দোর তালা বন্ধ করে। হেঁশেল-র্টেসেল গোছগাছ করে। আলো নিবিয়ে, টুক করে পা তুলে মশারিতে ঢুকে পড়া। খোঁপাটা আলগা করে বালিশে মাথা। দিনের যুদ্ধ শেষ। রাতের বিরাম। ডায়েরিতে লিখে রাখার মতো কোনও দিন নয়। অনেক দিনের একটা দিন। সকালে পড়ে থাকবে আলোর গায়ে আছাড় খাওয়া মরা বাদুলে পোকার মতো।
একটা হাত বুকে এসে পড়বে। ভারী একটা পা চেপে আসবে তলপেটে। ঘাড়ের কাছে গরম নিঃশ্বাস। ঘনিষ্ঠতার সুখ। মাথার ছাত, চারপাশের দেয়াল সরিয়ে দিলেই বড় অসহায়। মানুষের বর্ণমালার ছেড়া দুটো অক্ষর, ক আর খ। হা হা আকাশের তলায় কুচো চিংড়ি। এই সংকীর্ণতাতেই মহতের স্বপ্ন। এই সময় জড়াজড়ি করে যত আশা-আকাঙ্ক্ষার মালা গাঁথা। দু চারটে হাই, টান শরীর ক্রমে শিথিল। কথা জড়াতে জড়াতে এক সময় তলিয়ে যাওয়া ডুব। সাঁতার। যেখানে থাকা সেইখানেই থাকা। যায় না কোথাও। শুধু দিনটা মাড়িয়ে চলে যায়। বোঝাও যায় না, মৃত্যুর দিকে আরও এগিয়ে যাওয়া গেল।
লিভার, পিলে, ফুসফুস আরও সেকেন্ডহ্যান্ড হয়ে গেল।
তনু জিগ্যেস করলে, তোমার পকেটের খবর কী?
কেন বলো তো! সেই কানের দুল?
ধুস, দুল কী হবে! আমাকে একটা ভালো ঢালাই করা তোলা উনুন কিনে দেবে! কাগজে বিজ্ঞাপন দেখছিলুম। বেশ অনেকদিন টিকবে। ভালো আঁচ হবে। সহজে ধরবে, কম কয়লা লাগবে। এই বালতির উনুন একেবারে টেকে না।
এই তোমার চাহিদা! কালই আমার সঙ্গে চলো। কিনে দেবো।
খুব বেশি দাম হলে কিনব না! সামনে অনেক খরচ।
তনু তখন মা হতে চলেছে। সেই যে সমুদ্র, সেই যে ফেনা, সেই যে ঝিনুক সেই যে রাত। আমাদের সন্তান আসছে। শ্রীক্ষেত্রের দান।
কত আর দাম হবে। চলোনা দেখাই যাক।
একটা বড় কিছু হতে চলেছে, সেই আনন্দে তনু আমাকে পাশ বালিশ করে ফেলল। শরীরটা ভারী হয়েছে। মধ্যভাগের স্ফীতিতে ঘনিষ্ঠতার ব্যবধান বেড়েছে। আমার আর তনুর মাঝে আর একটা প্রাণ। শরীরে আড়ালে টলটল করছে, তালশাঁসের মতো। আনন্দ হচ্ছে, উদবেগ। আবার এও মনে হচ্ছে যাঃ তনু মা হয়ে গেল।
কানের কাছে মুখ এনে লাজুক গলায় বললে, হ্যাঁগো বাজারে পেয়ারা উঠেছে? বেশ ডাঁসা ডাঁসা।
উঠেছে।
পয়সা কুলোলে আনবে? খুব খাই খাই বেড়েছে। ঝাল ঝাল চানাচুর, লেবুর আচার। মনে হয়, এটা ছেলে। তনুর শ্বাসে দুধের গন্ধ লেগেছে। ত্বক খুব তেলতেলে হয়েছে। তনু আর প্রেমিকা রইল না। সংসারে ঢুকে গেল। ক্লান্ত তৃপ্ত। ঘুমিয়ে পড়ল। আমার সঙ্গে মাছের মতো খেলা করার ক্ষমতা নেই।
একটা উনুন, ডাঁসা পেয়ারা, আচার, চানাচুর—এই চাহিদা। এই খাঁচার এই দুই প্রাণীর এই হল জগৎ। একটু আগে রাশিয়ার নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন, তাঁর নভোযান থেকে বেরিয়ে মহাকাশের নিরালম্ব ভাসমানতায় বিচরণ করে বিশ্বমানবকে স্তম্ভিত করে দিয়েছেন। মহাকাশে। মানবের জয়যাত্রার সূচনা। আবার ওদিকে পূর্ব ও পশ্চিমকে আলাদা করতে বার্লিনে পাঁচিল তুলেছে কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্ট-খপ্পর থেকে মানুষ যাতে পশ্চিমের ধনতন্ত্রের প্রাচুর্যে, ভোগে, উন্নত জীবনে না পালাতে পারে। হো চি মিন-এর ভিয়েতনামে ভয়ংকর যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছে। বিলাসবহুল ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের বাজারে মাছের দাম কমছে না। চিনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘোলাটে হচ্ছে। কাশ্মীর নিয়ে ধুন্ধুমার। আমি মশারির ভেতর, আমার পাশে তনু। ঘুমে অচৈতন্য। ছোট্ট কপালে সিঁদুরের টিপ। ঠোঁটের কোণের হাসি কাঁপছে। স্বপ্ন দেখছে কোনও। ভীষণ সবুজ একটা মাঠ, নীলের চেয়েও নীল আকাশ। দিগন্তের দিক থেকে। একটি শিশু টলমলে পায়ে সামনে দু-হাত তুলে হেলে-দুলে ছুটে আসছে। সবকালের সব মানুষই এই ভাবে প্রবেশ করে। হো চি মিন, গ্যাগারিন, কেনেডি, দ্য গল, রাসেল, আইনস্টাইন। আসবে, তারা হাজারে হাজারে কাতারে কাতারে আসবে। বর্ষার গঙ্গায় চিতি কাঁকড়ার মতো। কেউ চাপা পড়বে, কেউ যুদ্ধে মরবে। কিছু বিপ্লবে নাচতে গিয়ে শহিদ হবে, কেউ শুধু প্রাণধারণ করবে, কাঁধে করে কারওকে গদিতে বসানো হবে, কেউ মালিক হবে, কেউ মজুর, আবার কেউ কেউ হবে স্ট্যাচু।
খুব সাবধানে ভয়ে ভয়ে তনুর পেটে কান ঠেকালুম। কী রে ব্যাটা। কে এলি। কী করছিস ওই। অন্ধকারে। থই থই জল। আর এক শঙ্করাচার্য, নাকি শ্রীচৈতন্য, গৌতম বুদ্ধ, বলরাম, বাসুদেব। শোনোবৎস, বড় অভাবের সংসার। তোমার মায়ের সাকুল্যে সাতখানা শাড়ি। সোনা-দানা তেমন নেই। মাছ, মাংস, ডিম স্বপ্ন। টিনের দুধের দাম বেড়েছে। রোজগারের ক্ষমতা আমার তেমন নেই। সবাই বলে মাথামোটা। তোমার মায়ের মাথা খুব ভালো। চাকরির বাজারে নামলে সংসার সম্পদে ভেসে যেত। এখন ভেতরে ভেসে ভেসে মায়ের মাথাটি নেওয়ার চেষ্টা করো, আর তোমার ঠাকুরদার আদর্শের উত্তরাধিকার। আমরা পার্টনারশিপে তোমাকে এনেছি বটে, তবে আমি হলুম স্লিপিং পার্টনার। আমার কোনও কিছু নেওয়ার চেষ্টা কোরো না। তাহলেই বিপদ। তাহলে নীল আকাশ তোমাকে পাগল করবে, চাঁদের আলোয় ঝিরিঝিরি গাছের পাতা দেখে। রবীন্দ্রসংগীত গাইতে ইচ্ছে করবে, পাখিদের জটলায় সময় ভাসিয়ে দেবে। একতাল মাটি নিয়ে মূর্তি গড়তে বসবে, বৃদ্ধার কাছে গিয়ে পুরোনো দিনের গল্প শুনতে চাইবে। কোনও দরবেশের পেছনে পেছনে অকারণে অনেকটা পথ চলে যাবে। নদীর গান শুনতে ইচ্ছে করবে, মানুষকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে। মন্দিরে গিয়ে আরতি দেখতে ইচ্ছে করবে। প্রেম করতে ইচ্ছে। করবে। এমন সব কাণ্ড তুমি করতে থাকবে যার ফলে নুন আনতে পান্তা ফুরোবে। অভাব, অপমান, উদবেগ। সকলের পৃথিবী তোমাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে। ভোগ করতে পারবে না। কিছুদিন দর্শক হয়ে জীবন কাটাবে। ধূর্ত হও, শঠ হও, নিষ্ঠুর হও, হৃদয়হীন হও, স্বার্থপর হও, বেইমান হও। পৃথিবীটা শয়তানের।
