–শুধু ওরা কেন। চাটুজ্যে বাঁড়ুজ্জে ঘোষ বোস সেন আছে, সিং কাপুর চোপরা মেটা দেসাই আছে, শেক সৈয়দ আছে, হোর লাভাল কুইসলিং আছে, চ্যাং কিমাগুসা ভডকুইস্কি প্রভৃতিও আছে! সাড়ে পাঁচ হাজার বৎসরে মানুষের জাতিগত পরিবর্তন অনেক হয়।
–আপনি তা’হলে মহেঞ্জোদাড়ো হারাপ্পা যুগের লোক।
–তা বলতে পারেন। ওইসব দেশবাসীর সঙ্গে আমার পূর্বপুরুষদের কুটুম্বিতা ছিল। আমার বৃদ্ধপ্রমাতামহীর নাম সালকটংকটা, তিনি হারাপ্পার রাজবংশের কন্যা ছিলেন।
হরিহরবাবু এতক্ষণে একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে বললেন, উঃ, দীর্ঘ জীবনে আপনার বিস্তর স্বজনবিয়োগ হয়েছে, কতই না শোক পেয়েছেন!
–শোক পাব কেন? কৃষকের আয়ু ধানগাছের চাইতে বেশী। ধানগাছ শস্য দিয়ে মরে যায়, তার জন্য কৃষক কিছুমাত্র শোক করে না, আবার বীজ ছড়ায়।
হরিহর বললেন, ওঃ, সাড়ে পাঁচ হাজার বৎসরের ইতিহাস আপনার চোখের সামনে ঘটে গেছে!
হাঁ। পলাশির যুদ্ধ, পৃথ্বীরাজের পরাজয়, হর্ষবর্ধনের দিগবিজয়, আলেকজাণ্ডারের আগমন, বুদ্ধদেবের জন্ম, কুরুক্ষেত্র—যুদ্ধ, সবই আমি দেখেছি।
রাম—রাবণের যুদ্ধও দেখেছেন?
লংকুস্বামী গম্ভীর হয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, তাও দেখতে হয়েছে। শুধু দেখা নয়, লড়তেও হয়েছে। ও কথা আর তুলবেন না।
হরিহরবাবু রোমাঞ্চিত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে প্রশ্ন করলেন, আপনি কে প্রভু!
গুজরাটী ভদ্রলোকটি উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। দুই ঊরুতে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে বললে, ও হো হো হো! আমি বুঝে লিয়েছি, আপনি হচ্ছেন বিভীখখন মহারাজ, রামচন্দ্রের বরে চিরঞ্জীব হয়েছেন। এখন একটি বাত বলছি শুনেন। আমার নাম শুনে থাকবেন, লগনচাঁদ বজাজ, নয়নসুখ ফিলিম কম্পনির মালিক। নয়া ফিলিম বানাচ্ছি— রাবণ—সনহার। রোশেনারা পকৌড়িলাল সাগরবালা এঁরা সব নামছেন। আপনারা আমার কম্পনিতে জইন করুন। খুদ আমি রামচন্দ্রের পার্ট লিব। আপনি বড়দাদা রাবণের পার্ট লিবেন, সুরাম্মা বাঈ সীতার পার্ট লিবেন। হজার টাকা করে মহীনা দিব। এই আমার কার্ড। বিচার করে দেখবেন, রাজী হন তো এক হপ্তার অন্দর এই ঠিকানায় আমাকে তার ভেজবেন। অচ্ছা?
লংকুস্বামী একবার কটমট করে তাকালেন। লগনচাঁদ থতমত খেয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর হাত থকে কার্ডখানা খসে পড়ে গেল।
এই সময়ে গাড়ি আসানসোলে এসে থামল। সস্ত্রীক লংকুস্বামী কোন কথা না বলে যুক্ত করে বিদায় নিলেন এবং বাঘের মতন নিঃশব্দে পা ফেলে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লেন।
১৩৫৭ (১৯৫১)
জটাধর বকশী
নূতন দিল্লির গোল মার্কেটের পিছনে কুচা চমৌকিরাম নামে একটি গলি আছে। এই গলির মোড়েই কালীবাবুর বিখ্যাত দোকান ক্যালকাটা টি ক্যাবিন। এখানে চা বিস্কুট সস্তা কেক সিগারেট চুরুট আর বাংলা পান পাওয়া যায়, তামাকের ব্যবস্থা আর গোটকতক হুঁকোও আছে। দু—এক মাইলের মধ্যে যেসব অল্পবিত্ত বাঙালী বাস করেন তাঁদের অনেকে কালীবাবুর দোকানে চা খেতে আসেন। সন্ধ্যার সময় খুব লোকসমাগম হয় এবং জাঁকিয়ে আড্ডা বসে।
পৌষ মাস পড়েছে, সন্ধ্যা সাড়ে ছটা, বাইরে খুব ঠাণ্ডা, কিন্তু কালীবাবুর টি ক্যাবিন বেশ গরম। ঘরটি ছোট, এক দিকে চায়ের উনুন জ্বলছে, পনের—ষোল জন পিপাসু ঘেঁষা—ঘেঁষি করে বসেছেন। সিগারেট চুরুট আর তামাকের ধোঁয়ায় ঘরের ভিতর ঝাপসা হয়ে গেছে।
রামতারণ মুখুজ্যে কথা বলছিলেন। এঁর বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। মিলিটারী অ্যাকাউণ্টসে কাজ করতেন, দশ বছর হল অবসর নিয়েছেন। দুই ছেলেও দিল্লিতে চাকরি পেয়েছে, সেজন্য রামতারণ এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। ইনি একজন সবজান্তা লোক, কথা বলতে আরম্ভ করলে থামতে চান না, অন্য লোককে কিছু বলবার অবকাশও দেন না। চায়ের আড্ডায় সবাই এঁকে উপাধি দিয়েছে—বিরাট ছেঁদা, অর্থাৎ দ গ্রেট বোর।
রামতারণবাবু বলছিলেন, আরে না না, তোমাদের ধারণা একবারে ভুল। ভূত আর প্রেত স্বতন্ত্র জীব, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি শোন। মৃত্যুর পর মানুষ যত দিন বায়ুভূত নিরালম্ব নিরাশ্রম হয়ে থাকে, অর্থাৎ যে পর্যন্ত আবার জন্মগ্রহণ না করে তত দিন সে প্রেত। কিন্তু—
স্কুল মাস্টার কপিল গুপ্ত বললেন, অর্থাৎ পরলোকের ভ্যাগাবণ্ডরাই প্রেত।
বক্তৃতায় বাধা পাওয়ায় রামতারণ বিরক্ত হয়ে বললেন, ফাজলামি রাখ, যা বলছি শুনে যাও। মৃত্যুর পর মানুষ চিরকাল প্রেত হয়ে থাকে না, আবার জন্মায়। ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। কিন্তু যারা ভূত তারা চিরকালই ভূত।
কপিল গুপ্ত আবার বললেন, বুঝেছি। যেমন গাজনের সন্ন্যাসী আর লোটা—চিমটা—কম্বল—ধারী বারমেসে সন্ন্যাসী।
—আঃ চুপ কর না। মরা মানুষের আত্মা হল প্রেত, বিলিতি গোস্টও প্রেত। কিন্তু পিশাচ আর পল্টারগাইস্টকে ভূত বলা যেতে পারে। ভূত হল অপদেবতা, তারা নাকে কথা কয়, ভয় দেখায়, ঘাড় মটকায়, নানা রকম উপদ্রব করে। কিন্তু প্রেত সে রকম নয়, জীবন্দশায় যার যেমন স্বভাব, প্রেত হলেও তাই থাকে। তবে চলিত কথায় প্রেতকেও লোকে ভূত বলে।
এই সময় একজন অচেনা লোক ঘরে প্রবেশ করলেন। বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ, ছ ফুট লম্বা, মজবুত গড়ন, মোচড় দেওয়া কাইজারী গোঁফ। গায়ে কালচে খাকী মিলিটারী ওভারকোট, পরনে ইজার আছে কি ধুতি আছে বোঝা যায় না, মাথায় পাগড়ির মতন বাঁধা কম্ফর্টার। আগন্তুক ঘরে এসে বাজখাঁই গলায় বললেন, নমস্কার মশাইরা, এখানে আপনাদের সঙ্গে বসে একটু চা খেতে পারি কি?
