মধু পন্ডিত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আপনার বয়স হয়েছে জানি, কিন্তু তাতে ভয় খাচ্ছেন কেন? বয়স তো একটা সংস্কার মাত্র, শরীর যদি সুস্থ-সবল থাকে, মানসিকতা যদি স্বাভাবিক থাকে, তবে আপনি একশো বছরেও যুবক। উলটো হলে, পঁচিশ বছরেও বুড়ো এই আপনার কাকাকেই দেখুন না। মোটে তো সোয়া শো বছর বয়স, দেড়শো পেরিয়েও দিব্যি হাঁকডাক করে বেঁচে থাকবেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুন্দকেশর বললেন, বলছ?
নির্যস সত্যি কথা।
কুন্দকেশর চলে গেলেন। কিছুদিন পর শোনা গেল, তিনি নিরানব্বই বছরের স্ত্রী আর পঁচাত্তর বছরের বড়ো ছেলের হাত ধরে সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে গেছেন।
সন্ধে হয়ে এসেছে, প্রচন্ড বর্ষা নেমেছে আজ। মেঘ ডাকছে। ঝড়ের হাওয়া বইছে। এই দুর্যোগে হঠাৎ মধু পন্ডিতের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। দরজা খুলে মধু একটু অবাক, বেশ দশাসই চেহারার একজন মানুষ দাঁড়িয়ে। গায়ে ঝলমলে জরির পোশাক। ইয়া গোঁফ, ইয়া বাবরি, ইয়া গালপাট্টা, মাথায় একটা ঝলমলে টুপি। তাতে ময়ূরের পালক, গায়ের রং মিশমিশে কালো বটে, কিন্তু তবু লোকটি ভারি সুপুরুষ।
মধু পন্ডিত হাতজোড় করে বললেন, আজ্ঞে আসুন, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
আমি তোমার যম। জলদগম্ভীর স্বরে লোকটা বলল।
শুনে মধু পন্ডিত একটু চমকে উঠল। খুন করবে নাকি? কোমরে একটা ভোজালিও দেখা যাচ্ছে। কাঁপা গলায় মধু বলল, আজ্ঞে।
লোকটা হেসে বলল, ভয় পেও না বাপু। আমি ভয় দেখাতে আসিনি।
বরং বড়ো ভাইয়ের মতো পরামর্শ দিতে এসেছি। তুমি এই গাঁ না ছাড়লে আমি কাজ করতে পারছি না। আমি যে সত্যিই যমরাজা, তা বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই। মধু দন্ডবৎ হয়ে প্রণাম করে উঠে মাথা চুলকে বলে, আপনার আদেশ শিরোধার্য কিন্তু শ্বশুরবাড়িটা কোথায় ছিল, তা ঠিক মনে পড়ছে না।
বলো কী? যমের চোখ কপালে উঠল, শ্বশুরবাড়ি লোকে ভোলে?
আজ্ঞে অনেক দিনের কথা তো, দাঁড়ান, গিন্নিকে জিজ্ঞেস করে আসি, বলে মধু পন্ডিত ভিতরবাড়ি থেকে ঘুরে এসে একগাল হেসে বলে, এই বর্ধমানের গোবিন্দপুর। কিন্তু গিয়ে লাভ নেই। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি গত হয়েছেন।
যমরাজ বলেন, তা শালা-শালিরা তো আছে।
ছিল, এখন আর নেই।
তাদের ছেলে-মেয়েরা সব?
আজ্ঞে তারাও গত হয়েছে। তস্য পুত্র-পৌত্রাদিরা আছে বটে। কিন্তু তারাও খুব বুড়ো। গিয়ে হাজির হলে চিনতে পারবে না।
যমরাজ গম্ভীর হয়ে বললেন, তোমার বয়স কত মধু?
আজ্ঞে মনে নেই।
যমরাজ ডাকলেন, চিত্রগুপ্ত! মধুর হিসেবটা দেখো তো।
রোগা সিঁড়িঙ্গে একটা লোক গলা বাড়িয়ে বলল, আজ্ঞে দুশো পঁচিশ।
ছি :-ছি : মধু! যমরাজ অভিমানভরে বললেন, এতদিন বাঁচতে তোমার ঘেন্না হওয়া উচিত ছিল। থাকগে, আমি তোমাকে কিছু বলব না। পৃথিবীর নিয়ম ভেঙে চলছ, চলো। মজা টের পাবে।
যমরাজ চলে গেলেন, মধু কিছুদিনের মধ্যেই মজা টের পেতে লাগল।
হয়েছে কী, মধুর ওষুধ যে শুধু মানুষ খায়, তা নয়। রোদে শুকোতে দিলে পাখি-পক্ষীও খায়, ঘরে রাখলে পিঁপড়ে, ধেড়ে ইঁদুরও ভাগ বসায়। তাদেরও হঠাৎ আয়ু বাড়তে লাগল। কোগ্রামের মশা-মাছি পর্যন্ত মরত না। বরং দিন-দিন মশা, মাছি, পিঁপড়ে, ইঁদুর ইত্যাদির দাপট বাড়তে লাগল। আরও মুশকিল হল জীবাণুদের নিয়ে। কলেরা রুগিকে ওষুধ দিয়েছে মধু, তা সে ওষুধ কলেরার পোকাও খানিকটা খেয়ে নেয়। ফলে রুগিও মরে না, কিন্তু তার কলেরাও সারতে চায় না। সান্নিপাতিক রুগিরও সেই দশা, কোগ্রামে ঘরে-ঘরে রুগি দেখা দিতে লাগল। তারা আর ওঠা-হাঁটা চলা করতে পারে না। কিন্তু ওষুধের জোরে বেঁচে থাকে।
এক শীতের রাতে আবার যমরাজ এলেন।
মধু! কী ঠিক করলে?
আজ্ঞে, লোকে বড়ো কষ্ট পাচ্ছে।
তা তো একটু পাবেই। এখনও বলো, যমের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাও কিনা।
শশব্যস্ত দন্ডবৎ হয়ে মধু পন্ডিত বলে, আজ্ঞে না। তবে এখন যদি ওষুধ বন্ধ করি, তবে চোখের পলকে গাঁ শ্মশান হয়ে যাবে। একশো বছর বয়সের নীচে কোনো লোক নেই।
যমরাজ গম্ভীর হয়ে বলেন, তা একটা ভাববার কথা বটে, তোমার এত প্রিয় গাঁ, তাকে শ্মশান করে দিতে কি আমারই ইচ্ছে? তবে একটা কথা বলি মধু। যেমন আছ থাকো সবাই। তবে গাঁয়ের বাইরে মাতবরি করতে কখনো যেও না। আমি গন্ডি দিয়ে গেলাম। শুধু এই কোগ্রামের তোমরা যতদিন খুশি বেঁচে থাকো। অরুচি যতক্ষণ না হয়। তবে বাইরের কেউ এই গাঁয়ের সন্ধান পাবে না। কানাওলা ভূত চারদিকে পাহারায় থাকবে। কোনো লোক এদিকে এসে পড়লে অন্য পথে তাদের ঘুরিয়ে দেবে।
মধু দন্ডবৎ হয়ে বলে, যে আজ্ঞে!
সেই থেকে আজও শোনা যায়, কোগ্রামের কেউ মরে না। কিন্তু কোথায় সেই গ্রাম, তা খুঁজে-খুঁজে লোকে হয়রান। আজও কেউ খোঁজ পায়নি।
কৌটোর ভূত
জয়তিলকবাবু যখনই আমাদের গাঁয়ের বাড়িতে আসতেন, তখনই আমরা হঠাৎ ছোটোরা ভারি খুশিয়াল হয়ে উঠতুম।
তখনকার অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ আগের পূর্ববঙ্গের গাঁ-গঞ্জ ছিল আলাদা রকম মাঠ-ঘাট, খালবিল, বনজঙ্গল মিলে এক আদিম আরণ্যক পৃথিবী। সাপখোপ, জন্তুজানোয়ার তো ছিলই, ভূতপ্রেতেরও অভাব ছিল না। আর ছিল নির্জনতা।
তবে আমাদের বিশাল যৌথ পরিবারে মেলা লোকজন, মেলা কাচ্চাবাচ্চা। মেয়ের সংখ্যাই অবশ্য বেশি। কারণ বাড়ির পুরুষেরা বেশির ভাগই শহরে চাকরি করত, আসত কালেভদ্রে। বাড়ি সামাল দিত দাদু-টাদু গোছের বয়স্করা। বাবা-কাকা-দাদাদের সঙ্গে বলতে কী আমাদের ভালো পরিচয়ই ছিল না, তাঁরা প্রবাসে থাকার দরুন।
