নিধু। ষষ্ঠী খুড়ো যে রকম হিসেবী লোক, একটি মোটা—সোটা রোঁ—ওলা ভাল্লুকের মেয়ে বে করলে ভাল করতেন। লেপ—কম্বলের খরচা বাঁচত।
গুপী। যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপান্ন। কাল সকালে নন্দ একবার হাকিম সাহেবের কাছে যাও। তারপর যা হয় করা যাবে।
নন্দবাবু অগত্যা রাজী হইলেন।
হাজিক—উল—মুলক বিন লোকমান নূরুল্লা গজন ফরুল্লা অল হকিম য়ুনানী লোয়ার চিৎপুর রোডে বাসা লইয়াছেন। নন্দবাবু তেতলায় উঠিলে একজন লুঙ্গিপরা ফেজ—ধারী লোক তাহাকে বলিল— ‘আসেন বাবুমশায়। হামি হাকিম সাহেবের মীরমুন্সী। কি বেমারি বোলেন, হামি লিখে হুজুরকে ইতালা ভেজিয়ে দিব।’
নন্দ। বেমারি কি সেটা জানতেই তো আসা বাপু।
মুন্সী। তব ভি কুছু তো বোলেন। না —তাকতি, বুখার, পিল্লি, চেকে ঘেঘ, বাওআসির, রাত—অন্ধি—
নন্দ। ও—সব কিছু বুঝলুম না বাপু। আমার প্রাণটা ধড়ফড় করছে।
মুন্সী। সো হি বোলেন। দিল তড়পনা। মোহর এনেছেন?
নন্দ। মোহর?
মুন্সী। হাকিম সাহেব চাঁদি ছোন না। নজরানা দো মোহর। না থাকে আমি দিচ্ছি। পয়তালিশ টাকা, আর বাট্টা দো টাকা, আর রেশমী রুমাল দো টাকা। দরবারে যেয়ে আগে হুজুরকে বন্দগি জনাব বোলবেন, তার পর রুমালের ওপর মোহর রেখে সামনে ধরবেন।
মুন্সী নন্দবাবুকে তালিম দিয়া দরবারে লইয়া গেল। একটি বৃহৎ ঘরে গালিচা পাতা, একপার্শ্বে মসনদের উপর তাকিয়া হেলান দিয়া হাকিম সাহেব ফরসিতে ধুমপান করিতেছেন। বয়স পঞ্চান্ন, বাবরী চুল, গোঁফ খুব ছোট করিয়া ছাঁটা। আবক্ষলম্বিত দাড়ির গোড়ার দিক সাদা, মধ্য লাল, ডগায় নীল। পরিধান সাটিনের চুড়িদার ইজার, কিংখাপের জোব্বা, জরির তাজ। সম্মুখে ধূপদানে মুসব্বর এবং রুমী মস্তগি জ্বলিতেছে, পাশে পিকদান, পানদান, আতরদান ইত্যাদি। চার—পাঁচজন পারিষদ হাঁটু মুড়িয়া বসিয়া আছে এবং হাকিমের প্রতি কথায় ‘কেরামত’ বলিতেছে। ঘরের কোণে একজন ঝাঁকড়া—চুলো চাপ—দেড়ে লোক সেতার লইয়া পিড়িং পিড়িং এবং বিকট অঙ্গভঙ্গী করিতেছে।
নন্দবাবু অভিবাদন করিয়া মোহর নজর দিলেন। হাকিম ঈষৎ হাসিয়া আতরদান হইতে কিঞ্চিৎ তুলা লইয়া নন্দর কানে গুঁজিয়া দিলেন। মুন্সী বলিল—’আপনি বাংলায় বাতচিত বোলেন। হামি হুজুরকে সমঝিয়ে দিব।’
নন্দবাবুর ইতিবৃত্ত শেষ হইলে হাকিম ঋষভকণ্ঠে বলিলেন—’সর লাও!’
নন্দ শিহরিয়া উঠিলেন। মুন্সী আশ্বাস দিয়া বলিল—’ডরবেন না মশায়। জনাবকে আপনার শির দেখলান!’
নন্দর মাথা টিপিয়া হাকিম বলিলেন—’হড্ডি পিলপিলায় গয়া।’
মুন্সী। শুনেছেন? মাথার হাড় বিলকুল লরম হয়ে গেছে।
হাকিম তিনরঙা দাড়িতে আঙুল চালাইয়া বলিলেন—’সুর্মা সুর্খ!’
একজন একটা লাল গুঁড়া নন্দর চোখের পল্লবে লাগাইয়া দিল। মুন্সী বুঝাইল—’আঁখ ঠাণ্ডা থাকবে, নিদ হোবে।’ হাকিম আবার বালিলেন—’রোগন বব্বর।’ মুন্সী হাঁকিল ‘এ জী বালবর, অস্তুরা লাও।’
নন্দবাবু—’হাঁ—হাঁ’ আরে তুম করো কি’—বলিতে বলিতে চট করিয়া তাঁহার ব্রহ্মতালুর উপর দু—ইঞ্চি সমচতুষ্কোণ কামাইয়া দিল, আর একজন তাহার উপর একটা দুর্গন্ধ প্রলেপ লাগাইল। মুন্সী বলিল—’ঘবড়ান কেন মশয়, এ হচ্ছে বব্বরী সিংগির মাথার ঘি। বহুত কিম্মত। মাথার হাড্ডি সকত হোবে।’
নন্দবাবু কিয়ৎক্ষণ হতভম্ব অবস্থায় রহিলেন। তার পর প্রকৃতিস্থ হইয়া বেগে ঘর হইতে পলায়ন করিলেন। মুন্সী পিছনে ছুটিতে ছুটিতে বলিল—’হামার দস্তুরি?’ নন্দ একটা টাকা ফেলিয়া দিয়া তিন লাফে নীচে নামিয়া গাড়িতে উঠিয়া কোচমানকে বলিলেন—’হাঁকাও!’
সন্ধ্যাকালে বন্ধুগণ আসিয়া দেখিলেন বৈঠকখানার দরজা বন্ধ। চাকর বলিল, বাবুর বড় অসুখ, দেখা হইবে না। সকলে বিষণ্ণচিত্তে ফিরিয়া গেলেন।
সমস্ত রাত বিছনায় ছটফট করিয়া ভোর চারটার সময় নন্দবাবু ভীষণ প্রতিজ্ঞা করিলেন যে আর বন্ধুগণের পরামর্শ শুনিবেন না, নিজের ব্যবস্থা নিজেই করিবেন।
বেলা আটটার সময় নন্দ বাড়ি হইতে বাহির হইলেন এবং বড় রাস্তায় ট্যাক্সি ধরিয়া বলিলেন—’সিধা চলো।’ সঙ্কল্প করিয়াছেন, মিটারে এক টাকা উঠিলেই ট্যাক্সি হইতে নামিয়া পড়িবেন, এবং কাছাকাছি যে চিকিৎসক পান তাহারই মতে চলিবেন—তা সে অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, কবিরাজ, হাতুড়ে, অবধূত, মাদ্রাজী বা চাঁদসীর ডাক্তার যেই হউক।
বউবাজারে নামিয়া একটি গলিতে ঢুকিতেই সাইনবোর্ড নজরে পড়িল—’ডাক্তার মিস বি, মল্লিক।’ নন্দবাবু ‘মিস’ শব্দটি লক্ষ্য করেন নাই, নতুবা হয়তো ইতস্ততঃ করিতেন। একেবারে সোজা পরদা ঠেলিয়া একটি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন।
মিস বিপুলা মল্লিক তখন বাহিরে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া কাঁধের উপর সেফটি—পিন আঁটিতেছিলেন। নন্দকে দেখিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন—’কি চাই আপনার?’
নন্দবাবু প্রথমটা অপ্রস্তুত হইলেন, তার পর মরিয়া হইয়া ভাবিলেন—’দূর হ’ক না—হয় লেডি ডাক্তারের পরামর্শই নেব। বলিলেন—’বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।’
মিস মল্লিক। পেন আরম্ভ হয়েছে?
নন্দ। পেন তো কিছু টের পাচ্ছি না।
মিস। ফার্স্ট কনফাইনমেণ্ট?
নন্দ। আজ্ঞে?
মিস। প্রথম পোয়াতী?
নন্দ অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন—’আমি নিজের চিকিৎসার জন্যই এসেছি।’
মিস মল্লিক আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—’নিজের জন্যে? ব্যাপার কি?’
