নিধু বলিল—’নন—দা, মোটা চাল ছাড়। সেই এক বিরিঞ্চির আমলের ফরাস তাকিয়া, লক্কড় পালকি গাড়ি আর পক্ষীরাজ ঘোড়া, এতে গায়ে গত্তি লাগবে কিসে? তোমার পয়হার অভাব কি বাওআ? একটু ফুর্তি করতে শেখ।’
সাব্যস্ত হইল কাল সকালে নন্দবাবু ডাক্তার তফাদারের বাড়ি যাইবেন।
ডাক্তার তফাদার M.D M.R.A.S গ্রে স্ট্রীটে থাকেন। প্রকাণ্ড বাড়ি, দু—খানা মোটর, একটা ল্যাণ্ড। খুব পসার, রোগীরা ডাকিয়া সহজে পায় না। দেড় ঘণ্টা পাশের কামরায় অপেক্ষা করার পর নন্দবাবুর ডাক পড়িল। ডাক্তারসাহেবের ঘরে গিয়া দেখিলেন এখনও একটি রোগীর পরীক্ষা চলিতেছে। একজন স্থূলকায় মারোয়াড়ী নগ্নগাত্রে দাঁড়াইয়া আছে। ডাক্তার ফিতা দিয়া তাঁহার ভুঁড়ির পরিধি মাপিয়া বলিলেন—’বস, সওয়া ইঞ্চি বঢ় গিয়া।’ রোগী খুশি হইয়া বলিল—’নবজ তো দেখিয়ে।’ ডাক্তার রোগীর মণিবন্ধে নাড়ীর উপর একটি মোটর কারের স্পার্কিং প্লাগ ঠেকাইয়া বলিলেন—’বহুত মজেসে চল রহা।’ রোগী বলিল—’জবান তো দেখিয়ে। রোগী হাঁ করিল, ডাক্তার ঘরের অপর দিকে দাঁড়াইয়া অপেরা প্লাস দ্বারা তাহার জিব দেখিয়া বলিলেন—’থোড়েসি কসর হ্যায়। কল ফিন আনা।’
রোগী চলিয়া গেলে তফাদার নন্দর দিকে চাহিয়া বলিলেন—’ওয়েল?’
নন্দ বলিলেন—’আজ্ঞে বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। কাল হঠাৎ ট্রাম থেকে—
তফাদার। কম্পাউন্ড ফ্রাকচার? হাড় ভেঙেছে?
নন্দবাবু আনুপূর্বিক তাঁর অবস্থার বর্ণনা করিলেন। বেদনা নাই, জ্বর হয় না, পেটের অসুখ, সর্দি, হাঁপানি নাই। ক্ষুধা কাল হইতে একটু কমিয়াছে। রাত্রে দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছেন। মনে বড় আতঙ্ক।
ডাক্তার তাঁহার বুক পেট মাথা হাত পা নাড়ী পরীক্ষা করিয়া বলিলেন—’জিব দেখি।’
নন্দবাবু জিভ বাহির করিলেন।
ডাক্তার ক্ষণকাল মুখ বাঁকাইয়া কলম ধরিলেন। প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ হইলে নন্দর দিকে চাহিয়া বলিলেন—’আপনি এখন জিব টেনে নিতে পারেন। এই ওষুধ রোজ তিনবার খাবেন।’
নন্দ। কি রকম বুঝলেন?
তফাদার। ভেরি ব্যাড।
নন্দ সভয়ে বলিলেন—’কি হয়েছে?’
তফাদার। আরও দিন কতক ওয়াচ না করলে ঠিক বলা যায় না। তবে সন্দেহ করছি cerebral tumour with strangulated ganglia। ট্রিফাইন ক’রে মাথার খুলি ফুটো করে অস্ত্র করতে হবে, আর ঘাড় চিরে নার্ভের জট ছাড়াতে হবে। শর্ট—সার্কিট হয়ে গেছে।
নন্দ। বাঁচব তো?
তফাদার। দ’মে যাবেন না, তা হ’লে সারাতে পারব না। সাত দিন পরে ফের আসবেন। মাই ফ্রেণ্ড মেজর গোঁসাই এর সঙ্গে একটা কনসলটেশনের ব্যবস্থা করা যাবে। ভাত—ডাল বড় একটা খাবেন না। এগ—ফ্লিপ, বোনম্যারো সুপ, চিকেন—স্টু, এইসব। বিকেলে একটু বার্গণ্ডি খেতে পারেন। বরফ—জল খুব খাবেন। হ্যাঁ, বত্রিশ টাকা। থ্যাঙ্ক ইউ।
নন্দবাবু কম্পিত পদে প্রস্থান করিলেন।
সন্ধ্যাবেলা বঙ্কুবাবু বলিলেন—’আরে তখনি আমি বারণ করেছিলুম ওর কাছে যেয়ো না। ব্যাটা মেড়োর পেটে হাত বুলিয়ে খায়। এঁঃ, খুলির ওপর তুরপুন চালাবেন!’
ষষ্ঠীবাবু। আমাদের পাড়ার তারিণী কবিরাজকে দেখালে হয় না?
গুপীবাবু। না না, যদি বাস্তবিক নন্দর মাথার ভেতর ওলট—পালট হয়ে গিয়ে থাকে তবে হাতুড়ে বদ্দির কম্ম নয়। হোমিওপ্যাথিই ভাল।
নিধু। আমার কথা তো শুনবে না বাওআ। ডাক্তারি তোমার ধাতে না সয় তো একটু কোবরেজি করতে শেখ। দরওয়ানজী দিব্বি একলোটা বানিয়েছে। বল তো একটু চেয়ে আনি।
হোমিওপ্যাথিই স্থির হইল।
পরদিন খুব ভোরে নন্দবাবু নেপাল ডাক্তারের বাড়ি আসিলেন। রোগীর ভিড় এখনও আরম্ভ হয় নাই, অল্পক্ষণ পরেই তাঁর ডাক পড়িল। একটি প্রকাণ্ড ঘরের মেঝেতে ফরাশ পাতা। চারিদিকে স্তূপাকারে বহি সাজানো। বহির দেওয়ালের মধ্যে গল্পবর্ণিত শেয়ালের মত বৃদ্ধ নেপালবাবু বসিয়া আছেন। মুখে গড়গড়ার নল, ঘরটি ধোঁয়ায় ঝাপসা হইয়া গিয়াছে।
নন্দবাবু নমস্কার করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। নেপাল ডাক্তার কটমট দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন—’বসবার জায়গা আছে।’ নন্দ বসিলেন।
নেপাল। শ্বাস উঠেছে?
নন্দ। আজ্ঞে?
নেপাল। রুগীর শেষ অবস্থা না হ’লে তো আমায় ডাকা হয় না, তাই জিজ্ঞেস করছি।
নন্দ সবিনয়ে জানালেন তিনিই রোগী।
নেপাল। অ্যালোপ্যাথ ডাকাত ব্যাটারা ছেড়ে দিলে যে বড়? তোমার হয়েছে কি?
নন্দবাবু তাঁহার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করিলেন।
নেপাল। তফাদার কী বলেছে?
নন্দ। বললেন আমার মাথায় টিউমার আছে।
নেপাল। তফাদারের মাথায় কি আছে জান? গোবর। আর টুপির ভেতর শিং, জুতোর ভেতর খুর। পাতলুনের ভেতর ল্যাজ। খিদে হয়?
নন্দ। দু—দিন থেকে একেবারে হয় না।
নেপাল। ঘুম হয়?
নন্দ। না।
নেপাল। মাথা ধরে?
নন্দ। কাল সন্ধ্যেবেলা ধরেছিল।
নেপাল। বাঁ দিক?
নন্দ। আজ্ঞে হ্যাঁ।
নেপাল। না ডান দিক?
নন্দ। আজ্ঞে হ্যাঁ।
নেপাল ধমক দিয়া বলিলেন—’ঠিক ক’রে বল।’
নন্দ। আজ্ঞে ঠিক মধ্যিখানে।
নেপাল। পেট কামড়ায়?
নন্দ। সেদিন কামড়েছিল। নিধে কাবলী মটরভাজা এনেছিল তাই খেয়ে—
নেপাল। পেট কামড়ায় না মোচড় দেয় তাই বল।
নন্দ বিব্রত হইয়া বলিলেন—’হাঁচোড়—পাঁচোড় করে।’
ডাক্তার কয়েকটি মোটা মোটা বহি দেখিলেন, তার পর অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন—’হু’। একটা ওষুধ দিচ্ছি নিয়ে যাও। আগে শরীর থেকে অ্যালোপ্যাথিক বিষ তাড়াতে হবে। পাঁচ বছর বয়সে আমায় খুনে ব্যাটারা দু—গ্রেন কুইনীন দিয়েছিল, এখনও বিকেলে মাথা টিপ টিপ করে। সাতদিন পরে ফের এসো। তখন আসল চিকিৎসা শুরু হবে।’
