তনু কিন্তু ক্রমশই দূরে সরতে লাগল। হচ্ছে না, এসব ঠিক হচ্ছে না। সেই আগের তুমি অনেক ভালো ছিলে। কোনও ব্যাখ্যা নেই। কেন, ভালো ছিলুম। তখন নাকি আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। বোঝাতে পারিনি, স্বপ্ন ভালো, না স্বপ্নকে বাস্তব করাটা ভালো। একটা লোক সারাজীবন চটে শুয়ে রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। সে তো অপদার্থ।
রোজ রাতে তনু কাঁদে। কাঁদছ কেন?
তোমার মৃত্যু হচ্ছে।
আমাদের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, মোটা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স। বছরে একবার ফার্স্ট ক্লাসে চেপে। সপরিবারে বিদেশভ্রমণ। তোমাকে সাজাব, তোমাকে খাওয়াব, তোমাকে সুখের সাগরে পদ্মফুলে ভাসাব।
যদি পারো, যদি বাপের ব্যাটা হও, মাস্টারমশাইয়ের মতো হও। কিছু ভালো ছেলেকে পড়াও, জীবন তৈরি করো। না হয় কিছু কমই খেলে। না হয় মোটা কাপড়-জামাই পরলে।
তনুর একই উপদেশ রোজ শুনতে শুনতে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে লাগল। আমার একটা ভুঁড়ি হয়েছে। মুখের ধারালো ভাবটা কমে এসেছে। ক্রমশ গোল হচ্ছে। দুটো চিবুক হয়েছে। কথাবার্তার ধরন পাল্টেছে। এমন কিছু লোকের সঙ্গে স্বার্থের খাতিরে মিশতে হচ্ছে যারা অসৎ। না, ভালো হচ্ছে না। সাতশো টাকা নিয়ে আমাদের সেই পুরী ভ্রমণ, সি-বিচে সেই দৌড়, সেই ঝিনুক কুড়োনো, সেই ঢালাই উনুন নিয়ে বাড়ি ফেরা, চারটে ডাঁসা পেয়ারা। কোন জীবনটা ভালো ছিল। প্রেম বড়ো, না প্রতিপত্তি বড়।
খুব বাঁচা বেঁচে গেলুম। কৈলাসের মাইমাই ল্যংটা মারলেন। কৈলাস আর আমি ছিটকে বেরিয়ে এলুম। কেজি, মন্তেসরি, কোচিং সবই রইল—আমরা রইলুম না। প্রিন্সিপ্যাল হয়ে বসলেন প্রফেসর চক্রবর্তী। তিনি স্যুট পরেন, মুখে বায়ু চুরুট। কৈলাসের মাইমার বয়কাট চুল, রেগে গেলে বাংলা বলেন, নয় তো ইংলিশ। আমাদের কয়েক হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলে। কৈলাস ফিরে এল তার পুরোনো ছাপাখানায়। আমি বেকার। জগন্নাথস্বামী নয়ন পথগামী ভবতু সে।
এইবার কী হবে তনু?
এইবার ঠিক হবে। ছাত্রছাত্রীর অভাব হবে না। বাড়িতে বসেই শুরু করা যাক। সকাল-বিকেল শুরু হয়ে গেল ছেলে পড়ানো। দেখতে দেখতে কুঠিয়াটা হয়ে উঠল গুরুগৃহ। মাস্টারমশাই। কেউ মাইনে দিতে পারে, কেউ পারে না, কিন্তু ভারি সম্মান। ভবিষ্যতের কারিগর। কষ্ট খুব, কিন্তু খুব সুখ। কিছু কিছু উৎকৃষ্ট ছেলেমেয়েও আসতে লাগল। যাদের শুধু লেখাপড়া নয় জ্ঞানও হবে। পড়াতে গিয়ে নিজের পড়াশোনাও বেড়ে গেল। মাথাটাও খুলে গেল। বাড়িতে প্রায় সব সময়েই বিদ্যাচর্চা। লক্ষ্মীর আড়ত থেকে মা সরস্বতীর আখড়া। তনুর এখন এক নয়, অনেক ছেলে।
মাস্টারমশাই যেমন বলতেন, আমিও সেইরকমই বলি, মশাই এর হবে না। ব্যর্থ চেষ্টা করবেন না। বরং কোনও লাইনে ফেলে দিন। লেখাপড়া মানে শুধুই ডিগ্রি, ডিপ্লোমা নয়, সব শিক্ষাই শিক্ষা—প্লাম্বিং, কার ড্রাইভিং, ইলেকট্রিশিয়ান। কিছু করে যাতে জীবনে দাঁড়াতে পারে। যা হয় না, তা হয় না। গলা নেই গান, শরীর ভাঙে না নাচ, দেখার চোখ নেই ছবি আঁকা। ভেতরে না। থাকলে বাইরে তার প্রকাশ পায় না। স্বামীজির কথা।
পয়সাঅলা অভিভাবকরা রেগে যেতেন। অনেকেই বলতেন দুমুখ। ব্যাটার খুব ট্যাঁক ট্যাঁক কথা। এইভাবে গোটা কুড়ি ছেলেমেয়ে বেশ ভালো তৈরি হল। বড় বড় জায়গায় গিয়ে বসল। আদর্শ। মানুষ হয় তো সবাই হল না তবে শিক্ষিত হল। বড় জীবনের দিকে চলে গেল। মাস্টারমশাইকে হয়তো মনে রাখলে না, কিন্তু মাস্টারমশাইয়ের মনে তারা রইল।
এই সময়েই তনু বললে, দোতলাটা তোলা যাক। ঘরের দরকার হবে। নীচেটা ড্যাম্প। তোমার ব্রঙ্কাইটিস হয়েছিল। মাঝেমাঝেই তেড়েফুঁড়ে ওঠে। দোতলায় রোদ পাবে। খোলামেলা বাতাস। অনেক দূর দেখা যায়। টাকা কিছু জমাতে পেরেছি টেনেটুনে সংসার চালিয়ে। মনে হয় হয়ে যাবে।
বাড়ি দোতলা হল। একটা মনের মতো বারান্দা। তিনখানা শোবার ঘর। বাথরুম। দুটো বেতের চেয়ার কেনা হল। রাতের দিকে পাশাপাশি দুজনে বসি। তনুর চুলে পাক ধরেছে। শরীরটা ভারী হয়েছে। আজকাল আগের মতো আর খাটতে পারে না। খাটার অভ্যাসটা অবশ্য যায়নি।
সবাই বলে, আমাকে নাকি আমার বাবার মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে। স্বভাবটা যে তাঁর মতো হচ্ছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। লোভ প্রায় চলেই গেছে। কামনা-বাসনা কুঁকড়ে গেছে। চাটুকারিতা সহ্য হয় না। বাইরেটা আর ভালো লাগে না। নিজের ভেতরেই থাকতে ইচ্ছে করে। সব এত পালটে গেছে! এখন কোনও ছেলে একটা লেটার কম পেলে তার বাবা-মা এসে চোখ রাঙায়। এটা কী হল মাস্টারমশাই!
বেতের চেয়ারটায় কী আছে কে জানে। বসলেই নানারকম ভাব আসে। কৈলাস সেদিন বেশ বলেছিল, দ্যাখ, আমরা কীরকম বসে বসে বুড়ো হয়ে গেলুম। কোনও চেষ্টাই করতে হল না। সব কিছুর জন্যে কসরত করতে হয়, বুড়ো হওয়ার জন্যে কিছুই করতে হয় না। খেয়ালই ছিল না, কবে চোখে চশমা উঠল। বাইফোকাল হল। মুখগহ্বরে জিভ একদিন আনমনা ঘুরতে ঘুরতে
আবিষ্কার করল, তিনটে দাঁত নেই। সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁটু একদিন অনুভব করল জল শুকিয়ে এসেছে। পেট একদিন ঘোষণা করল, পরিপাক শক্তি দুর্বল হয়ে এসেছে। গুরুপাক সহ্য হচ্ছে। ভোরবেলা আর শিস দেওয়া পাখির মতো ফুড়ুত করে বিছানা থেকে উড়ে যেতে পারছি না।
