ভুজঙ্গ। মহাবীরজী, এই কানাইদার দলটিকে ধ্বংস না করলে কিছুই হবে না, যতসব ভেকধারী ভণ্ড, ক্রোড়পতির কুত্তা।
কানাই। মুখ সামলে কথা বল ভুজঙ্গ।
ভুজঙ্গ। যত সব মিটমিটে শয়তান, বিড়াল—তপস্বী, রক্তচোষা বাদুড়।
কানাই গাঙ্গুলি অত্যন্ত চটে উঠে ঘুষি তুলে মারতে এল, ভুজঙ্গ তার হাত ধরে ফেললে। দুজনে ধস্তাধস্তি হতে লাগল।
সুবোধবাবু বিব্রত হয়ে বললেন, তোমাদের কি স্থান কাল জ্ঞান নেই, এখন মারামারি করছ? ওহে অবধবিহারী, থামিয়ে দাও না।
অবধবিহারী। হামি আজ একাদসি কিয়েছি বাবুজী, বহুত কমজোর আছি।
বিপাশা। মহাবীরজী, আপনি উপস্থিত থাকতে এই সুন্দ—উপসুন্দের লড়াই হবে?
ভূতনাথ তড়াক করে লাফিয়ে উঠল এবং নিমেষের মধ্যে পিছন থেকে লাথি মেরে কানাই আর ভূজঙ্গকে ধরাশায়ী করে দিলে। তারপর আবার নিজের চেয়ারে বসে চোখ কপালে তুলে সমাধিস্থ হল।
গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ভুজঙ্গ বললে, সুবোধবাবু, আপনার বাড়িতে এই অপমান সইতে হবে?
পাছায় হাত বুলুতে বুলুতে কানাই বললে কুমোরের পুত্তুর ভূতো নন্দী ব্রাহ্মণের গায়ে লাথি মারবে?
অবধবিহারী। এ কনহৈয়াবাবু, গুসসা করবেন না। লাত তো ভূতনাথবাবুর থোড়াই আছে, খুদ মহাবীরজী লাত লাগিয়েছেন।
কবিরত্ন। ঠিক কথা, ভূতনাথের সাধ্য কি। স্বয়ং শ্রীহনুমান কলহ নিবারণের জন্য লাথি ছুড়েছেন। দেবতার পদাঘাতে চিত্তশুদ্ধি হয়, তাতে অপমান নেই।
বিপাশা। যেতে দিন, যেতে দিন। মহাবীরজী, কিছু মনে করবেন না।
অবধবিহারী। আচ্ছা মহাবীরজী, বোলেন তো, রামরাজ্য হোনেসে শেয়ার মার্কিট কুছ তেজ হোবে? বড়া নুকসান যাচ্ছে।
মহাবীর উত্তর দিলেন না।
ভূতনাথের মাথা ধীরে ধীরে সোজা হতে লাগল। লক্ষণ দেখে সুবোধবাবু বললেন, কনট্রোল ছেড়ে গেছেন। একটু পরে ভূতনাত হাই তুলে তুড়ি দিয়ে বললে, দাদা, একটু চা আনতে বলুন।
অবধবিহারী। আরে ভূতনাথবাবু, মহাবীরজী তো বহুত ঝঞ্ঝট কি বাত বোলিয়েছেন, লাথ ভি মারিয়েছেন।
ভূতনাথ। বলেন কি! লাথি মেরেছেন? কাকে? আমাদের কানাইদা আর ভুজঙ্গদাকে? সর্বনাশ, ইশ, বড় অপরাধ হয়ে গেছে। কিছু মনে করবেন না দাদারা –আমার কি আর হুঁশ ছিল! দিন, পায়ের ধুলো দিন।
১৩৫৬ (১৯৪৯)
রেবতীর পতিলাভ
বিষ্ণুপুরাণে রাজা রৈবত—ককুদ্মী ও তাঁর কন্যা রেবতীর একটি বিচিত্র আখ্যান আছে। সেই ছোট আখ্যানটি বিস্তারিত করে লিখছি। এই পবিত্র পুরাণকথা যে কন্যা শ্রদ্ধাসহকারে একাগ্রচিত্তে পাঠ করে তার অচিরে সর্বগুণান্বিত বাঞ্ছিত পতি লাভ হয়।
পুরাকালে কুশস্থলী নগরীতে রৈবত—ককুদ্মী নামে এক ধর্মাত্মা রাজা ছিলেন। তিনি রেবত রাজার পুত্র সেজন্য তাঁর নাম রৈবত, এবং ককুদযুক্ত বৃষ অর্থাৎ ঝুঁটিওয়ালা ষাঁড়ের তুল্য তেজস্বী সেজন্য অপর নাম ককুদ্মী। সেকালে মহত্ত্ব ও বীরত্বের নিদর্শন ছিল সিংহ, ব্যাঘ্র ও বৃষ, সেজন্য কীর্তিমান লোকের উপাধি দেওয়া হত—পুরুষসিংহ, নরশার্দুল, ভরতর্ষভ, মুনিপুংগব, ইত্যাদি।
রৈবত রাজার রেবতী নামে একটি কন্যা ছিলেন, তিনি রূপে, গুণে অতুলনা। রেবতী বড় হলে তাঁর বিবাহের জন্য রাজা পাত্রের খোঁজ নিতে লাগলেন। অনেক পাত্রের বিবরণ সংগ্রহ করে রৈবত একদিন তাঁর কন্যাকে বললেন, দেখ রেবতী, আর বিলম্ব করতে পারি না, তোমার বয়স ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। তুমি অত খুঁত ধরলে বরই জুটবে না। আমি বলি কি, তুমি কাশীরাজ তুন্দবর্ধনকে বিবাহ কর।
রেবতী ঠোঁট কুঁচকে বললেন, অত্যন্ত মোটা আর অনেক স্ত্রী। আমি সতীনের ঘর করতে পারব না।
রাজা বললেন, তবে গান্ধারপতি গণ্ডবিক্রমকে বিবাহ কর তাঁর স্ত্রী বেশী নেই।
—গণ্ডমূর্খ আর অনেক বয়স।
—আচ্ছা, ত্রিগর্ত দেশের যুবরাজ করম্বকে কেমন মনে হয়?
—কাঠির মতন রোগা।
—কোশলরাজকুমার অর্ভক?
—সে তো নিতান্ত ছেলেমানুষ।
—তবে আর কথাটি নয়, দৈতরাজ প্রহ্লাদকে বরণ কর। অমন রূপবান ধনবান বলবান আর ধর্মপ্রাণ পাত্র সমগ্র জম্বুদ্বীপে নেই।
রেবতী বললেন, উনি তো দিনরাত হরি হরি করেন, ও রকম ভক্ত লোকের সঙ্গে আমার বনবে না।
রৈবত হতাশ হয়ে বললেন, তবে তুমি নিজেই একটা পছন্দ মতন স্বামী জুটিয়ে নাও। যদি চাও তো স্বয়ংবরের আয়োজন করতে পারি, যাকে মনে ধরবে তার গলায় মালা দিও।
—কার গলায় দেব? সব সমান অপদার্থ।
এমন সময় দেবর্ষি নারদ সেখানে উপস্থিত হলেন। যথাবিধি পূজা গ্রহণ করে কুশল—প্রশ্নের পর নারদ বললেন, তোমরা পিতা—পুত্রীতে কিসের বাদানুবাদ করছিলে?
রৈবত উত্তর দিলেন, আর বলবেন না দেবর্ষি। এখনকার মেয়েরা অত্যন্ত অবুঝ হয়েছে, কিছুতেই বর মনে ধরে না। আমি অনেক চেষ্টায় পাঁচটি ভাল ভাল পাত্রের সন্ধান পেয়েছি, কিন্তু রেবতী কাকেও পছন্দ করছে না। স্বয়ংবরা হতেও চায় না, বলছে সব অপদার্থ। আপনি যা হয় একটা ব্যবস্থা করুন।
নারদ বললেন, রেবতী নিতান্ত অন্যায় কথা বলে নি, আজকাল রূপে গুণে উত্তম পাত্র পাওয়া দুরূহ। চেহারা দেখে আর খবর নিয়ে স্বভাব—চরিত্র জানা যায় না। এক কাজ কর, প্রজাপতি ব্রহ্মাকে ধর, তিনিই রেবতীর বর স্থির করে দেবেন।
রাজা বললেন, ব্রহ্মার নির্বাচিত বরও হয়তো রেবতীর মনে ধরবে না।
নারদ বললেন, না ধরবে কেন? আমাদের পিতামহ বিরিঞ্চি সর্বজ্ঞ, তাঁর নির্বাচনে ভুল হবে না। আর, তোমার কন্যারও তো কোনও বিশেষ পুরুষের উপর টান নেই। আছে নাকি রেবতী?
