কয়েক জন এক সঙ্গে উত্তর দিলেন, বিলক্ষণ, চা খাবেন তার আবার কথা কি, এ তো চায়েরই দোকান। ওহে কালীবাবু, এই ভদ্রলোককে চা দাও। আপনাকে তো আগে কখনও দেখি নি, নতুন এসেছেন বুঝি?
—নতুন নয়, দিল্লি আমার খুব চেনা জায়গা, তবে সম্প্রতি বহু কাল পরে এসেছি। পুরনো দিল্লির কেউ কেউ এখনও হয়তো আমার নাম মনে রেখেছেন—জটাধর বকশী। ও ম্যানেজারমশাই, দয়া করে আমাকে বেশ বড় এক পেয়ালা চা দিন, খুব গরম আর কড়া। একটা মোটা বর্মা চুরুট, দশ খিলি পান, এক ধেবড়া চুন, আর অনেকখানি দোক্তাও দেবেন। হাঁ, তার পর ভূত প্রেতের কি যেন কথা হচ্ছিল আপনাদের। আমি একটু শুনতে পাই কি? এসব কথায় আমার খুব আগ্রহ আছে।
একজন উৎসুক নতুন শ্রোতা পেয়ে রামতারণবাবু খুশী হয়ে বললেন, হাঁ হাঁ শুনবেন বইকি। বলছিলুম, ভূত আর প্রেত আসলে আলাদা জীব, তবে সাধারণ লোকে তফাত করে না। বাদশাহী আর ব্রিটিশ জমানায় ভূত প্রেতের কথা অনেক শোনা যেত, কিন্তু এখনকার এই সেকিউলার ভারতে তারা ফৌত হয়ে যাচ্ছে। গুরুমহারাজ পানিমহারাজ রাজজ্যোতিষী নেপালবাবা ইত্যাদির ওপর লোকের ভক্তি খুব বেড়েছে বটে, কিন্তু ভূত প্রেতের ওপর আস্থা কমে গেছে, সেজন্য তাদের দেখা পাওয়া এখন কঠিন।
কপিল গুপ্ত বললেন, বিশ্বাসে মিলায়ে ভূত, তর্কে বহু দূর।
জটাধর বকশী বললেন, ঠিক কথা, কিন্তু ভূত যদি প্রবল হয় তবে অবিশ্বাসীকেও দেখা দেয়। যদি অনুমতি দেন তো আমি কিছু বলি।
রামতারণবাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, আপনি ভূতের কি জানেন? গেল বছর যখন চাঁদনি চকের ঘড়িটা পড়ে গেল।
তিন—চার জন একবাক্যে বললেন, মুখুজ্যেমশাই, দয়া করে আপনি একটু থামুন, এঁকে বলতে দিন।
জটাধর বকশী বলতে লাগলেন।—বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে দিল্লিতে একবার প্রচণ্ড ভূতের উৎপাত হয়েছিল, আমাদের ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর তার চমৎকার বৃত্তান্ত লিখেছেন। ভবানন্দ মজুমদারের ইষ্টদেবীকে জাহাঙ্গীর ভূত বলে গাল দিয়েছিলেন। প্রভুর আশকারা পেয়ে বাদশাহী সিপাহীরা ভবানন্দকে বললে—
অরে রে হিন্দুর পুত দেখলাও কঁহা ভূত
নহি তুঝে করুঙ্গা দো টুক।
ন হোয় সুন্নত দেকে কমলা পড়াঁও লেকে
জাতি লেউঁ খেলায়কে থুক।।
তখন ভবানন্দ বিপন্ন হয়ে দেবীকে ডাকলেন। ভক্তের স্তবে তুষ্ট হয়ে মহামায়া ভূতসেনা পাঠালেন, তারা দিল্লি আক্রমণ করলে—
ডাকিনী যোগিনী শাঁখিনী পেতিনী গুহ্যক দানব দানা।
ভৈরব রাক্ষস বোক্কস খোক্কস সমরে দিলেক হানা।।
লপটে ঝপটে দপটে রবটে ঝড় বহে খরতর।
লপ লপ লম্ফে ঝপ ঝপ ঝম্ফে দিল্লি কাঁপে থরথর।।…
তাথই তাথই হো হো হই হই ভৈরব ভৈরবী নাচে।
অট্ট অট্ট হাসে কট মট ভাষে মত্ত পিশাচী পিশাচে।।
অবশেষে বেগতিক দেখে বাদশা ভবানন্দের শরণাপন্ন হলেন, বিস্তর, ধন—দৌলত খেলাত আর রাজগির ফরমান দিয়ে তাঁকে খুশী করলেন, তখন ভূতের উৎপাত থামল। সেকালেরতুলনায় আজকাল ভূত প্রেত কিঞ্চিৎ দুর্লভ হয়েছে বটে, কিন্তু এই দিল্লিতে এখনও ভূত দেখা যায়।
কপিল গুপ্ত বললেন, মুখুজ্যেমশাই, আপনি তো প্রাচীন লোক, বহুকাল দিল্লিতে আছেন, ভূতের সঙ্গে কখনও আপনার মোলাকাত হয়েছিল?
রামতারণ বললেন, আমি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, তোমাদের মতন অখাদ্য খাই না, নিত্য সন্ধ্যা—আহ্নিক করি। ভূতের সাধ্য নেই যে আমার কাছে ঘেঁষে।
কপিল গুপ্ত বললেন, আচ্ছা জটাধরবাবু, আপনাকে তো একজন চৌকস লোক বলে মনে হচ্ছে, আপনি ভূত দেখেছেন?
জটাধর বললেন, নিরন্তর দেখছি, ভূত দেখা অতি সহজ।
—বলেন কি! দয়া করে আমাদের দেখান না।
রামতারণ বললেন, ওসব বুজরুকি আমার কাছে চলবে না। ভূত প্রেত মানি বটে, একলা অন্ধকারে ভয়ও পাই, কিন্তু জটাধর কি ঘটাধর বাবু ভূত দেখাতে পারেন এ কথা বিশ্বাস করি না। কলেজে আমি রীতিমত সায়েন্স পড়েছি, ম্যাজিকওয়ালাদের জোচ্চুরিও আমার জানা আছে।
অট্টহাস্য করে জটাধর বললেন, যদি আপনাকে ভূত দেখাই?
—দেখাবেন বললেই হল! কবে দেখাবেন? কোথায় দেখাবেন? কখন দেখাবেন?
—আজই, এখানেই, এখনই দেখাতে পারি।
কপিল গুপ্ত বললেন, দেখিয়ে ফেলুন মশাই, আর দেরি করবেন না, আমাদের বাড়ি ফেরবার সময় হল। কিন্তু কি দেখাবেন, ভূত না প্রেত?
রামতারণবাবু প্রতিবাদ সইতে পারেন না। চটে গিয়ে বললেন, বেশ এখনই দেখান ভূত প্রেত বেম্মদত্য শাঁখচুন্নী যা পারেন। আমি বাজি রাখছি যে আপনি পারবেন না, শুধু ধাপ্পা দিচ্ছেন। ভূত দেখানো আপনার সাধ্য নয়।
জটাধর বললেন, আপনার চ্যালেঞ্জ মেনে নিলুম। মোটা টাকা বাজি রাখতে চাই না, কারণ আপনি নিশ্চয় হারবেন। ছা—পোষা পেনশনভোগী বুড়ো মানুষ, আপনার ক্ষতি করবার ইচ্ছে নেই। এই বাজি রাখা যাক যে ভূত যদি দেখাতে পারি তবে আমার চা চুরুট পানের দাম আপনি দেবেন। আর যদি হেরে যাই তবে আপনি যা খেয়েছেন তার দাম আমি দেব। রাজী আছেন? আপনারা সবাই কি বলেন?
সবাই বললেন, খুব ভাল প্রস্তাব, ভেরি ফেয়ার অ্যান্ড জেণ্টলম্যানলি।
বর্মা চুরুটের উগ্র ধোঁয়া উদগিরণ করতে করতে জটাধর বকশী বলতে লাগলেন।—উনিশ শ একচল্লিশ সালের কথা। তখন আমি বর্মায় জেনারেল সিওয়েলের স্যাপার্স অ্যাণ্ড মাইনার্স এর দলে সিনিয়র হাবিলদার—আমিন। বর্মা থেকে চীন পর্যন্ত যে রাস্তা তৈরি হচ্ছিল তারই জরিপ আমাকে করতে হত। আমার ওপরওয়ালা অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন ব্যাবিট।
