কথাটায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। মধু পন্ডিতের বাড়ির উনুনকে সবাই বলে রাবণের চিতা। জ্বলছে তো জ্বলছেই, অতিথিরও কামাই নেই, অতিথি-সৎকারেরও বিরাম নেই। বগলাবাবু বললেন, তা ভালো, কিন্তু আমারও অনেকটা পথ যেতে হবে, পাঁচনটা করে দাও।
মধু পন্ডিত বলে, আরে বোসো, হয়ে যাবে এক্ষুনি। ওই চারজন বরং তোমাকে খানিকটা এগিয়ে দিয়ে যাবে খন। শচীনখুড়োকে নিতে এসেছিল, তা আমি বারণ করে দিয়েছি।
বগলাবাবু চমকে উঠে বললেন, শচীনখুড়োকে কোথায় নেবে! খুড়োর যে এখন-তখন অবস্থা! এই তিনবার শ্বাস উঠল।
সেইজন্যই তো নিতে এসেছিল।
বগলাবাবু ভালো বুঝলেন না। পাঁচন তৈরি হল, লোকগুলিও খাওয়া ছেড়ে উঠল।
মধু পন্ডিত হুকুম করল, এই তোরা বগলাদাদাকে একটু এগিয়ে দিয়ে যা।
বগলাবাবু কিন্তু কিন্তু করেও ওদের সঙ্গে চললেন। বাড়ির কাছাকাছি এসে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কারা বাবারা?
লোকগুলি পেন্নাম ঠুকে বলল আজ্ঞে যমরাজের দূত, প্রায়ই আসি এদিক পানে, তবে সুবিধে করতে পারি না। ওদিকে যম মশাইকেও কৈফিয়ত দিতে হয়। কিন্তু মধু পন্ডিত কাউকেই ছাড়ে না।
সেই কথা শুনে বগলাবাবু ভিরমি খেলেন বটে, কিন্তু মধু পন্ডিতের খ্যাতি আরও বাড়ল।
হরেন গোঁসাইয়ের টিনের চালে একদিন জ্যোৎস্না-রাতে ঢিল পড়ল। হরেন গোঁসাই হচ্ছেন গাঁয়ের সবচেয়ে বুড়ো লোক, বয়স দেড়শো বছরের কিছু বেশি। ডাকাবুকো লোক। লাঠি হাতে বেরিয়ে এসে হাঁক দিলেন, কে রে?
মাথা চুলকোতে-চুলকোতে একটা তালগাছের মতো লম্বা সিঢ়িঙ্গে চেহারার লোক এগিয়ে এসে বললে, আপনারা কী অশরীরী কান্ড শুরু করলেন বলুন তো! গাঁয়ের ভূত যে সব শেষ হয়ে গেল।
হরেন গোঁসাই হাঁ করে চেয়ে থেকে বললেন তার মানে?
মানে আর কী বলব বলুন। ভূতেরা হল আত্মা। চিরকাল ভূতগিরি তো তাদের পোষায় না। ডাক পড়লেই আবার মানুষের ঘরে গিয়ে জন্ম নিতে হয়। মানুষ মরে আবার টাটকা ছানা-ভূতেরা আসে। তা মশাই, এই কোগ্রামে আমরা মোট হাজারখানেক ভূত ছিলাম। কিন্তু দেড়শো বছর ধরে একটাও নতুন ভুত আসেনি। ওদিকে একটি একটি করে ভূত গিয়ে মানুষ হয়ে জন্মাচ্ছে। ইদানীং তো একেবারে জন্মের মড়ক লেগেছে আজ্ঞে। গত মাসখানেকের মধ্যে এক চোপাটে চুয়াল্লিশটা ভূত গায়েব হয়ে গেল। সর্দার রাগারাগি করবে।
তা আমি কী করব?
লজ্জার মাথা খেয়ে বলি, আপনারা কি সব মরতে ভুলে গেছেন? আপনার দিকে তাকিয় ছিলাম বড়ো আশা নিয়ে। কিন্তু আপনিও বেশ ধড়িবাজ লোক আছেন মাইরি। তা, মধু পন্ডিতের ওষুধ না খেলেই কি নয়?
ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে ভূতটা চলে গেল। কিন্তু কদিন পরেই এক রাতে গাঁয়ের লোক সভয়ে ঘুম ভেঙে শুনল, রাস্তা দিয়ে এক অশরীরী মিছিল চলছে। তাতে স্লোগান উঠছে, মধু পন্ডিত নিপাত যাক! নিপাত যাক! নিপাত যাক! এ তরুস্তি ঝুটা হ্যায় ভুলো মৎ। ভুলো মৎ। এ ইলাজি ঝুটা হ্যায়। ভুলো মৎ। ভুলো মৎ। মধুর নিদান মানছি না! মানছি না। মানব না।
কিন্তু মাস তিনেক পর একদিন সিঁড়িঙ্গে ভূতটা খুব কাঁচুমাচু হয়ে মধু পন্ডিতের বাড়িতে হাজির হল সন্ধেবেলায়।
মধু তামাক খাচ্ছিল, একটু হেসে বলল, কী হে, শুনলাম আমার বিরুদ্ধে খুব লেগেছ তোমরা?
পেন্নাম হই পন্ডিতমশাই, ঘাট হয়েছে।
কী হয়েছে বাপু?
আজ্ঞে আমি আর সর্দার ছিলাম গতকাল অবধি। আর সব জন্মের মড়কে গায়েব হয়ে গেছে। কিন্তু কাল রাতে একেবারে সাড়ে সর্বনাশ, আমাদের বুড়ো সর্দার পর্যন্ত মানুষের ঘরে গিয়ে জন্ম নিয়ে ফেলেছে। আমি একেবারে একা।
একা তো ভালোই, চরে বরে খা গে। এখন তো তোর একচ্ছত্র রাজত্ব।
জিভ কেটে ভূতটা বলল, কী যে বলেন! একা হয়ে এ-প্রাণে আর জল নেই। বড্ড ভয়-ভয় করছে আজ্ঞে। খেতে পারছি না, শুতে পারছি না। রাতে শেয়াল ডাকে প্যাঁচা ডাকে, আমি কেঁপে কেঁপে উঠি।
তা, তোর ভয়টা কীসের?
আজ্ঞে একা হওয়ার পর থেকে আমার ভূতের ভয়ই হয়েছে, যমরাজার পেয়াদাগুলিও ভীষণ ট্যাটন। একা পেয়ে যাতায়াতের পথে আমাকে ড্যাঙস মেরে যায়।
ঠিক আছে, তুই বরং আমার সঙ্গেই থাক।
সেই থেকে সিঁড়িঙ্গে ভূতটা মধু পন্ডিতের বাড়িতে বহাল হল।
একদিন জমিদার কদম্বকেশরের ভাইপো কুন্দকেশর এসে হাজির। গম্ভীর গলায় বললেন, ওহে মধু একটা কথা ছিল।
মধু তটস্থ হয়ে বলল, আজ্ঞে বলুন।
আমার বয়স কত জানো?
বেশি বলে তো মনে হয় না। কুন্দকিশোর একটা শ্বাস ছেড়ে বলেন, পঁচানম্বই, বুঝলে? পঁচানব্বই। আমার কাকা কদম্বকেশরের বয়স জানো?
খুব বেশি আর কী হবে?
তোমার কাছে বেশি না লাগলেও, বেশি-ই। একশো পঁচিশ বছর।
তা হবে।
আমার কাকা নিঃসন্তান তা তো অন্তত জানো?
মধু পন্ডিত মাথা চুলকে বলে, তা জানি, উনি গেলে আপনারই সব সম্পত্তি পাওয়ার কথা।
জানো তাহলে? বাঁচালে। এও নিশ্চয়ই জানো, কাকার সম্পত্তি পাব এরকম একটা ভরসা পেয়েই আমি গত সত্তরটা বছর কাকার আশ্রয়ে আছি। জানো, একদিন জমিদার হয়ে ছড়ি ঘোরাব বলে আমি ভালো করে লেখাপড়া করিনি পর্যন্ত। একদিন জমিদারনি হবে এই আশায় আমার গিন্নি এই বুড়ো বয়সেও যে বাড়িতে ঝি-এর অধম খাটে, তা জানো! আমার বড়ো ছেলের বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে! শোনো বাপু, কাকা মরুক এ আমি চাই না। কিন্তু হকের মরাই বা লোকে মরছে না কেন? মরলে আমি কান্নাকাটিও করব, কিন্তু মরছে কোথায়! আর নাই যদি মরে বাপু, তবে অন্তত সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে তো যেতে পারে। বৈরাগী হয়ে পথে-পথে দিব্যি বাউল গান তো গেয়ে বেড়াতে পারে। তা তোমার ওষুধে কি সে সবেও বারণ নাকি? তোমার নামে লোকে যে কেন মামলা করে না, সেইটেই বুঝি না।
