হাকিম ব্রজবিহারী অধিকারী ভুক্তভোগী লোক, বার দুই তাঁরও পকেট মারা গিয়েছিল। হাসি চেপে বললেন, পকেটে কাঁকড়াবিছে নিয়ে বাজারে যাওয়া অন্যায় কাজ। আসামী অপরাধী। ওঁকে সতর্ক করে দিচ্ছি, আর যেন এমন না করেন। আচ্ছা গোপীবাবু, আপনি যেতে পারেন।
গুপী সায়েব নমস্কার করে করজোড়ে বলল, হুজুর, একটা কোশ্চেন করতে পারি কি?
হাকিম বললেন, কি কোশ্চেন?
–আজ্ঞে, পঞ্জাবির পকেটে কাঁকড়াবিছে রাখা আমার ভুল হয়েছিল। কিন্তু যদি কোট পরি, তার পকেটের ওপর যদি বোতাম দেওয়া ফ্ল্যাপ থাকে, আর তার গায়ে যদি একটি নোটিস সেঁটে দিই–পাকিট মে বিচ্ছু হৈ, হাথ ঘসানা খতরনাক হৈ–তা হলে কি বেআইনী হবে?
হাকিম ব্রজবিহারী অধিকারী একটু চিন্তা করে বললেন, না, তা হলে বেআইনী হবে না। কিন্তু মাইণ্ড ইউ, আমি হাকিম হিসেবে মত প্রকাশ করছি না, একজন সাধারণ লোক হিসেবেই বলছি।
গুপী সায়েব খালাস হল, তার কিছু আক্কেলও হল। কিন্তু ব্যবসাবুদ্ধি তার কিছুমাত্র ছিল না। আমি বললাম, তোমার শ্বশুরবাড়ি কেষ্টনগরে না? কালই সেখানে যাও, হাজার খানিক মাটির কাঁকড়াবিছে অর্ডার দিয়ে এস, দাঁড়ার নীচে যেন ফাউন্টেন পেনের মতন ক্লিপ থাকে। বিজ্ঞাপন দেওয়া চলবে না, আমরা পাঁচজন মুখে মুখেই জিনিসটি চালু করে দেব। গুপী সায়েব হাজারটা নকল বিছে আনাল, বিশ দিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেল। খুব ডিমাণ্ড, আরও আনাতে হল। চোট্টু মিঞার দুর্ভোগের খবর পিকপকেট সমাজে রটে গিয়েছিল, পথচারী ভদ্রলোকদের পকেট থেকে দুটি দাঁড়া উঁকি মারছে দেখে তারা আতঙ্কে কাঁপতে লাগল, তাদের পপশা একদম বন্ধ হয়ে গেল। তার পর ক্রমশ জানাজানি হল যে আসল বিচ্ছ, নয়, মাটির তৈরী। পকেটমারদের ভয় ভেঙে গেল, তারা আবার ব্যবসা শুরু করল।
ইতিহাস শুনে নয়নচাঁদ বললেন, হ, দিব্যি আষাঢ়ে গল্প বানিয়েছ। এখন কাজের কথা বলা হদয় দাস মোটর কিনছে ভাল কথা। আমার ছেলেকে বিলেত পাঠাতে রাজী আছে তো?
বিষণ্ণ মুখে আমি বললাম, আজ্ঞে না। মোটর কিনছেন নিজের জন্যে। নাতজামাইকে বিলেত পাঠাতে পারবেন না।
–বটে। আমার ছেলেকে জলের দরে পেতে চান?
–আজ্ঞে না, অন্য জায়গায় নাতনীর সম্বন্ধ স্থির করেছেন। কি জানেন পাইন মশাই, আপনি ধনী মানী লোক, কাজেই অনেকের চোখ টাটায়। হিংসুটে লোকে ছেলের নামে ভাংচি দিয়েছে।
–কি বলেছে?
–বলেছে, ষাঁড়ের গোবর।
গুরুবিদায়
বৈকালিক প্রসাধনের পর মানিনী দেবী একটি বড় আরশির সামনে দাঁড়াইয়া নিজের অঙ্গশোভা নিরীক্ষণ করিতেছেন, এমন সময় একজোড়া গোঁফের প্রতিবিম্ব তাঁহার কাঁধের উপর ফুটিয়া উঠিল।
উক্ত গোঁফের মালিক তাঁহার স্বামী রায় বংশলোচন ব্যানার্জি বাহাদুর জমিদার অ্যাণ্ড অনরারি ম্যাজিস্ট্রেট বেলিয়াঘাটা। মানিনী একটি ছোট দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া ঘাড় না ফিরাইয়াই বলিলেন—’কি সুখেই যে মোটা হচ্ছি!’
বংশলোচন রসিকতার চেষ্টা করিয়া বলিলেন—’কেন, সুখের কমটাই বা কি, অমন যার স্বামী!’
মানিনী যদি সামান্য পাড়াগেঁয়ে স্ত্রীলোক হইতেন তবে হয়তো বলিয়া ফেলিতেন—পোড়াকপাল অমন স্বামীর। কিন্তু তাঁহার বাকসংযম অভ্যাস আছে, সেজন্য বলিলেন—’স্বামী তো খুবই ভাল, আমিই যে মন্দ।’
কথার ধারা গহন অরণ্যের দিকে মোড় ফিরিতেছে দেখিয়া বংশলোচন নিপুণ সারথির ন্যায় বলিলেন—’কি যে বল তার ঠিক নেই। কিসের অভাব তোমার? হুকুম করলেই তো হয়।’
মানিনী এইবার স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন—’বয়েস তো বেড়েই চলেছে, ধম্মকম্ম কিছুই হল না।’
বংশলোচন বলিলেন—’কেন, এই যে আর বৎসর গয়া কাশী বৃন্দাবন আগ্রা দিল্লী করে এলে?’
‘ভারী তো, তার ফল আর কদিন টিকবে। ইচ্ছে হয় মন্তর—টন্তর নি।’
‘তা বেশ তো, সে তো খুব ভাল কথা। আমি চাটুজ্যে মশায়ের সঙ্গে এখনই পরামর্শ করছি।’
কিন্তু বংশলোচনের মন বলিতে লাগিল যে কথাটি মোটেই ভাল নয়। ইঁহাদের বাইশ বৎসর ব্যাপী দাম্পত্যজীবনে অসংখ্যবার প্রীতির শৃঙ্খল মেরামত করিতে হইয়াছে, কিন্তু বংশলোচনের প্রাধান্য এ পর্যন্ত মোটামুটি বজায় আছে। পত্নীর গুরুভক্তি যদি প্রবলা হইয়া ওঠে তবে স্বামীর আসন কোথায় থাকিবে? গুরু যদি কেবল অখণ্ডমণ্ডলাকারের পদটি দেখাইয়া দিয়া ক্ষান্ত হন তবে কোনও আপত্তির কারণ থাকে না। কিন্তু গুরু যদি নিজেই ঐ পদটি দখল করিয়া বসেন তবেই চিন্তার কথা। মুশকিল এই যে, ধর্মের ব্যাপারে ঈর্ষা অভিমান শোভা পায় না। তবে এক হিসাবে তাঁহার পত্নীর এই নূতন শখটি নিরাপদ। মানিনী দেবী অত্যন্ত একগুঁয়ে মহিলা। যদি দেশের বর্তমান হুজুগের বশে তাঁহার পিকেটিং করিবার বা প্রভাতফেরি গাহিবার ঝোঁক হইত তবে বংশলোচনের মান—ইজ্জত অনারারি হাকিমি কোথায় থাকিত? তাঁহার মুরুব্বী ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবই বা কি বলিতেন? মোটের উপর দেশভক্তির চেয়ে গুরুভক্তিতে ঝঞ্ঝাট ঢের কম।
বংশলোচন বৈঠকখানায় আসিয়া তাঁহার অন্তরঙ্গগণের নিকট পত্নীর অভিলাষ ব্যক্ত করিলেন। বৃদ্ধ কেদার চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—’বউমার সংকল্প অত্যন্ত সাধু, তবে একটি সদ—গুরু দরকার। তোমাদের পৈতৃক গুরুর কুলে কেউ বেঁচে নেই?’
বংশলোচন বলিলেন—’শুনেছি একটি গুরুপুত্তুর আছেন, তিনি থিয়েটারে আবদালা সাজেন।’
‘রাধামাধব! আচ্ছা, আমাদের গুরুপুত্তুরটিকে একবার দেখলে পার। সেকেলে মানুষ, শাস্ত্রটাস্ত্র জানেন না বটে, কিন্তু পৈতৃক ব্যবসাটি বজায় রেখেছেন।’
