উকিল বিনোদবাবু বলিলেন—’চাটুজ্যেমশায়, আপনি এখনও সত্যযুগে আছেন। আজকাল আর সেকেলে গুরুর চলন নেই যিনি বছরে বার—দুই শিষ্যবাড়ি পায়ের ধুলো দেন আর পাঁচ সের চাল, পাঁচ পো চিনি, গোটা দশেক টাকা, লাট্টু মার্কা থান ধুতিতে বেঁধে প্রস্থান করেন। এখন এমন গুরু চাই চেহারা দেখলে মন খুশী হয়, বচন শুনলে প্রাণ আনচান করে।’
বংশলোচনের ভাগনে উদয় বলিল—’মামাবাবু যদি মামীকে মুরগি ধরাতেন তবে আর এসব খেয়াল হত না। তাইজন্যেই তো আমার শাশুড়ী মন্তর নিতে পারছেন না।’
চাটুজ্যে বলিলেন—’ছাই জানিস উদো। উপেন পালের নাম শুনেছিস? সেবার মধুপুরে গিয়ে দেখলুম—প্রকাণ্ড বাড়ি, দশ বিঘে বাগান, দশটা গাই, এক পাল মুরগি। রাজর্ষির চালে থাকেন, ঘরের তরি—তরকারি, ঘরের দুধ, ঘরের মুরগি। সস্ত্রীক ধর্ম আচরণ করেন, সঙ্গে চার জন গুরু হামেহাল হাজির, নিজের দুজন, স্ত্রীর দুজন।’
উপযুক্ত গুরু কে আছেন এই লইয়া অনেকক্ষণ আলোচনা হইল। পর্বতবাসী সন্ন্যাসী, আশ্রমবাসী মহারাজ, স্বচ্ছন্দচারী লেংটাবাবা, বৈজ্ঞানিক মহাপুরুষ, উদারপন্থী আধুনিক সাধু—অনেকের নাম উঠিল। কিন্তু মুশকিল এই বংশলোচন যাঁহাকে উপযুক্ত অর্থাৎ নিরাপদ মনে করেন, গৃহিণীর হয়তো তাঁহাকে পছন্দ হইবে না।
এমন সময় বংশলোচনের শালা নগেন দোতলা হইতে নামিয়া আসিয়া বলিল—’আপনারা আর মাথা ঘামাবেন না, দিদি গুরু ঠিক করে ফেলেছেন।’
বংশলোচন ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন—’কে?’
‘বালিগঞ্জের খল্বিদং স্বামী। অ্যাসা সুন্দর গাইতে পারেন! চেহারাটিও তেমনি, বয়সে এই জামাইবাবুর চেয়ে কিছু কম হবে। শুনেছি ছেলেবেলা থেকেই একটা উদাস উদাস ভাব ছিল, টেনিস খেলতে খেলতে কতবার অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। সংসারে যদ্দিন ছিলেন, নাম ছিল পরান সরকার। তারপর স্ত্রীবিয়োগ হতেই স্বামী হয়েছেন। এখন তার প্রায় দু—শ শিষ্য, চার—শ শিষ্যা।’
‘একবারে সব ঠিক হয়ে গেছে নাকি?’
‘উহুঁ, দিদি চালাক আছেন। কাল স্বামীজীকে নিয়ে আসছি, এখানে হপ্তা—খানেক জাঁকড়ে থাকবেন, যাকে বলে প্রোবেশন। তারপর দিদির যদি ভক্তিটক্তি হয় তবে মন্তর নেবেন।’
চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—’অতি উত্তম ব্যবস্থা। গুরুটির সন্ধান দিলে কে?’
নগেন বলিল—’আমিই দিয়েছি। আমার বন্ধুদের মহলে ওর খুব খ্যাতি। আপনারাও দেখলে মোহিত হয়ে যাবেন।’
পরদিন খল্বিদং স্বামীর শুভাগমন হইল, সঙ্গে কেবল একটি কমণ্ড৯লু আর একটি বড় সুটকেশ। নগেন মিথ্যা বলে নাই, টকটকে গৌরবর্ণ, চাঁচর ঝাঁকড়া চুল, মধুর কণ্ঠস্বর, চোখে একটা অপূর্ব প্রতিভান্বিত ঢুলুঢুলু ভাব। ছ—শ শিষ্য হওয়া কিছুই বিচিত্র নয়।
মানিনী দেবী প্রত্যহ শুদ্ধাচারে ভাবী গুরুদেবের সেবার আয়োজন করিতে লাগিলেন। স্বামীজীর নিত্যকর্মপদ্ধতি একেবারে ধরাবাঁধা। সকালবেলা অনুপানসহ তিন পাথরবাটি চা, দ্বিপ্রহরে পবিত্র অন্ন—ব্যঞ্জন, তাহার পর ঘন্টা তিন—চার যোগনিদ্রা, বিকালে নানাপ্রকার ফলমূল মিষ্টান্ন, পুনর্বার চা, সন্ধ্যায় মধুর কণ্ঠে ধর্মব্যাখ্যা, সঙ্গীত ও ঘুঙুর পরিয়া ভাবনৃত্য, রাত্রে সাত্ত্বিক লুচি পোলাও কালিয়া।
মানিনীর অন্তরে একটা সাড়া পড়িয়াছে। নভেল পড়া, লেস বোনা, ছাঁটা পশমের আসন তৈয়ারী প্রভৃতি সাংসারিক কার্যে আর তাঁহার মন পাই। প্রথম দিনেই তিনি নিজের হাতে স্বামীজীর উচ্ছ্বিষ্ট পরিষ্কার করিলেন। দ্বিতীয় দিনে পাতে প্রসাদ পাইলেন। তৃতীয় দিনে বংশলোচন রোমাঞ্চিত হইয়া দেখিলেন—খল্বিদং—এর চর্বিত আকের ছিবড়া মানিনী পরম ভক্তি সহকারে চুষিতেছেন। বংশলোচন বার বার স্বামীজীর বাণী স্মরণ করিতে লাগিলেন—সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম, এ সমস্তই ব্রহ্ম—কিন্তু মন প্রবোধ মানিল না। ব্রহ্ম নিখিল চরাচরে থাকিতে পারেন কিন্তু আকের ছিবড়ায় থাকিবেন কোন দুঃখে? একথা মনে করিতেই চিত্ত বিদ্রোহী হয়, পিত্ত চটিয়া ওঠে। ছি ছি বলিলে যথেষ্ট বলা হয় না, তোবা তোবা বলিতে ইচ্ছা করে।
চাটুজ্যে মহাশয় শুনিয়া বলিলেন—’তাইতো বেশী বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এই নগেনটাই যত নষ্টের গোড়া। দেশী ঠাকুরমশায় তোর দিদির মনে না ধরে তো একটা জটাধারী গাঁজাখোর আনলেই তো পারতিস।’
নগেন বলিল—’বা রে, আমি কেমন ক’রে জানব যে দিদির অত ভক্তি হবে?’
বংশলোচন কাতরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন—’এখন কি করা যায়?’
বিনোদ বলিলেন—’একটা ভৈরবী—টৈরবী ধ’রে এনে তুমিও সাধনা শুরু কর, বিষে বিষক্ষয় হয়ে যাক। আর যদি সাহস থাকে তবে গিন্নীকে মনের কথা খুলে বল, খল্বিদংকে অর্ধচন্দ্রং দাও।’
নগেন বলিল—’তা হলে দিদি ভয়ঙ্কর চটবে।’
কথাটা ভয়ঙ্কর সত্য, পত্নীর ধর্মাচরণে বাধা দেওয়া সহজ কথা নয়। বংশলোচন আকুল চিন্তাসাগরে হাবুডুবু খাইতে লাগিলেন। এমন যে বিচক্ষণ চাটুজ্যে মহাশয় আর তীক্ষ্নবুদ্ধি বিনোদ উকিল, ইঁহারাও প্রতিকারের কোনও সুসাধ্য উপায় খুঁজিয়া পাইতেছেন না। হায় হায়, কে তাঁহাকে রক্ষা করিবে? ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া হাল ছাড়িয়া বসিয়া থাকা ভিন্ন গত্যন্তর নাই।
মানিনী মনস্থির করিয়া ফেলিয়াছেন, খল্বিদংকেই গুরুত্বে বরণ করিবেন। কাল সকালে দীক্ষা। বাড়ির পূর্বদিক সংলগ্ন যে মাঠটি আছে তাহাতে একটি বেদী রচনা করিয়া চারিদিকে ফুলের টব দিয়া সাজানো হইয়াছে। আজ বৈকালে খল্বিদং নিজে ঘুরিয়া ঘুরিয়া সমস্ত আয়োজন তদারক করিতেছেন। বংশলোচন, চাটুজ্যে, বিনোদ ইত্যাদি পিছনে পিছনে আছেন, মানিনীও একটু তফাতে থাকিয়া সমস্ত দেখিতেছেন।
