বিপাশা। কিন্তু আবার তো অরাজক হল?
মহাবীর। উঁহু। গরুরা গণতন্ত্রের মন্ত্র শিখেছে, তারা নিজেদের মধ্যে থেকে কয়েকটি চালাক উদ্যমশীল গরু নির্বাচন করে তাদের উপর প্রজাশাসনের ভার দিল। কিছুকাল পরে দেখা গেল, সেই শাসক—গরুদের খাড়া খাড়া গোঁফ বেরিয়েছে, শিং খসে গেছে, খুরের জায়গায় থাবা আর নখ হয়েছে। তাদের কেউ বাঘের, কেউ শেয়ালের, কেউ ভালুকের রূপ পেয়েছে। প্রজা—গরুরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ভাই সব, এ কি দেখছি? কোন পাপে তোমাদের এই শ্বাপদ—দশা হল? শাসক—গরুরা উত্তর দিলে, হুঁ হুঁ, পাপ নয়, আমরা ক্ষত্রিয় হয়েছি, ঘাস খেয়ে রাজকার্য করা চলে না, জাবর কাটতে বৃথা সময় নষ্ট হয়। এখন আমরা আমিষাহারী। ঘরে—বাইরে শত্রুরা ওত পেতে আছে, তোমাদের রক্ষণ আর সেবার জন্য বিস্তর কর্মচারী রাখতে হয়েছে। আমাদের প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়, সেজন্য ক্ষুধাও প্রবল। বনের সব মৃগ আমরা খেয়ে ফেলেছি। যদি সুশাসন চাও তবে তোমরা সকলে কিঞ্চিৎ স্বার্থত্যাগ করে আমাদের উপযুক্ত আহার যোগাও, যেমন সিংহের আমলে যোগাতে। গরুরা রাজী হল। কিন্তু গুটি—কতক ধূর্ত গরু ভাবলে, বাঃ, এরা তো বেশ আছে, সর্দারি করে বেড়াচ্ছে, ঘাস খুঁজতে হচ্ছে না, জাবর কাটতে হচ্ছে না, আমাদেরই হাড় মাস কড়মড় করে খাচ্ছে। আমরাই বা ফাঁকে পড়ি কেন? এই স্থির করে তারা দল বেঁধে শ্বাপদ গরুদের গুঁতিয়ে তাড়িয়ে দিলে এবং নিজেরাই শাসক হল। কিছুকাল পরে তারাও শ্বাপদ হয়ে গেল এবং তাদের দেখে অন্য গরুদেরও প্রভুত্বের লোভ হল। এই রকমে সমস্ত গরু গুঁতোগুঁতি কামড়াকামড়ি করে মরে গেল, গোনর্দ দেশ একটি গোভাগাড়ে পরিণত হল।
কানাই। আপনার এই গল্পের মরাল কি? আপনি কি বলতে চান গণতন্ত্র খারাপ?
মহাবীর। তন্ত্রে রাজ্যশাসন হয় না, মানুষই রাজ্য চালায়। গণতন্ত্র বা যে তন্ত্রই হোক, তা শব্দ মাত্র, লোকে ইচ্ছানুসারে তার ব্যাখ্যা করে।
সুবোধ। ঠিক বলেছেন। ব্রিটেন আমেরিকা রাশিয়া প্রত্যেকেই বলে যে তাদের শাসনতন্ত্র খাঁটি ডিমোক্রাসি।
মহাবীর। শাসনপদ্ধতির নাম যাই হ’ক দেশের জনসাধারণ রাজ্য চালায় না, তারা কয়েকজনকে পরিচালক রূপে নিযুক্ত করে, অথবা ধাপ্পায় মুগ্ধ হয়ে একজনের বা কয়েকজনের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। এই কর্তারা যদি সুবুদ্ধি সাধু নিঃস্বার্থ ত্যাগী কর্মপটু হয় তবে প্রজারা সুখে থাকে। কিন্তু কর্তারা যদি মূর্খ হয়, অথবা ধূর্ত অসাধু স্বার্থপর ভোগী আর অকর্মণ্য হয় তবে প্রজারা কষ্ট পায়, কোনও তন্ত্রেই ফল হয় না।
ভুজঙ্গ। আপনার রামরাজ্য কি ছিল? একেবারে অটোক্রাসি, স্বৈরতন্ত্র, প্রজাদের কোনও ক্ষমতা ছিল না।
মহাবীর। কে বললে ছিল না? কোশলরাজমহিষী সীতার বনবাস হল কাদের জন্য? শম্বুককে মারা হল কাদের কথায়?
বিপাশা। কিন্তু রামচন্দ্রের এইসব কাজ কি ভাল?
মহাবীর। ভালই হ’ক আর মন্দই হ’ক রামচন্দ্র লোকমত মেনেছিলেন। তখনকার ভাল—মন্দের বিচার করা এখনকার লোকের সাধ্য নয়। লোকমত সৃষ্টি করেন প্রভাবশালী সুবুদ্ধি সাধুগণ, অথবা ধূর্ত অসাধুগণ। রামচন্দ্র নিজের মতে চলতেন না। নিঃস্বার্থ জ্ঞানী ঋষিরা কর্তব্য—অকর্তব্য বেঁধে দিয়েছিলেন, রামচন্দ্র তাই মানতেন, প্রজারাও তাই মানত। এখনকার বিচারে ঋষিদের অনেক বিধানে ত্রুটি বেরুবে, কিন্তু তাঁরা ঐশ্বর্যকামী বা প্রভুত্বকামী ছিলেন না, রাজার কর্তব্য—অকর্তব্য সম্বন্ধেও সকলে প্রায় একমত ছিলেন, সেজন্য কেউ তাঁদের ছিদ্র পেত না, বিপক্ষও হত না।
সুবোধ। অর্থাৎ রামরাজ্য মানে ওআন পার্টি ঋষিতন্ত্র। এখন সেরকম ঋষি যোগাড় করা যায় কি করে?
মহাবীর। ঋষি চাই না। যাঁদের হাতে দেশশাসনের ভার এসেছে তাঁরা যদি বুদ্ধিমান সাধু নিঃস্বার্থ ত্যাগী কর্মী হন তবে লোকমত তাঁদের অনুসরণ করবে।
সুবোধ। কিন্তু ধূর্ত অসাধুরা তাঁদের পিছনে লাগবে, ভাঁওতা দিয়ে স্বপক্ষে ভোট যোগাড় করবে কর্তৃত্ব দখল করবে।
মহাবীর। কত দিন তা পারবে? স্বাধীনতালাভের চেষ্টায় তোমাদের বহু লোক বহু বাধা পেয়েছেন, জীবনপাতও করেছেন। তাঁরা স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেন নি, কিন্তু তাঁদের সাধনা সফল হয়েছে। রামরাজ্য অর্থাৎ সাধুজন—পরিচালিত রাজ্যের প্রতিষ্ঠাও সেই রকমের হবে। এই ব্রত যাঁরা নেবেন তাঁরা নিজের আচরণ দ্বারা প্রজার বিশ্বাসভাজন হবেন, উপস্থিত সুবিধার জন্য কুটিল পথে যাবেন না, লোভী ধনপতি অথবা অসাধু সহকর্মীদের সঙ্গে রফা করবেন না, দুষ্কর্ম উপেক্ষা করবেন না। বার বার পরাভূত হলেও তাঁদের চেষ্টা কালক্রমে সফল হবেই। যত দিন একদল লোক এই ব্রত না নেবেন তত দিন শাসনতন্ত্রের নাম নিয়ে তর্ক করা বৃথা।
কানাই। মহাবীরজী, আপনার ব্যবস্থা এখন অচল, ওতে গণতন্ত্র হবে না। এ যুগে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কেউ নেই।
মহাবীর। তবে সেই গরুদের মতন গুঁতোগুঁতি কামড়াকামড়ি করে মর গে।
সুবোধ। ব্রিটিশ জাতির মধ্যে কি অসাধুতা আর অপটুতা নেই? তাদের দেশে তো গণতন্ত্র অচল হয় নি।
মহাবীর। বিদেশে তারা যতই অন্যায় করুক, নিজের দেশ শাসনের জন্য যে সাধুতা আর পটুতা আবশ্যক তা তাদের আছে।
কানাই। যাই বলুন মহাবীরজী, আগে এই ভুজঙ্গ ভায়ার দলটিকে শায়েস্তা করতে হবে যত সব ঘরভেদী বিভীষণ, দাঙ্গাবাজ খুনে ডাকাত, কুচক্রী কমবক্ত কমরেড।
