হরিহরবাবু বললেন, আপনি রেড্ডি? ক্ষত্রিয়?
–ব্রাহ্মণও বটি ক্ষত্রিয়ও বটি।
–ও আপনি ব্রহ্মক্ষত্রিয়, আমাদের এই তারক গুপ্তর স্বজাতি?
–তা বলতে পারি না।
হরিহরবাবু চিন্তিত হয়ে বললেন, তবেই তো সমস্যায় ফেললেন মশায়। আপনি শর্মা, না বর্মা, না দাশ তালব্য—শ, না দাস দন্ত্য—স?
আমি শর্মা—বর্মা—দাষ, দ—এ আকার মূর্ধন্য ষ। আমি জাতিতে মূর্ধাভিষিক্ত। পিতা ব্রাহ্মণ, মাতা রক্ষঃক্ষত্রিয়া রাজকন্যা। রেড্ডি আমার আসল উপাধি নয়, শুনতে মিষ্ট বলে নামের শেষে যোগ করি।
হালদার মশায় বললেন, আহা, কেন ভদ্রলোককে জেরা করে বিব্রত কর, দেখতেই তো পাচ্ছ ইনি মাদ্রাজী। আরও পরিচয়ের দরকার কি। আপনি তো খাসা বাংলা বলেন মশায়। শিখলেন কোথায়?
লংকুস্বামী হেসে বললেন, আমার বর্তমানা পত্নী আট বৎসর শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তাঁর কাছেই বাংলা শিখেছি।
হরিহরবাবু বললেন, বর্তমানা পত্নী?
–আজ্ঞে হাঁ। পত্নীদেরও ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান আছে।
হালদার মশায় বললেন, এই সোজা কথাটা বুঝলে না? ইনি অনেক বার সংসার করেছেন। এই আমার মতন আর কি! চার বার বিবাহ করেছি, কলাগাছ নিয়ে পাঁচ। কিন্তু এখন গৃহ শূন্য। আবার বিবাহ করবার ইচ্ছা আছে, কিন্তু শেষ পক্ষের সম্বন্ধী এই শরৎ শালার জন্যেই তা হচ্ছে না, কেবলই ভাংচি দেয়।
লংকুস্বামী বললেন, মহাশয়ের বয়স কত হয়েছে?
–চার কুড়ি পুরতে এখনও ঢের বাকী।
শরৎ বলে উঠল, মিথ্যে বলবেন না হালদার মশায়, সেই কবে আশি পেরিয়েছেন।
–তুমি চুপ কর ছোঁড়া। বুঝলেন লংকুবাবু, বয়স যতই হোক খুব শক্ত আছি। এখনও একটি আস্ত ইলিশ হজম করতে পারি।
লংকুস্বামী বললেন, তবে আর ভাবনা কি! আপনি তো বালক বললেই হয়, এক শ বার বিবাহ করতে পারেন।
–হেঁ হেঁ। বালক নয়, তবে জোয়ান বলতে পারেন। মহাশয় ক বার সংসার করেছেন?
লংকুস্বামী পকেট থেকে একটি নোটবুক বার করে দেখে বললেন, এখন ঊনবিংশত্যধিক—শততম সংসার চলছে।
–তার মানে?
অর্থাৎ এখন পর্যন্ত এক শ উনিশ বার বিবাহ করেছি।
হালদার মশায় চোখ কপালে তুলে বললেন, প্রত্যেক বারে দশ বিশ গণ্ডা বিবাহ করেছিলেন নাকি?
–না না, বহুবিবাহে আমার ঘোর আপত্তি, যদিও আমার বড়—দা আর মেজদার অনেক পত্নী ছিলেন। আমি চিরকালই একনিষ্ঠ, এক—একটি পত্নী গত হলে আবার একটির পাণিগ্রহণ করেছি।
একজন গুজরাটী যাত্রী সশব্দে হেসে বললেন, বুঝছেন না হালদার মোসা, ইনি আপনাকে বিয়া পাগল বুঢ়া ঠহরেছেন, তাই আপনার পয়ের খিঁচছেন, যাকে বলে লেগ পুলিং।
লংকুস্বামী তাঁর বৃহৎ জিহ্বা দংশন করে বললেন, রাম রাম, আমি ঠাট্টা করছি না, সত্য কথাই বলছি।
গাড়ি বর্ধমানে পৌঁছল, অনেক যাত্রী নেমে গেল। লংকুস্বামী বললেন, এখন একটু জায়গা হয়েছে, আপনাদের যদি অসুবিধা না হয় তবে আমার স্ত্রীকে মহিলা—কামরা থেকে নিয়ে আসি। সেখানে বড় ভিড়, তাঁর কষ্ট হচ্ছে। ঘণ্টা—দুই পরেই আমরা আসানসোলে নেমে যাব।
শরৎ বললে, কোনও অসুবিধা হবে না, আপনি তাঁকে নিয়ে আসুন।
লংকুস্বামী তাঁর পত্নীকে নিয়ে এলেন। বয়স আন্দাজ পঁচিশ, সুশ্রী তন্বী শ্যামা, কাছা দিয়ে শাড়ি পরা, মাথা খোলা, দুই কানে আর নাকের দুই পাশে হীরে ঝকমক করছে। লংকুস্বামী পরিচয় দিলেন, ইনিই আমার এক শ উনিশ নম্বরের স্ত্রী, এঁর নাম সুরাম্মা বাঈ। সুরাম্মা স্মিতমুখে সকলের উদ্দেশে নমস্কার করলেন।
হালদার মশায় চুলবুল করছেন আর তাঁর ঠোঁট বার বার নড়ছে দেখে লংকুস্বামী বললেন, আপনি কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান কি? স্বচ্ছন্দে বলুন, আমার স্ত্রীর জন্য কোনও দ্বিধা করবেন না।
হালদার মশায় বললেন, এক শ উনিশ বার বিবাহ করা চাট্টিখানি কথা নয়, আপনার বয়স কত হবে লংকুবাবু?
–আপনি আন্দাজ করুন না।
–আমার চাইতে কম। এই পঞ্চাশের মধ্যে আর কি।
–হল না, আরও উঠুন।
–ষাট?
–আরও, আরও!
–সত্তর? আশি?
তারকবাবু হেসে বললেন, আপনার কাজ নয় হালদার মশায়। নিলামের দর চড়ানো আমার অভ্যাস আছে। লংকুস্বামীজী আপনার বয়স এক শ।
–হল না, আরও উঠুন।
–পাঁচ শ? হাজার? দু হাজার?
–আরও, আরও।
–চার হাজার? পাঁচ হাজার?
লংকুস্বামী বললেন, এইবার কাছাকছি এসেছেন। সুরাম্মা, তুমি তো সেদিন হিসেব করেছিল তোমার চাইতে আমি ক বছরের বড়। তুমি বাবুমশায়দের শুনিয়ে দাও আমার বয়স কত।
সুরাম্মা সহাস্যে মৃদুস্বরে বললেন, পাঁচ হাজার পাঁচ শ পঞ্চান্ন।
হালদার মশায় হাঁ করে নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। হরিহরবাবু হতভম্ব হয়ে ভাবতে লাগলেন, স্বপ্ন দেখছি, না জেগে আছি? অন্য যাত্রীরা নির্বাক হয়ে রইল, কেউ কেউ বোকার মতন হাসতে লাগল।
তারকবাবু বললেন, ক বছর অন্তর বিবাহ করেছিলেন মশায়?
লংকুস্বামী আবার তাঁর নোটবুক দেখে বললেন, গড়ে ছেচল্লিশ বৎসর অন্তর। আমার স্ত্রীদের আয়ু তো আমার মতন ছিল না, সকলেই যথাকালে গত হয়েছিলেন। অষ্টম হেনরির মতন আমি স্ত্রীবধ করি নি। আমার সকল স্ত্রীই সতীলক্ষ্মী।
হালদার মশায় ক্ষীণস্বরে প্রশ্ন করলেন, সন্তানাদি কতগুলি?
–সুরাম্মার এখনও কিছু হয়নি। আমার পূর্ব পূর্ব পক্ষের সন্তানদের হিসাব রাখি নি, রাখা সাধ্যও নয়। বিস্তর জন্মেছিল, বিস্তর মরে গেছে, তবু জীবিত বংশধরদের সংখ্যা এখন কয়েক লাখ হবে।
তারকবাবু বললেন, যত রেড্ডি পিল্লে মেনন নাইডু নায়ার চেট্টি আয়ার আয়েঙ্গার সবাই আপনার বংশধর নাকি?
