শোকে অবসন্ন হয়ে রৈবত বললেন, ভগবান, আমার গতি কি হবে?
ব্রহ্মা উত্তর দিলেন, কি আবার হবে, তোমার ভাববার কিছু নেই। এখন ফিরে গিয়ে কন্যার বিবাহ দাও, তাহলে তুমি সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হবে। অমরাবতী তুল্য তোমার যে রাজধানী ছিল—কুশস্থলী, তার নাম এখন দ্বারকাপুরী হয়েছে, তা যাদবগণের অধিকারে আছে। পরমেশ্বর বিষ্ণু সম্প্রতি নরলোকে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং যাদববংশে জন্মগ্রহণ করে স্বকীয় অংশে বলদেবরূপে নরলীলা করছেন। সেই মায়ামানব বলদেবকে তোমার কন্যা দান কর। তিনি আর রেবতী সর্বাংশে পরস্পরের যোগ্য।
রৈবত বললেন, আপনার আদেশ শিরোধার্য, বলদেবকেই কন্যাদান করব।কিন্তু আমার গতি কি হবে প্রভু?
—আবার বলে গতি কি হবে! বৃদ্ধ হয়েছ, একমাত্র সন্তান রেবতীকে সৎপাত্রে দিচ্ছ, আর তোমার বেঁচে থেকে লাভ কি, রাজ্যেরই বা প্রয়োজন কি? তোমার রাজ্য তো রেবতীরই শ্বশুরবংশের অধিকারে আছে। মেয়ের বিবাহ দিয়ে তুমি সোজা ব্রহ্মলোকে ফিরে এস এবং সশরীরে আমার কাছে সুখে বাস কর। এর চাইতে আর কি সদগতি চাও?
রৈবত বললেন, তাই হবে প্রভু। কিন্তু দেবর্ষি নারদও আমার সঙ্গে মর্ত্যলোকে চলুন, আমি বড় অসহায় বোধ করছি।
নারদ বললেন, বেশ তো, আমি তোমার সঙ্গে যাব। কোনও চিন্তা করো না, রেবতীর বিবাহব্যাপারে আমি তোমাকে সর্বপ্রকারে সাহায্য করব।
ফেরবার সময় রৈবত ও রেবতী আকাশ থেকে দেখলেন, হিমালয়ের উত্তরে যেখানে নিম্নভূমি ছিল সেখানে অত্যুচ্চ মালভূমির উদ্ভব হয়েছে। যে জলরাশি ছিল তা শুকিয়ে বালুকাময় মরুভূমি হয়ে গেছে। হিমালয় আর ঢিপির মতন নেই, সুবিশাল অধিত্যকা আর উপত্যকায় তরঙ্গায়িত হয়েছে, শত শত চূড়া আকাশে উঠেছে, তার উপর দিক তুষারে আচ্ছন্ন, সেই তুষার সূর্যতাপে দ্রবীভূত হয়ে অসংখ্য নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছে। গাছপালাও আর আগের মতন নেই, জন্তুদের আকৃতিও বদলে গেছে। নারদ বুঝিয়ে দিলেন যে বিগত আঠারো কোটি বৎসরে ধীরে ধীরে এইসব প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে।
পুষ্পক রথ যখন রৈবত—ককুদ্মীর ভূতপূর্ব রাজ্যের নিকটে এল তখন নারদ বললেন, মহারাজ, লোকালয়ে নেমে কাজ নেই, লোকে তোমাদের রাক্ষস মনে করে গোলযোগ বাধাতে পারে।
রৈবত আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, রাক্ষস মনে করবে কেন? কালক্রমে মানুষের বুদ্ধিও কি লোপ পেয়েছে?
নারদ বললেন, আমাকে দেখে কিছু বলবে না, কারণ আমার অণিমা প্রভৃতি যোগৈশ্বর্য আছে, ইচ্ছামত লম্বা কিংবা বেঁটে হয়ে জনসাধারণের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি। কিন্তু তোমাদের তো সে শক্তি নেই।
কিছুই বুঝতে পারছি না দেবর্ষি। আবার কি নূতন সংকট উপস্থিত হল?
—নূতন কিছু হয় নি, সবই যুগপরিবর্তনের ফল। তোমরা সত্যযুগের গোড়ায় জন্মেছ, যুগলক্ষণ অনুসারে তুমি লম্বায় একুশ হাত। মেয়েরা পুরুষের চেয়ে একটু খাটো হয়, তাই রেবতী উনিশ হাত লম্বা। কিন্তু ও এখনও ছেলেমানুষ, পরে আরও আধ হাত বাড়বে।
—আপনি কি যা—তা বলছেন! আমার এই রাজদণ্ডটি ঠিক এক হাত। এই দিয়ে আমাকে মেপে দেখুন না, আমি লম্বায় বড় জোর চার হাত হব।
—তোমার হাতের মাপে তাই হতে পার বটে, কিন্তু সে মাপ ধরছি না। কলিযুগে মানুষের হাতের যে মাপ, সকল শাস্ত্রে তাই প্রামাণিক গণ্য হয়। সেই কলিযুগীয় মাপে তুমি একুশ হাত আর রেবতী উনিশ হাত লম্বা।
—তা হলেই বা ক্ষতি কি?
—সত্যযুগে মানুষ যেমন একুশ হাত লম্বা, তেমনি ত্রেতায় চোদ্দ হাত, দ্বাপরে সাত হাত, কলিতে সাড়ে তিন হাত। এখন নরলোকে দ্বাপরের অন্তিম দশা, কলিযুগ আসন্ন, সেজন্য মানুষ খাটো হতে হতে চার হাতে দাঁড়িয়েছে, বড় জোর সওয়া চার হাত। এখানকার বেঁটে লোকরা যদি সহসা তোমাদের দেখে তবে রাক্ষস মনে করে ইট পাথর ছুড়বে। বিবাহের পূর্বে এরকম গোলযোগ হওয়া কি ভাল?
—আমাদের কি কর্তব্য আপনিই বলুন।
নারদ বললেন, নীচে ওই পাহাড়টি চিনতে পারছ?
রৈবত বললেন, হাঁ হাঁ খুব পারছি, ও তো আমারই প্রমোদগিরি, ওর উপরে নীচে অনেক উপবন আছে, রেবতী ওখানে বেড়াতে ভালবাসে।
—রাজা, তুমি কীর্তিমান। আঠারো কোটি বৎসর অতীত হয়েছে তথাপি লোকে তোমাকে ভোলে নি, তোমার নাম অনুসারে ওই পর্বতের নাম দিয়েছে রৈবতক। ওখানেই রথ নামানো হক। রেবতীর বিবাহ পর্যন্ত তুমি ওখানে গোপনে বাস কর।
একটু উত্তেজিত হয়ে রৈবত বললেন, লুকিয়ে থাকব কার ভয়ে? এ তো আমারই রাজ্য। আর, আপনিই তো বলেছেন এখানকার মানুষ অত্যন্ত ক্ষুদ্রকায়। আমি একাই সকলকে যমালয়ে পাঠিয়ে নিজ রাজ্য অধিকার করব।
নারদ বললেন, মহারাজ রৈবত—ককুদ্মী, তুমি সার্থকনামা, একগুঁয়ে ষাঁড়ের মতন কথা বলছ, তোমার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে। সকলকে মেরে ফেললে কাকে নিয়ে রাজত্ব করবে? তোমার ভাবী জামাতার বংশ ধ্বংস হলে রেবতীর বিবাহ কি করে হবে? ওসব কুবুদ্ধি ত্যাগ কর।
রৈবত বললেন, আমার মাথার মধ্যে সব গুলিয়ে গেছে। আপনি যা আজ্ঞা করবেন তাই পালন করব।
ইন্দ্রের দিব্য বিমানের একজন সারথি আছে—মাতলি। কুবেরের পুষ্পক রথ আরও উঁচু দরের, সারথির দরকার হয় না। রথটি সচেতন ও জ্ঞানবান, কথা বুঝতে পারে, বলতেও পারে। রামায়ণ উত্তরকাণ্ড দ্রষ্টব্য।
নারদ বললেন, বৎস পুষ্পক, তুমি যথাসম্ভব নিম্নমার্গে ওই রৈবতক পর্বত প্রদক্ষিণ করে ধীরে ধীরে উড়তে থাক। পুষ্পক ‘যে—আজ্ঞে’ বলে মণ্ডলাকারে চলতে লাগল। তিন ধার প্রদক্ষিণের পর নারদ বললেন, আমার সব দেখা হয়েছে, এইবারে অবতরণ কর। পুষ্পক রথ ভূমিস্পর্শ করে স্থির হল।
