কদম্ববাবু ভীষণ চমকে উঠলেন।
চমকানোরও আরও ছিল। কর্তাবাবুর সামনে যে দাবার ছকটি পাতা রয়েছে সেটা যে শুধু সোনা দিয়ে তৈরি তা-ই নয়, প্রত্যেকটি খোপে আবার হিরে, মুক্তো, চুনী আর পান্না বসানো। একধারে সোনার খুঁটি, অন্যধারে রুপোর।
প্রত্যেকটি খুঁটির মাথায় আমার এক কুচি করে হিরে বসানো।
বোসো, বোসো হে শ্যামকান্ত। আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। মনে আছে তো আজ আমাদের বাজি রেখে খেলা। এই হল আমার বাজি।
এই বলে কর্তাবাবু একটা নীল ভেলভেটে মোড়া বাক্সর ঢাকনা খুলে টেবিলের একপাশে রাখলেন।
কদম্ববাবু দেখলেন, বাক্সের মধ্যে মস্ত একটা মুক্তো। মুক্তো যে এত বড়ো হয় তা জানা ছিল না তাঁর।
তুমি কি বাজি রাখবে শ্যামবাবু?
কদম্ববাবু আমতা-আমতা করে বললেন, আমি গরিব মানুষ, কী আর বাজি রাখব বলুন।
কর্তাবাবু ঘর কাঁপিয়ে হাঃ হাঃ অট্টহাসি হেসে বললেন, গরিবই বটে। বছরে যার কুড়ি লাখ টাকা আয় সে আবার কেমন গরিব?
আজ্ঞে আপনার তুলনায় আমি আর কী বলুন।
কর্তাবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, সে কথাটা সত্যি শ্যামবাবু। আমার মেলা টাকা। এত টাকা যে আজকাল আমার টাকার ওপর ঘেন্না হয়। খুব ঘেন্না হয়।
টাকার ওপর ঘেন্না। কদম্ববাবুর মুখটা হাঁ-হাঁ করে উঠল।
কর্তাবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, আজ সকালে মনটা খারাপ ছিল। কিছুতেই ভালো হচ্ছিল না। কী করলুম জানো? দশ লক্ষ টাকার নোট আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দিলুম।
অ্যাঁ?
শুধু কী তাই? ছাদে উঠে মোহর ছুঁড়ে কাক তাড়ালুম। তাতে একটু মনটা ভালো হল। তারপর জুড়িগাড়ি করে হাওয়া খেতে বেরিয়ে এক হাজারটা হিরে আর মুক্তো রাস্তায় ছড়িয়ে দিয়ে এলুম।
কদম্ববাবু দাঁতে দাঁত চেপে কোনোরকমে নিজেকে সামলে দিলেন। লোকটা বলে কী?
কর্তাবাবু বললেন, এসো, চাল দাও। তুমি কী বাজি রাখবে বললে না?
কদম্ববাবু মুখটা কাঁচুমাঁচু করে ভাবতে লাগলেন।
কর্তাবাবু নিজেই বললেন, টাকাপয়সা হিরে-জহরত তো আমার দরকার নেই। তুমি বরং তোমার পকেটের ওই কলমটা বাজি ধরো।
কলম। কদম্ববাবু শিউরে উঠলেন। মাত্র আট আনায় ফুটপাথ থেকে কেনা। তবু কদম্ববাবু উপায়ান্তর না পেয়ে কলমটাই রাখলেন মুক্তোর উলটোদিকে।
কিন্তু চাল? দাবার যে কিছুই জানেন না কদম্ববাবু।
চোখ বুজে একটা খুঁটি এগিয়ে দিলেন কদম্ববাবু।
কর্তাবাবু বললেন, সাবাস!
কদম্ববাবু চোখ মেলে একটা শ্বাস ছাড়লেন। তারপর বুদ্ধি করে কর্তাবাবুর দেখাদেখি কয়েকটা চাল দিয়ে ফেললেন।
হঠাৎ কর্তাবাবু সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, এ কী! তুমি যে কিস্তি দিয়ে বসেছ আমাকে! অ্যাঁ! এ কী কান্ড! আমি যে মাত।
তারপরেই কর্তাবাবু হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে অট্টহাসি হাসতে লাগলেন। সে এমন হাসি যে, কদম্ববাবুর মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। ভয়ে চোখ বুজে ফেললেন।
যখন চোখ মেললেন তখন কদম্ববাবু হাঁ।
কোথায় সোনার ঘর? কোথায় রুপোর ঘর? কোথায় সেই ঝাড়বাতি আর দেয়ালগিরি? কোথা আসবাবপত্র? এ যে ঘরঘুট্টি অন্ধকার ভাঙা সোঁদা একটা পোড়ো বাড়ি রমধ্যে বসে আছেন তিনি। চারদিকে নুন-বালি খসে ডাঁই হয়ে আছে। চতুর্দিকে মাকড়সার জাল। ইঁদুর দৌড়োচ্ছে।
কদম্ববাবু আতঙ্কে একটা চিৎকার দিলেন। তারপর ছুটতে লাগলেন।
সেই বাড়িরই এমন দশা কে বিশ্বাস করবে? মেঝেয় পাথর সব উঠে গেছে, সিঁড়ি ভেঙে ঝুলে আছে, দরদালানের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে।
কদম্ববাবু পড়ি কি মরি করে ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে কোনোরকমে বাইরের দরজায় পৌঁছোলেন। দরজাটা অক্ষত আছে। কদম্ববাবু দরজাটার কড়া ধরে হ্যাঁচকা টান মারতে সেটি খুলে গেল।
কদম্ববাবু রাস্তায় নেমে ছুটতে লাগলেন। বৃষ্টি পড়ছে, তাঁর ছাতা নেই, পায়ে জুতোও নেই। ভাঙা পোড়ো বাড়ির মধ্যে কোথায় পড়ে আছে।
কদম্ববাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ভাবতে লাগলেন সত্যিই তো টাকা বাঁচিয়ে হবেটা কী? শেষে তো ওই ভূতের বাড়ি।
বুক ফুলিয়ে কদম্ববাবু একটা দোকানে ঢুকে একটা বাহারি ছাতা কিনে ফেললেন। জুতোর দোকানে ঢুকে কিনলেন নতুন একজোড়া জুতো।
তারপর আবার ভাবতে লাগলেন। শুধু নিজের জন্য কেনাকাটা করাটা ভালো দেখাচ্ছে না।
তিনি আবার দোকানে ঢুকে গিন্নির জন্য শাড়ি ও ছেলে-মেয়েদের জন্য জামাকাপড়ও কিনে ফেললেন।
মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল তাঁর।
কোগ্রামের মধু পন্ডিত
বিপদে পড়লে লোকে বলে, ত্রাহি মধুসূদন।
তা কোগ্রামের লোকেরাও তাই বলত। কিন্তু তারা কথাটা বলত মধুসূদন পন্ডিতকে। বাস্তবিক মধুসূদন ছিল কোগ্রামের মানুষের কাছে সাক্ষাৎ দেবতা। যেমন বামনাই তেজ, তেমনই সর্ববিদ্যাবিশারদ। চিকিৎসা জানতেন, বিজ্ঞান জানতেন, চাষবাস জানতেন, মারণ-উচাটন জানতেন, তাঁর আমলে গাঁয়ের লোক মরত না।
সাঁঝের বেলা একদিন কোষ্ঠকাঠিন্যের রুগি বগলাবাবু মধুসূদনের বাড়িতে পাঁচন আনতে গেছেন। গিয়ে দেখেন, গোটা চারেক মুশকো চেহারার গোঁফওয়ালা লোক উঠোনে হ্যারিকেনের আলোয় খেতে বসেছে আর মধু গিন্নি তাদের পরিবেশন করছে, লোকগুলির চেহারা ডাকাতের মতো, চোখ চারদিকে ঘুরছে, পাশে পেল্লায় চারটে কাঁটাওয়ালা মুগুর রাখা।
মধু পন্ডিত বগলাবাবুকে বলল, ওই চারজন অনেকদূর থেকে এসেছে তো, আবার এক্ষুনি ফিরে যাবে, অনেকটা রাস্তা, তাই খাইয়ে দিচ্ছি।
