রেবতী ঘাড় নেড়ে জানালেন যে নেই।
নারদ বললেন, তবে আর কি, অবিলম্বে ব্রহ্মলোকে যাত্রা কর। আমি এখন কুবেরের কাছে যাচ্ছি, তাঁকে বলব তোমাদের যাতায়াতের জন্য পুষ্পক রথটা পাঠিয়ে দেবেন।
রাজা করজোড়ে বললেন, দেবর্ষি, আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন, নইলে ভরসা পাব না।
নারদ বললেন, বেশ, আমি শীঘ্রই কুবেরপুরী থেকে রথ নিয়ে এখানে আসব, তার পর একসঙ্গে ব্রহ্মলোকে যাওয়া যাবে।
নারদ ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে রৈবতী—ককুদ্মী ও রেবতী পুষ্পক বিমানে ব্রহ্মলোকে যাত্রা করলেন। তখন হিমালয় এখনকার মতন উঁচু হয় নি, মাথায় সর্বদা বরফ জমে থাকত না। হিমালয়ের উত্তর দিকে সমুদ্রতুল্য বিশাল একটি হ্রদ ছিল। তাঁরা হিমালয় হেমকূট নিষধ প্রভৃতি পর্বতমালা এবং হৈমবত হরি ইলাবৃত প্রভৃতি বর্ষ অর্থাৎ বড় বড় দেশ অতিক্রম করে দুর্গম ব্রহ্মলোকে গিয়ে ব্রহ্মার সভায় উপস্থিত হলেন। সেই অলৌকিক সভার বিবরণ দেবার চেষ্টা করব না, মহাভারতে আছে যে তা অবর্ণনীয়, তার রূপ ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়।
নারদের সঙ্গে রৈবত আর রেবতী যখন ব্রহ্মসভায় প্রবেশ করলেন তখন সেখানে গীত বাদ্য নৃত্য চলছে। লোকপিতামহ ব্রহ্মা একটি উচ্চ বেদীতে রত্নময় সিংহাসনে বিরাজ করছেন তাঁর বামে ব্রহ্মাণী এবং চারি পাশে দক্ষ প্রচেতা সনৎকুমার অসিতদেবল প্রভৃতি মহাত্মা এবং আদিত্য রুদ্র বসু প্রভৃতি গণদেবতা বসে আছেন। দুই বিখ্যাত গন্ধর্ব কালোয়াত হাহা হূ হূ অতিতান—রাগে মেঘগম্ভীর কণ্ঠে গান গাইছেন, অন্য দুই গন্ধর্ব তুম্বুরু ও ডুম্বুরু দুন্দুভি অর্থাৎ দামামা বাজাচ্ছেন। তখন মৃদঙ্গ আর বাঁয়া—তবলার সৃষ্টি হয়নি। দশজন বিদ্যাধর দশটি প্রকাণ্ড বীণায় ঝংকার দিচ্ছেন এবং উর্বশী রম্ভা মেনকা ঘৃতাচী প্রভৃতি অপ্সরার দল ঘুরে ঘুরে নৃত্য করছেন। একজন মহকায় দানব একটি অজগরতুল্য রামশিঙা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং মাঝে মাঝে তাতে ফুঁ দিয়ে প্রচণ্ড নিনাদে শ্রোতাদের আনন্দ বর্ধন করছে। সভাস্থ সকলে তন্ময় হয়ে সংগীত—রস পান করছেন এবং ভাবের আবেশে মাথা দোলাচ্ছেন।
ব্রহ্মার উদ্দেশে প্রণাম করে নারদ নিঃশব্দে সনৎকুমারের কাছে গিয়ে বসলেন। একজন বেত্রধারিণী প্রতিহারী যক্ষী ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রৈবত ও রেবতীর কাছে এল এবং ইঙ্গিত করে ডেকে নিয়ে তাঁদের সুখাসনে বসিয়ে দিলে।
একটু পরেই আব্রহ্ম—দেব—গন্ধর্ব—মানব প্রভৃতি সভাস্থ সকলে সবেগে মাথা আর হাত নেড়ে বলে উঠলেন—হা—হা—হাঃ! সাধু সাধু, অতি উত্তম! নৃত্যাগীতবাদ্য নিবৃত্ত হল। ব্রহ্মা, তখন রৈবত ও রেবতীর প্রতি প্রসন্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিকটে আসবার জন্য সংকেত করলেন।
পিতা—পুত্রী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে ব্রহ্মা বললেন, রাজা, তোমার কন্যাটি তো দেখছি পরমা সুন্দরী, বড়ও হয়েছে, এর বিবাহ দাও নি কেন?
রৈবত বললেন, ভগবান কন্যার বিবাহের জন্যই আপনার কাছে এসেছি। আমি অনেক ভাল ভাল পাত্রের সন্ধান পেয়েছি, কিন্তু রেবতী কাকেও পছন্দ করছে না। কাশীরাজ তুন্দবর্ধন, গান্ধারপতি গণ্ডবিক্রম, ত্রিগর্তযুবরাজ কড়ম্ব, কোশলরাজকুমার অর্ভক, দৈত্যরাজ প্রহ্লাদ—
ব্রহ্মা স্মিতমুখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
রৈবত বললেন, আপনিও কি এঁদের সুপাত্র মনে করেন না?
ব্রহ্মা বললেন, ওরা কেউ এখন জীবিত নেই, ওদের পুত্র—পৌত্র—প্রপৌত্রাদিও গত হয়েছে।
—বলেন কি পিতামহ!
—হাঁ, সব পঞ্চত্ব পেয়েছে। তোমারও আত্মীয়—স্বজন কেউ জীবিত নেই।
মস্তকে করাঘাত করে রৈবত বললেন, হা হতোস্মি! ভগবান, আমার রাজ্যের আর সকলে কেমন আছে? মুখ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে সমস্ত রেখে আপনার চরণদর্শনে এসেছি, এর মধ্যে অকস্মাৎ কোন দুর্বিপাকে আমার আত্মীয়বর্গ বিনষ্ট হল? আমার কোন পাপের এই পরিণাম?
ব্রহ্মা বললেন, মহারাজ, শান্ত হও। অকস্মাৎ বা তোমার পাপের ফলে কিছুই হয় নি, যথাবিধি কালবশে ঘটেছে। তোমার মন্ত্রী মিত্র ভৃত্য কলত্র বন্ধু প্রজা সৈন্য ধন কিছুই অবশিষ্ট নেই, কেবল তুমি আর তোমার কন্যা আছ।
আকুল হয়ে রৈবত বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না প্রভু। আমি কি স্বপ্ন দেখছি?
ব্রহ্মা সহাস্যে বললেন, স্বপ্ন নয়, সবই সত্য। আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। জান তো, আমার এক অহোরাত্র হচ্ছে মানুষের ৮৬৪ কোটি বৎসর। আচ্ছা, তুমি এই সভায় কতক্ষণ এসেছ?
রৈবত একটু ভেবে বললেন, বেশীক্ষণ নয়, সওয়া দণ্ড হবে।
ব্রহ্মা বললেন, গণনা করে বল তো, আমার এই ব্রহ্মসভায় সওয়া দণ্ডে নরলোকের কত বৎসর হয়?
মাথা চুলকে রৈবত বললেন, ভগবান, আমি গণিতশাস্ত্রে চিরকালই কাঁচা। দেবর্ষি নারদ যদি কৃপা করে অঙ্কটি কষে দেন—
নারদ বললেন, হরে মুরারে! অঙ্ক টঙ্ক আমার আসে না, ও হল নীচ গ্রহবিগ্রহের কাজ। রেবতী, তুমি তো শুনেছি খুব বিদূষী, নানা বিদ্যা জান, বল না কত হয়।
রেবতী বললেন, পিতামহ ব্রহ্মার এক অহোরাত্রে অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় যদি মানুষের ৮৬৪ কোটি বৎসর হয় তবে সওয়া দণ্ডে অর্থাৎ আধ ঘণ্টায় কত বৎসর হবে—এই তো? তা হল গিয়ে ১৮ কোটি বৎসর। ভগবান, ভুল হয়নি তো?
ব্রহ্মা বললেন, না না, ঠিক হয়েছে। মহারাজ, বুঝতে পারলে? তুমি যতক্ষণ এখানে সংগীত শুনছিলে ততক্ষণে নরলোকে আঠারো কোটি বৎসর কেটে গেছে। তোমরা সত্যযুগের গোড়ায় এসেছিলে তার পর বহু চতুর্যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন যে চতুর্যুগ চলছে তারও সত্য ত্রেতা গত হয়েছে, দ্বাপরও গতপ্রায়, কলিযুগ আসন্ন।
