খল্বিদং গুনগুন করিয়া গান করিতে করিতে পায়চারি করিতেছেন এমন সময় তাঁহার নজরে পড়িল—মাঠের শেষ দিকে একটি বৃহদাকার ছাগল তাঁহাকে সতৃষ্ণনয়নে নিরীক্ষণ করিতেছে। এই ছাগলটি লম্বকর্ণ নামে খ্যাত। সে যখন ছোট ছিল তখন বংশলোচন তাহাকে বেওয়ারিস অবস্থায় কুড়াইয়া পাইয়া বাড়িতে আনেন। সেই অবধি সে পরিবারভুক্ত হইয়া গিয়াছে এবং মানিনীর অত্যধিক আদর পাইয়া ফুলিয়া উঠিয়াছে। এখন তাহার নবীন যৌবন। লম্বকর্ণ যদি মনুষ্য হইত তবে এ বয়সে তাহাকে তরুণ বলা চলিত। কিন্তু সে অজত্বের অভিশাপ লইয়া জন্মিয়াছে, তাই লোকে তাহাকে বলে বোকাপাঁঠা।
খল্বিদং স্বামী লম্বকর্ণকে দেখিয়া প্রসন্নবদনে বলিলেন—’শ্রীভগবানের কি অপূর্ব সৃষ্টি এই জীবটি। বেঁচে থাকার যে আনন্দ, তা এতে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। প্রাণশক্তি যেন সর্বাঙ্গে উথলে উঠছে।’
স্বামীজী মাঠের নরম ঘাসের উপর বসিয়া পড়িলেন এবং এক মুঠা ঘাস ছিঁড়িয়া লইয়া ডাকিলেন—’আ—তু তু তু।’
লম্বকর্ণ আসিল না, স্বামীজীর দিকে চাহিয়া আস্তে আস্তে পিছু হাটিতে লাগিল।
স্বামীজী বলিলেন—’আহা অবোধ জীব, কিঞ্চিৎ ভীত হয়েছে, আমাকে এখনও চেনে না কিনা। তোমরা ওকে তাড়া দিও না, জীবকে আকর্ষণ করার উপায় হচ্ছে অসীম করুণা, অগাধ তিতিক্ষা। আ—তু তু তু তু।’
লম্বকর্ণ ভীত হইবার ছেলে নয়। আসল কথা প্রথম দর্শনেই খল্বিদং—এর উপর তাহার একটা অহৈতুকী অভক্তি জন্মিয়াছে। আজ তাঁহার মুখের মধুর হাসিটুকু দেখিয়া সেই অহৈতুকী অভক্তি অকস্মাৎ একটা বেয়াড়া বদখেয়ালে পরিণত হইল। লোকে যাহাই বলুক, লম্বকর্ণ মোটেই বোকা নয়। ছাগল হইলে কি হয়, তাহার একটা সহজাত বৈজ্ঞানিক প্রতিভা আছে। লম্বকর্ণ কলেজে পড়ে নাই, পাস করে নাই, তথাপি জানা আছে যে বেগ আহরণ করিতে হইলে যথাসম্ভব দূর হইতে ধাবমান হওয়াই যুক্তিসংগত। আরও জানা আছে যে তাহার দেহে দেড় মণ মাংসকে যদি তাহার বেগের অঙ্ক দিয়া গুণ করা হয় তবে যে বৈজ্ঞানিক রাশি উৎপন্ন হয় তাহার ধাককা সামলানো মানুষের অসাধ্য।
কিছুদূর পিছু হটিয়া লম্বকর্ণ এক মুহূর্তে স্থির হইয়া দাঁড়াইল। তাহার পর ঘাড় নীচু করিয়া শিং বাঁকাইয়া স্বামীজীর নধর উদর নিশানা করিয়া নক্ষত্রবেগে সম্মুখে ছুটিল।
স্বামীজীর মুখে প্রসন্ন হাসি তখনও লাগিয়া আছে, কিন্তু আর সকলে ব্যাপারটি বুঝিয়া লম্বকর্ণকে নিরস্ত করিবার জন্য ত্রস্ত চীৎকার করিয়া উঠিল। কিন্তু কার সাধ্য রোধে তার গতি। নিমেষের মধ্যে লম্বকর্ণের প্রচণ্ড গুঁতা ধাঁই করিয়া লক্ষ্য স্থানে পৌঁছিল, খল্বিদং একবার মাত্র বাবা গো বলিয়া ডিগবাজি খাইয়া ধরাশায়ী হইলেন।
ডাক্তারবাবু বলিলেন—’শুধু বোরিক কমপ্রেস। পেট ফুটো হয়নি, চোটও বেশী লাগেনি, তবে শক—টা খুব খেয়েছেন। একটু পরেই উঠে বসতে পারবেন, তখন আবার দু—ড্রাম ব্রান্ডি। ব্যথাটা সারতে দিন—পনর লাগবে।’
ডাক্তার অত্যুক্তি করেন নাই। কিছুক্ষণ পরেই খল্বিদং চাঙ্গা হইয়া উঠিয়া বসিলেন। বলিলেন—’ছাগলটা গেল কোথায়?’
বিনোদবাবু বলিলেন—’সেটাকে বেঁধে রাখা হয়েছে, আপনার কোনও ভয় নেই।’
স্বামীজী বলিলেন—’ভয় আমি কোনও শালায় করি না। কিন্তু ছাগলটাকে এক্ষুনি মেরে তাড়াতে হবে, ওঠা মূর্তিমান পাপ।’
বিনোদবাবু বলিলেন—’বলেন কি মশায়, আপনারা হলেন করুণার অবতার, পাপীকে যদি ক্ষমা না করেন তবে বেচারা দাঁড়ায় কোথা? আর লম্বকর্ণের স্বভাবটা তো হিংস্র নয়, আজ বোধ হয় হঠাৎ কিরকম ব্লাড—প্রেশার বেড়ে গিয়ে মাথা গরম হয়ে—কি বলেন ডাক্তারবাবু?’
উদয় বলিল—’বউ আজ ওকে একছড়া গাঁদাফুলের মালা খাইয়েছে, তাইতো বোধ হয়।’
খল্বিদং ভ্রূকুটি করিয়া বলিলেন—’ও—সব আমি শুনতে চাই না। এ বাড়িতে দুজনের স্থান নেই, হয় আমি নয় ঐ ব্যাটা।’
বংশলোচন দুরুদুরু বক্ষে পত্নীর দিকে চাহিয়া বলিলেন—’কি বল? ছাগলটাকে তা হলে বিদেয় করা যাক?’
মানিনী সবেগে ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন—’বাপরে, সে আমি পারব না।’ এই কথা বলিয়াই তিনি সটান দোতলায় গিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বংশলোচনের এক জোড়া ছেঁড়া মোজা মেরামত করিতে লাগিয়া গেলেন।
খল্বিদং বলিলেন—’তা হলে আমিই বিদায় হই।’
চাটুজ্যে মহাশয় স্বামীজীর পিঠে হাত বুলাইয়া বলিলেন—’যা বলেছ দাদা। এই নির্বান্ধব পুরে দুশমনের হাতে কেন প্রাণটা খোয়াবে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও, বেঁচে থাকলে অনেক শিষ্য জুটবে। এস, আমি একটা ট্যাকসি ডেকে দিচ্ছি।’
বংশলোচন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া ভাবিতে লাগিলেন—স্ত্রীচরিত্র কি অদ্ভুত জিনিস।
১৩৩৭ (১৯৩০)
গুলবুলিস্তান
সম্প্রতি আরব্য উপন্যাসের একটি প্রাচীন পুথি উজবেকীস্তানে পাওয়া গেছে। তাতে যে আখ্যান আছে তা প্রচলিত গ্রন্থেরই অনুরূপ, কেবল শেষ অংশ একবারে অন্যরকম। বিচক্ষণ পণ্ডিতরা বলেন, এই নবাবিস্কৃত পথির কাহিনীই অধিকতর প্রামাণিক ও বিশ্বাসযোগ্য, নীতিসংগতও বটে। আপনাদের কৌতহলনিবৃত্তির জন্যে সেই উজবেকী উপসংহার বিবৃত করছি। কিন্তু তা পড়বার আগে প্রচলিত আখ্যানের আরমভ আর শেষ অংশ জানা দরকার। যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাই সংক্ষেপে মনে করিয়ে দিচ্ছি।
শাহরিয়ার ছিলেন পারস্য দেশের বাদশাহ, আর তাঁর ছোট ভাই শাহজমান ততির দেশের শাহ। দৈবযোগে তাঁরা প্রায় একই সময়ে আবিষ্কার করলেন, তাঁদের বেগমরা মায় সখী আর বাঁদীর দল সকলেই দ্রষ্টা। তখন দুই ভাই নিজ নিজ অন্তঃপুরের সমস্ত রমণীর মণ্ড চ্ছেদ করলেন এবং সংসারে বীতরাগ হয়ে একসঙ্গে পর্যটনে নির্গত হলেন।
