ওই সময়টা শুয়ে শুয়ে প্রায়ই আমাদের এই রকম কথা হত, ইনকামটা যদি কোনওরকমে আর পাঁচশো টাকা বাড়ত, তাহলে আর আমাদের এত দুশ্চিন্তা থাকত না। মাত্র পাঁচশো টাকা। তনু। সংসার চালায়। ফাইনান্স মিনিস্টারের মতো বাজেট করে। তিনি বছরে একবার করেন, তনু মাসে একবার। কখনও এইটায় হেঁটে ওইটায় লাগায়, কখনও ওইটা হেঁটে এইটায়। ছাঁটকাটের কারবার।
প্রায়ই দেখতুম ঠাকুরঘরে চোখ বুজে আছে স্থির হয়ে। ভগবানই ভরসা। অঘটন যদি কেউ ঘটাতে পারেন তিনি ভগবান। গরিবের ভরসা তিনি। মানুষ এইরকম ভেবে আসছে চিরকাল। বারের। উপপাস, সন্তোষী মা সবই চালু হয়ে গেল। কার ক্ষমতা বেশি জানা তো নেই। কামনা তো অনেক, সুসন্তান, রোজগার, সুস্বাস্থ্য, সুগৃহ, মানসম্মান, প্রতিপত্তি। একটু বড়লোক হতে পারলে মন্দ কী।
সবচেয়ে সস্তার মাতৃসদনে আমাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হল। নিখুত একটি পুত্র। হাত-পা বেশ বড়সড়। চোখ দুটো সুন্দর। ফরসা রং। নর্মাল ডেলিভারি। তনু ভোগেনি, তনু ভোগায়নি। কর্মী মেয়েদের এই রকমই হয়। ওই যে রোজ দু-ঘণ্টা ধরে ঘর মুছত, রান্নাবান্না, জল তোলা, ওইটাই তো সেফ ডেলিভারির কারণ মশাই। বিপদ তো অলস বড়লোকদের।
দুই থেকে আমরা তিন হয়ে গেলুম। তরতর করে বাড়তে লাগল আমাদের সন্তান।
এই সময় অদ্ভুত যে ঘটনাটা ঘটল সেটাও তো বলা দরকার। ক্যারাম খেলার একটা মার আছে, সেটাকে বলে ট্যানজেন্ট। সরাসরি খুঁটিটাকে মারা হবে না, একটু কায়দার মার, রিবাউন্ডও আর এক কায়দা। স্ট্রাইকারটা প্রথমে বোর্ডের ধারের কাঠে গিয়ে লাগবে, সেখান থেকে ছিটকে এসে। খুঁটিটাকে পকেটে পাঠাবে। সেইরকম একটা ঘটনাই ঘটল আমার জীবনে। রিবাউন্ড এফেক্ট। একটি ছেলে আমার কাছে পড়ত। সরলা মেমোরিয়ালের ছাত্র। সে হঠাৎ স্কুল ফাইনালে থার্ড হয়ে গেল। কৃতিত্বটা তারই, আমি নিমিত্ত মাত্র। সেই ছেলেটির পাশাপাশি আমারও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। হবে না কেন, মাস্টারমশাইয়ের ছেলে তো। ওর কোচিং-এর ধরনটাই আলাদা।
আমিও মাস্টারমশাই হয়ে গেলুম। রাস্তায় বেরোলেই, মাস্টারমশাই কেমন আছেন? সৌরভ সাতটা লেটার পেয়েছে। আপনার কোনও তুলনা নেই। মাস্টারমশাই। দোকানে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই, আরে আরে মাস্টারমশাইকে আগে ছেড়ে দে। কী চাই মাস্টারমশাই। ঢিপঢ়াপ প্রণামও জুটতে লাগল। বাসে উঠে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ বসার জায়গাও দিতে লাগলেন।
নীলাচলে সন্তানলাভ। স্বয়ং জগন্নাথ। তারপরেই বোধহয় এই সৌভাগ্যোদয়। তাহলে নাম রাখ নীলাচল। কৈলাস বললে, এই সুযোগ, চেপে ধর, লাইন খুলছে।
লাইন মানে?
লাইন মানে মানুষ ক্রমশ বোকা হচ্ছে। সবাই ভাবছে, ছেলেমেয়ে ডিগ্রি ডিপ্লোমা ডক্টরেট পেয়ে ইউরোপ আমেরিকা যাবে, আই এ এস করবে। যতদিন সাহেবরা ছিল, ততদিন বাংলার কদর। ছিল। এখন সব ইংলিশ। কিছু লোকের হাতে পয়সা এসেছে, তারা সাহেব হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এই সুযোগ, মাস্টারমশাইয়ের নামে একটা মডেল, কেজি স্কুল খুলে ফেল, আর একটা কোচিং সেন্টার। তনুকেও কাজে লাগা। ম্যানেজমেন্ট আর প্রচারের দায়িত্ব আমার।
জায়গা?
সেটাও আমার দায়িত্ব। শিক্ষা আর স্বাস্থ্য—এর চেয়ে ভালো ব্যবসা আর নেই। কোচিং সেন্টার, নার্সিংহোম।
শেষে জোচ্চুরি!
জোচ্চুরি কোথায়!
এ অনেকটা ভাঙা বাড়ির দরজা-জানালা, মার্বেল পাথর বিক্রি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দু-দলের মারদাঙ্গায় লাটে উঠেছে, হাসপাতাল পাতালে গেছে। এই ভাঙা আসরে আমরা তবলা বাজাব। টুইঙ্কল, টুইঙ্কল লিটল স্টার, হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইউ আর। বাঙালি বিবি, জেন্টলম্যান। স্টিংকিং মানি অ্যাম্বিশন। এর নাম হল প্যারালাল সিস্টেম। ঝোপ বুঝে মারো কোপ।
এখানে ওসব চলবে?
এখানে নয় ম্যান। এতকাল তোমার ভাগ্যসূর্য উত্তরায়ণে ছিল, এইবার দক্ষিণায়ণে যাবে। অর্থাৎ এটা আমরা করব সাউথে।
মোটা ছেলে, রোগা ছেলে, ছিচকাঁদুনে ছেলে, তেওঁটে ছেলে, একবপ্না ছেলে, ঘাড় কাত মেয়ে, খ্যাঁতখেতে মেয়ে, মুখরা মেয়ে, নীরব মেয়ে, যেখানে যত ছিল সব নিয়ে শুরু হয়ে গেল ইংলিশ মিডিয়াম। কৈলাসের কেরামতি, বিধবা মাইমাকে ভুজুং ভাজং দিয়ে মামার বাড়ির খানিকটা। ম্যানেজ করেছিল। মামা নামকরা ডাক্তার ছিলেন। বাড়িটাও বিশাল। খোলামেলা জায়গা। অনেকটা। টাকাটাও কৈলাস জোগাড় করেছিল। প্রচারেরও অভাব হয়নি।
তনুর কিন্তু ভালো লাগেনি এইসব। তুমি অন্যায় করছ, মাস্টারমশাই বেঁচে থাকলে তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করতেন। তুমি ব্যবসা ফেঁদেছ। তুমি তাঁর আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছ। অভাব আর আদর্শ হাত ধরাধরি করে চলে। কে তোমাকে বড়োলোক হতে বলেছে? আমরা তো বেশ আছি।
লোভ যে আমার ছিল না, তা নয়। মনে হয়েছিল, বাপ-ঠাকুরদার আমলের জীবন থেকে বেরিয়ে আসি। ছেলেটাকে মানুষ করি। বিলেত পাঠাই। সেনগুপ্তর শাসন থেকে বেরিয়ে আসি। মনের মতো একটা বাড়ি করি। সামনে-পেছনে বাগান। ঢুকেই সামনের দেয়ালে অয়েলে আঁকা মাস্টারমশাইয়ের ছবি। আমার মায়ের কোনও ছবিই নেই। জানিই না কেমন দেখতে ছিলেন তিনি! কার্পেট মোড়া বসার ঘর। মনের মতো একটা লাইব্রেরি। এই সব যদি হয়ই, মাস্টারমশাইয়ের আত্মা কেন রাগ করবেন।
আমি কৈলাসের মুঠোয় চলে গেলুম। কৈলাস ব্যবসা বোঝে। আমাদের কোচিং সেন্টার ক্রমশ বড় হতে লাগল। নোটস আজ সাজেশনের খুব নাম হল। কম পড়ে অনেকেই পাস করতে চায়। ক’জন আর শিক্ষিত হতে চায়। আমাদের কেজি স্কুলের তাক লাগানো ভড়ং। ড্রেস, খাতা, বই, ডিসিপ্লিন, মাইনে—সব মিলিয়ে সমীহ করার মতো একটা ব্যাপার।
