আমি যে তখন অঘ্রান মাসের মুলোর মতো তরতাজা। তনু লকলকে পালং। আমি একটু একটু করে তার দিকে এগোচ্ছি। একটা সাপ খেলা করছে পিঠের দিকে। তনুর ঘাড় বেয়ে, পিঠের ঢাল বেয়ে আমার নাক নামছে। ঠোঁট দুটো ত্বক ছুঁয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ কোমরে। বেড় দিয়ে শরীরের সামনের দেয়াল ধরে ওপরে উঠছে। নরম দুটি ফল। মখমলের মতো গিরিপথ। খসখসের মৃদু গন্ধ। পাখির ঠোঁট ফল ঠোকরাবে। ক্রমশই বর্বরতা বাড়ছে। ডানার ঝাপট মারছে পাখি। রাতের জোয়ার এসেছে সমুদ্রে। গর্জন ভীষণ। ছেড়া আকাশে তারার চুরমার। নুনের গন্ধ। কিরকিরে। বালি। জঘনের স্বাদ। ছড়ানো ঝিনুক। এনামেলের শব্দ। কোনও কথা নেই। শুধু শ্বাসের হাপর। ছাড়ানো চুলে ফোঁটা গন্ধরাজ মুখ। কপালে কেঁপে যাওয়া টিপ। আবেগে আধবোজা চোখ। ফসফরাসের ভাস্কর্য।
অনেক অনেক পরে ছড়ানো ঝিনুকের মাঝে উঠে বসল তনুশ্রী। ঘামে ভেজা পিঠ। কপালে চুল নেমে এসেছে। গড়ুরের ছিন্নভিন্ন ডানার মতো সাজপোশাক চারপাশে ছড়ানো। লজ্জা নিয়ে। একপাশে বসে আছি। ঝড় চলে যাওয়ার পর ভাঙা বোতলের উপলব্ধির মতো। তনু সেই অনাবৃত অবস্থাতেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার শরীরে। জীবন্ত আবেগ।
হোটেলের সামনে স্বর্গদ্বারের পথ নির্জন। ঘুমিয়ে পড়েছে সব দোকান। বাতাসের বালি নিয়ে খেলা। সমুদ্রের ঢেউয়ে শঙ্খের গর্জন। উদবেল কুরুক্ষেত্র। ঢেউ সব পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষীয় সৈন্যসামন্ত। মহারথীরা সব শাঁখ বাজাচ্ছেন। পাঞ্চজন্য হৃষিকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ। শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্য, অর্জুনের দেবদত্ত, ভীমের পৌন্ড্র, যুধিষ্ঠিরের অনন্তবিজয়, নকুলের সুঘোষ, সহদেবের মণিপুষ্পক। সমুদ্র থেকে একের পর এক সেই শাঁখের শব্দ।
সব ঝিনুক একে একে কুড়িয়ে একটা বেতের ঝাঁপিতে রাখা হল। ঝিনুকের গয়না আর একটায়। শুয়ে কী হবে! রাতের আর কতটুকুই বা পড়ে আছে তলানি। সমুদ্রের সামনের রাস্তায় নেমে এলুম আমরা দুজনে। যতটা পারা যায় ভোগ করে নাও। দুঃখ কষ্ট অভাব অভিযোগ চাবুক আছে, থাকবে, থাক। এরই মধ্যে থেকে আনন্দটা নিংড়ে নিতে হবে। কয়েক ফোঁটা যা পাওয়া যায়। তনু আর আমি হাত ধরাধরি করে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে হাঁটছি। রাজবাড়ির দালানে, চার-পাঁচটা লোক আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আমরা হাত দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটছি। পুলিশ চৌকির পাশ দিয়ে সমুদ্রকে ডান দিকে রেখে। হঠাৎ তনু বললে, তোমার খিদে পাচ্ছে না!
তনু এই ভাবেই কথা বলত, আমার খিদে পেয়েছে। আমার ঘুম পেয়েছে, বলবে না।
এক কাপ চা, কিছু খাবার পেলে মন্দ হত না। তেমন কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। মাঝরাতের বাতাস ছাড়া আর কী পাওয়া যাবে! আমরা আরও অনেক দূরে যেতে পারতুম। টহলদার পুলিস বললে, হোটেলে ফিরে যাও। কিছু খারাপ লোক এই সময় ঘুরে বেড়ায়।
জীবনের সমস্ত বালি চালুনি দিয়ে চালতে চালতে এইরকম দু-একটা সোনার কুচি চকচক করে ওঠে। খুব পয়সাতেই যে খুব সুখ এমন কথা আর বলতে পারব না। আমাদের পুরোনো বাড়ির টিনের চালের রান্নাঘর থেকে বর্ষার বোদা সকালে ভারী আকাশের দিকে যখন ইলবিলি করে। কয়লার উনুনের ধোঁয়া উঠত, তখন ভাঙা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে দেখতুম, ছোট্ট মানুষের ছোট সুখ। একটা নতুন দিনের আরতি। পাহাড়ি কম্বলের উষ্ণতায় ছেয়ে যেত মন। যা। আছে তাই দিয়েই তনু রাঁধবে। চাকি-বেলনের ঠকাস ঠকাস শব্দ। গরম রুটির খসখসে গন্ধ। আলুর তরকারি। টিফিন কৌটো রেডি। ন’টার সময় দৌড়োবে ছোকরা। দরজায় দাঁড়িয়ে হাসি মুখে দুর্গা দুর্গা। দেরি কোরো না। ছাতাটা হারিয়ে এস না। পারলে একটু চা এনো। আজ একজোড়া বর্ষার জুতো কিনবে। কিনবেই কিনবে।
মস্ত বড় পৃথিবী। কোটি কোটি মানুষ। বিশাল হিমালয়। বিপুল নায়াগ্রা ফলস, বিশ্রী রকমের বড়লোক রফফেলার, ভয়ংকর মাথা আইনস্টাইন, বিধ্বংসী অ্যাটম বোমা, সনি লিস্টনের ঘুসি, জাপানি সামুরাই, রানি এলিজাবেথ, সুন্দরী মেরিলিন, সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস, হোয়াইট হাউস, তারই মাঝে অখ্যাত পাড়ায় অজ্ঞাত একটা লোক। আকাশের অনেক নীচে। হাজার তিরিশ ইটে গাঁথা একটুকরো বাড়ি। শ্যাওলাধরা ছোট্ট একটা উঠোন। কলঘর। টিনের দরজা। খোলে দড়াম শব্দে। শিকলের ঝনাৎকার। হ্যান্ডপাম্পের ঢং ঢকং। এপাশ থেকে ওপাশ তার। ঝোলা লাল গামছা, আটপৌরে শাড়ি। বল সাবান। ক্ষার ফোঁটাবার লোহার কড়া, কয়লা ভাঙার হাতুড়ি। টবে টবে গোটাকতক রিকেটি গাছ। ফুলের আশা! ভাঁজ করা বস্তার পাপোশ। আনাজের ঝুড়ি, আঁশ আর নিরামিশ দু-ধরনের বঁটি। মা লক্ষ্মীর পট, লক্ষ্মীর ঝাঁপি। খোবা মতো একটা মেনি বেড়াল। ছোট্ট একটা টেবিল। পৃথিবীর লাখ লাখ কিউবিক ফুট কাঠের মাত্র কয়েক কিউবিক ফুটে তৈরি। তার ওপর ছোট্ট একটা আয়না। কোটি মুখের একটা মুখ। ছোট্ট বুরুশ, সাবানের। ফ্যানার দলা। দাড়ি চাঁচা। এতটুকু একটা ব্যাগ বগলে খাঁচার দরজা খুলে বাজারে। বিশাল হল। আতঙ্কের, ভয়ের। সেটাকে যত ছোট করা যায় ততই সুখের। দুটো প্রাণীর ভাব-ভালোবাসা। গায়ে গা লাগিয়ে বসা। দেহের উত্তাপ। মনে থেকে মনে সেতু নির্মাণ। সাগর বন্ধনের চেয়ে আনন্দের। তুচ্ছ কিছু কথা। ঘটি, বাটি, গামলার সুখ। ঘোড়ার পিঠে তরোয়াল হাতে রাজ্য জয়ের স্বপ্ন নয়, একটা তোলা উনুনের স্বপ্ন।
