সাতটা দিনের স্বাধীনতা। মানুষ হিসেবে কোন ক্যাটিগোরিতে পড়ছি, সে বিচার নেই। কোনও কাজের কোনও কৈফিয়ত কারওকে দিতে হবে না। সমুদ্র সৈকত ধরে তনুশ্রী ছুটছে চঞতীর্থের দিকে, পেছনে আমি। কেউ বলার নেই, এটা অসভ্যতা। হঠাৎ পাশাপাশি বসে পড়া। শুনে শেখা গানের একটা-দুটো লাইন কোরাসে, এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু, একটি সে নাম আমি লিখেছিনু। বসে থাকতে থাকতে সমুদ্রের নোনা বাতাসে তনুশ্রীর গা চটচটে হয়ে উঠত। চিরদিনের কথা ভেবে মনে দুঃখ জমত। জানালার গরাদ ধরে এসে দাঁড়াত ছেলেবেলা। অনন্তের গায়ে অন্ধকার সমুদ্রের ফসফরাস নৃত্য দেখতে দেখতে একদিন যে চলে যেতে হবে, এই বিষণ্ণতা আসত। আমি হঠাৎ তনুশ্রীর হাত চেপে ধরতুম। যেন যেতে নাহি দিব। আমাদের মধ্যে তখন এইসব কথা হত, তনুশ্রী ঢেউয়ের ওপর দিয়ে কথা বললে,
কী হল কী তোমার! ভয় করছে?
ভয় নয়, আমরা ফুরিয়ে যাচ্ছি।
কাঁচা বয়সের শেলি, কিটস, ব্রাউনিং পড়া বাঙালিরা পাশে মহিলা থাকলে এইরকম ন্যাকা ন্যাকা কথা বলতে ভালোবাসে। চলে যাওয়া সময়ের কথা। জীবনের নশ্বরতার কথা। প্রকৃতির চিরবিদ্যমানতার কথা। এই যেদিন রব না পাশে, ডাকিব না প্রিয়তম। যদিও পোড়ানো হবে, তবুও বলব, শূন্য সমাধি মোর ঢেকে দিও ফুলদলে। চার চৌকো পাথরের বেদি বড় রোমান্টিক। অভিমানের আধার। প্রেমের ঝরাপাতা, বিরহের জলে প্যাঁচপ্যাচে। হাতুড়ি পিটে যাদের খেতে হয় না, তাদের কথাবার্তা এই রকমই, ললিপপ মার্কা। মদের মতো এইসব কথার কিক আছে।
তনুশ্রী আমার কাঁধে হাত, পিঠে মাথা রেখে বলেছিল, ভয় কী, আমরা দুজনে তো একসঙ্গেই ফুরোচ্ছি। আমরা দুজনে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাব। সমুদ্রের ওইখানে, এই জায়গাটায় আমাদের বসে থাকাটা পড়ে থাকবে। অন্য কেউ এসে বসবে। আবার অন্য কেউ।
খুব বড় মাপের কথা বলার প্রতিভা আমাদের ছিল না। সে থাকলে তো কত কথাই করতুম। প্রথম শীতে গায়ে কাঁথা, জমাট শীতে লেপ, পোস্তর বাটি চচ্চড়ি, পুঁইশাকের ছ্যাঁচড়া, চুনো মাছের ঝাল, এই তো জীবনের বহর। সে আর ব্ল্যাকহোলের মতো সর্বগ্রাসী কথা বলে কী করে!
তনু অবশ্য সলিড কথা থেকে লিকুইড কথায় চলে গিয়েছিল। কান্না। কাঁদছ কেন?
—এমনি, ভালো লাগছে।
এই সিচ্যুয়েশনে একটা গানের প্রয়োজন ছিল। বাঙালির প্রেমিক ছেলে, একদিকে ভুসভুসে বালি, সামনে ধপাস ধপাস অন্ধকার সমুদ্র, পিঠে একটা নরম রোদভরা প্রাণী—এই সব উপাদানের মধ্যে বসে একটা রবীন্দ্রসংগীত সামান্য ভুল সুরে গাইবে না! এমন ব্যতিক্রম তো হতে পারে না।
বেশ গলা হাঁকিয়ে ধরে ফেললুম। বেশ উপযোগী একটি গান—
কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে
নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে…
সঙ্গে সঙ্গে তনুও কুঁই কুঁই করে উঠল।
তোমার অভিসারে যাব অগম পারে
চলিতে পথে পথে বাজুক ব্যথা পায়ে…
হাত সাতেক দূরে অন্ধকার থেকে একজোড়া গলা বলে উঠল, বলিহারি, বলিহারি। চার গলায় গান যে হল,
পরানে বাজে বাঁশি, নয়নে বহে ধারা
দুখের মাধুরীতে করিল দিশাহারা।
সকলই নিবে কেড়ে, দিবে না তবু ছেড়ে
মন সরে না যেতে, ফেলিলে একি দায়ে…
এই, সকলই নিবে কেড়ে-তে এসে আর পারা গেল না। গলা ভারাক্রান্ত। দু-চারবার হ্যাঁচকা হেঁচকি। অসম্ভব হল কান্না চাপা। রবীন্দ্রনাথ জানতেন কোথায় মোচড় মারতে হয়। চার গলাতেই কান্না—সকলই নিবে কেড়ে। ঢেউ আসছে, ফেনা কেটে সরে যাচ্ছে। ফেনা ফাটার ফিট ফিট শব্দ। রেণু রেণু জলের স্পর্শ। গানটা চলছে। চার ফেরতা, পাঁচ ফেরতা। থামানো যাচ্ছে না।
স্বর্গদ্বারের শেষ মাথার সেই দোকানের ঝাঁক। সেখানে স্বপ্ন বিক্রি হয়। একপাশে অন্ধকার সমুদ্র ফুসছে, অন্যপাশে আলোকমালায় সজ্জিত দোকান-পাট, হোটেল। সবাই অভ্যস্ত জীবনের গুটি কেটে বেরিয়ে এসেছে রঙিন প্রজাপতির মতো। আমি পেছন থেকে দেখছি, আজও, কাউন্টারের সামনে ঝুঁকে আছে তনু, পরে আছে সিল্কের শাড়ি। দেহের মসৃণ নিম্নভাগ মৎস্যকুমারীর মতো, স্থির একটা ছন্দ। বড় আলো, ছোট আলো, নানা আলোয় ঝলমলে দোকান। ফরসা ঘাড়ের কাছে সরু সোনালি হারের চিকিমিকি। দৃশ্যটা একজন মানুষকে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ঝিনুকের নানারকম হার, দুল তুলে তুলে দেখছে তনু। এটা দেখছে, ওটা দেখছে। গলায় পরছে, খুলছে। আমাকে দেখাচ্ছে, মতামত নিচ্ছে। আঁচল সরিয়ে নীল বুকের ওপর ঝিনুকের লকেট ভাসিয়ে একমুখ হেসে বলছে, কেমন! আবার দাম শুনে থমকে গিয়ে করুণ মুখে আমার দিকে। চাইছে। দেখছে, একটা বন্দি লোক। দু-হাতে অদৃশ্য হাতকড়া। খরচ করার অঢেল স্বাধীনতা এই লোকটার নেই। সেই আধমোটা, নারকোল কুলের মতো মাথা, সেই আমার কারারক্ষী সেনগুপ্তের ছায়া আমাদের দুজনকে ঘিরে আছে। সুখ, সখ, আহ্লাদ সব তার নিয়ন্ত্রণে। তুমি কটা খাবে, কী পরবে, কেমন পরবে, সবই তার কৃপা।
তবু আমি বলছি, তোমার যদি পছন্দ হয়ে থাকে তুমি নাও, দামের কথা ভেবো না।
কথাটা বলতে বলতে মনে হয়েছিল, রিচার্ড বাটন এলিজাবেথ টেলরকে বলছেন, ডার্লিং, ইফ দ্যাট প্লিজেস ইউ টেক দ্যাট ডায়মন্ড নেকলেস। নাথিং ইজ প্রেশাস দ্যান ইয়োর আইভরি নেক।
মনে আছে, এর পর আমরা কিছু কটকি গামছা কিনেছিলুম, জামদানি কেনার আনন্দে। সেই রাতে হোটেলের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসেছিল তনু। নীল কোলের ওপর সমুদ্র থেকে কুড়িয়ে পাওয়া যত ঝিনুক, দোকান থেকে কেনা যত ঝিনুকের গয়না। আলিবাবার মাঝরাতে মোহর গোনার মতো দৃশ্য। খুশিতে মুখ উপচে পড়ছে। কত কত দেখো কত ঝিনুক। সব আমি কুড়িয়েছি।
