। বাড়ানো আরোহিণী। ক্যাঁৎ লাথি, কেতরে বেরিয়ে গেল। তা, এত কমের ওপর দিয়ে গেল। যাঁরা এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে আছেন তাঁদের কী কম খোঁয়াড়! অধ্যাপক ঘেরাও। সারারাত ছেলেতে মেয়েতে টাকে তবলা বাজিয়ে গেল। বাথরুমে যেতে দিলে না। শেষে ক্যাথিটার দিয়ে জল খালাস। কোথায় কোন কলেজে যেন প্রিন্সিপ্যাল তিন মাস হল ঢুকতেই পারছেন না। কাছাকাছি এলেই দেখমার করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝুল-বারান্দায় বসে এইসব দেখি। বড়দিন থেকে নিউইয়ার, শুরু হল বাঙালির পিকনিক মরশুম। খোলা ট্রাকে ছেলে আর মেয়েদের পাপুয়া ড্যান্স। সিক সিক সিটি। লাউড স্পিকারে হিন্দি গান। আনন্দে জাগিছে শোনার চাঁদেরা। সারাটা বছর কত কাজ, কত শ্রম, কত সাফল্য, কত উন্নতি, কত কৃতিত্ব। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এইবার আনন্দ কিছু হবে না! নাচতে নাচতে চলো ডায়মন্ড হারবার, বিষ্ণুপুর, ফলতা। পথে ওঁত পেতে আছে আর একদল। গাড়ির পর গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায়। চোলি ধরে টানাটানি। ছোরাছুরি হাসপাতাল।
মাঝে মধ্যে কৈলাস এসে আমার পাশে থ্যাবড়া একটা মোড়ায় বসে।
কী বুঝছিস! এইরকম একটা প্রশ্ন কৈলাস করবেই।
বোঝার তো কিছু নেই। দেখার আছে অনেক।
তোর লাক ভালো। পুত্রবধূটি মনের মতো হয়েছে।
মেটিরিয়াল ভালো ছিল, তার ওপর তনুর ট্রেনিং। যাওয়ার আগে তৈরি করে দিয়ে গেছে। তবে ভাই জাতটা তো পুত্রবধূর। সেটা সবসময় মনে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেই তো মুকেশের গান রাজকাপুরের ঠোঁটে, এ ভাই জেরা দেখকে চলো, আগে ভি দেখো, পিছে ভি।
সহি বাত।
যখন খুশি চা চাইতে পারিস?
ভাই, সাহসে কুলোয় না। তাছাড়া চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস তো আছে! একালের মায়েদের তো দম ফেলার অবকাশ নেই। ডেলি রুটিনটা শুনবি! সকালে সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই তেড়েফুঁড়ে উঠল। বাড়িতে যে কাজের ছেলেটা আছে সেটাকে খোঁচা মেরে মেরে তোলা হল। দেহাতি ছেলে। বাংলা বোঝে না। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কচলাকচলির পরই, বাড়ি কেঁপে উঠল। গানস অফ ন্যাভারোন। মানে পাম্প চালু হল। এরপর চা, নাতনির স্কুলের টিফিন।
