নন্দ। ব্যারামটা কি আন্দাজ করছেন?
ডাক্তার ভ্রূকুটি করিয়া বলিলেন—’তা জেনে তোমার চারটে হাত বেরবে নাকি? যদি বলি তোমার পেটে ডিফারেনশ্যাল ক্যালকুলস হয়েছে কিছু বুঝবে? ভাত খাবে না, দু—বেলা রুটি, মাছ—মাংস বারণ, শুধু মুগের ডালের যূষ, স্নান বন্ধ, গরম জল একটু খেতে পার, তামাক খাবে না, ধোঁয়া লাগলে ওষুধের গুণ নষ্ট হবে। ভাবছো আমার আলমারির ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে? সে ভয় নেই, আমার তামাকে সালফার—থার্টি মেশানো থাকে। ফী কত, তাও ব’লে দিতে হবে নাকি? দেখছো না দেওয়ালে নোটিশ লটকানো রয়েছে বত্রিশ টাকা? আর ওষুধের দাম চার টাকা।’
নন্দবাবু টাকা দিয়া বিদায় লইলেন।
নিধু বলিল—’কেন বাওআ কাঁচা পয়হা নষ্ট করছ? থাকলে পাঁচ রাত বক্সে ব’সে ঠিয়াটার দেখা চলত। ও নেপাল—বুড়ো মস্ত ঘুঘু, নন—দাকে ভালমানুষ পেয়ে জেরা ক’রে থ ক’রে দিয়েছে। পড়ত আমার পাল্লায় বাছাধন, কত বড় হোমিওফাঁক দেকে নিতুম। এক চুমুকে তার আলমারি সুদ্ধ ওষুধ সাবড়ে না দিতে পারি তো আমার নাক কেটে দিও।’
গুপী। আজ আপিসে শুনছিলুম কে একজন বড় হাকিম ফারাক্কাবাদ থেকে এখানে এসেছে। খুব নামডাক, রাজা—মহারাজারা সব চিকিৎসা করাচ্ছে। একবার দেখালে হয় না?
ষষ্ঠী। এই শীতে হাকিমী ওষুধ? বাপ, শরবত খাইয়েই মারবে। তার চেয়ে তারিণী কোবরেজ ভাল।
অতঃপর কবিরাজী চিকিৎসাই সাব্যস্ত হইল।
পরদিন সকালে নন্দবাবু তারিণী কবিরাজের বাড়ি উপস্থিত হইলেন। কবিরাজ মহাশয়ের বয়স ষাট, ক্ষীণ শরীর, দাড়ি—গোঁফ কামানো। তেল মাখিয়া আটহাতী ধুতি পরিয়া একটি চেয়ারের উপর উবু হইয়া বসিয়া তামাক খাইতেছেন। এই অবস্থাতেই ইনি প্রত্যহ রোগী দেখেন। ঘরে একটি তক্তপোশ, তাহার উপর তেলচিটে পাটি এবং কয়েকটি মলিন তাকিয়া। দেওয়ালের কোলে দুটি ঔষধের আলমারি।
নন্দবাবু নমস্কার করিয়া তক্তপোশে বসিলে কবিরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন—’বাবুর কনথে আসা হচ্চেচ?’ নন্দবাবু নিজের নাম ও ঠিকানা বলিলেন।
তারিণী। রুগীর ব্যামোডা কী?
নন্দবাবু জানাইলেন তিনিই রোগী এবং সমস্ত ইতিহাস বিবৃত করিলেন।
তারিণী। মাথার খুলি ছেঁদা করে দিয়েছে নাকি?
নন্দ। আজ্ঞে না, নেপালবাবু বললেন পাথুরি, তাই আর মাথায় অস্তর করাই নি।
তারিণী। নেপাল! সে আবার কেডা?
নন্দ। জানেন না? চোরবাগানের নেপালচন্দ্র রায় M.B.F.T.S—মস্ত হোমিওপ্যাথ।
তারিণী। অঃ, ন্যাপলা, তাই কও। সেডা আবার ডাগদর হ’ল কবে? বলি, পাড়ায় এমন বিচক্ষণ কোবরেজ থাকতি ছেলেছোকরার কাছে যাও কেন?
নন্দ। আজ্ঞে, বন্ধু—বান্ধবরা বললে ডাক্তারের মতটা আগে নেওয়া দরকার, যদিই অস্ত্র চিকিৎসা করতে হয়।
তারিণী। যন্তিবাবু—রি চেন? খুলনের উকিল যন্তিবাবু?
নন্দ। ঘাড় নাড়িলেন।
তারিণী। তাঁর মামার হয় ঊরুস্তম্ভ। সিভিল সার্জন পা কাটলে। তিন দিন অচৈতন্যি। জ্ঞান হলি পর কইলেন, আমার ঠ্যাং কই? ডাক তারিণী স্যানরে। দেলাম ঠুকে এক দলা চ্যবনপ্রাশ। তারপর কি হ’ল কও দিকি?
নন্দ। আবার পা গজিয়েছে বুঝি?
‘ওরে অ ক্যাবলা, দেখ দেখ বিড়েলে সবডা ছাগলাদ্য ঘ্রেত খেয়ে গেল’— বলিতে বলিতে কবিরাজ মহাশয় পাশের ঘরে ছুটিলেন। একটু পরে ফিরে আসিয়া যথাস্থানে বসিয়া বলিলেন—’দ্যাও নাড়ীডা একবার দেখি। হঃ, যা ভাবছিলাম তাই। ভারী ব্যামো হয়েছিল কখনও?’
নন্দ। অনেক দিন আগে টাইফয়েড হয়েছিল।
তারিণী। ঠিক ঠাউরেছি। পাঁচ বছর আগে?
নন্দ। প্রায় সাড়ে সাত বছর হ’ল।
তারিণী। একই কথা, পাঁচ দেরা সারে সাত। প্রাতিক্কালে বোমি হয়?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। হয় জানতি পার না। নিদ্রা হয়?
নন্দ। ভাল হয় না।
তারিণী। হবেই না তো। উর্ধু হয়েছে কি না। দাঁত কনকন করে?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। করে, জানতি পার না, যা হোক, তুমি চিন্তা কোরো নি বাবা। আরাম হয়ে যাবানে। আমি ওষুধ দিচ্চি।
কবিরাজ মহাশয় আলমারি হইতে একটি শিশি বাহির করিলেন, এবং তাঁহার মধ্যস্থিত বড়ির উদ্দেশ্যে বলিলেন— ‘লাফাস নে, থাম থাম। আমার সব জীয়ন্ত ওষুধ, ডাকলি ডাক শোনে। এই বড়ি সকাল—সন্ধি একটা করি খাবা। আবার তিনদিন পরে আসবা। বুজেচ?’
নন্দ। আজ্ঞে হ্যাঁ।
তারিণী। ছাই বুজেচ। অনুপান দিতি হবে না? ট্যাবা লেবুর রস আর মধুর সাথি মাড়ি খাবা। ভাত খাবা না। ওলসিদ্ধ, কচুসিদ্ধ এইসব খাবা। নুন ছোবা না। মাগুর মাছের ঝোল একটু চ্যানি দিয়া রাঁধি খাতি পার। গরম জল ঠান্ডা করি খাবা।
নন্দ। ব্যারামটা কি?
তারিণী। যারে কয় উদুরি। উর্ধুশ্লেষ্মাও কইতি পার।
নন্দবাবু কবিরাজের দর্শনী ও ঔষধের মূল্য দিয়া বিমর্ষচিত্তে বিদায় লইলেন।
নিধু বলিল—’কি দাদা, কোব্রেজির সাধ মিটল?
গুপী। নাঃ এ—সব বাজে চিকিৎসার কাজ নয়। কোথাও চেঞ্জে চল।
বঙ্কু। আমি বলি কি, নন্দ বে—থা করে ঘরে পরিবার আনুক। এ—রকম দামড়া হয়ে থাকা কিছু নয়।
নন্দ চিঁ চিঁ স্বরে বলিলেন—’আর পরিবার। কোন দিন আছি, কোন দিন নেই। এই বয়সে একটা কচি বউ এনে মিথ্যে জঞ্জাল জোটানো।’
নিধু বলিল—’নন—দা, একটা মোটর কেন মাইরি। দু—দিন হাওয়া খেলেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে। সেভেন সিটার হডসন; ষেটের কোলে আমরা তো পাঁচজন আছি।’
ষষ্ঠী। তা যদি বললে, তবে আমার মতে মোটর—কারও যা পরিবারও তা। ঘরে আনা সোজা; কিন্তু মেরামতী খরচ যোগাতে প্রাণান্ত। আজ টায়ার ফাটল কাল গিন্নীর অম্বল—শূল, পরশু ব্যাটারি খারাপ, তরশু ছেলেটার ঠাণ্ডা লেগে জ্বর। অমন কাজ ক’রো না, নন্দ! জেরবার হবে। এই শীতকালে কোথা, দু—দণ্ড লেপের মধ্যে ঘুমুব মশায়, তা নয়, সারারাত প্যান প্যান ট্যাঁ ট্যাঁ।
