বিপাশা। যাক যাক। আপনি যখন বাংলা জানেন তখন বাংলাতেই বলুন।
মহাবীর। কিরকম বাংলা? ঢাকাই, না মানভূমের, না বাগবাজারী, না বালিগঞ্জী?
বিপাশা। আপনি মাঝামাঝি ভবানীপুরী বাংলায় বলুন, তা হলে আমরা সবাই বুঝতে পারব।
কবিরত্ন। প্রভু মারুতি, আপনার আগমনে আমরা ধন্য হয়েছি, কিন্তু ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এলেন না কেন?
মহাবীর। তাঁর আসতে বয়ে গেছে। তোমাদের কি—এমন পুণ্য আছে যে তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে চাও? তাঁর আজ্ঞায় আমি এসেছি। এখন কি জানতে চাও চটপট বলে ফেল, আমার সময় বড় কম।
সুবোধ। শুনুন মহাবীরজী। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু আর কিছুই পাই নি।–
কবিরত্ন। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, গৃহ নেই, ধর্ম নেই, সত্য নেই, ত্যাগ নেই, বিনয় নেই, তপস্যা নেই–
অবধবিহারী। বিলুকল চোর, ডাকু, লুটেরা, কালাবাজারুয়া, গাঁঠ—কটৈয়া–
ভুজঙ্গ। পুঁজিপতির অত্যাচার, সর্বহারার আর্তনাদ, জুলুম, ফাসিজম, ধাপ্পাবাজি, কথার তুবড়ি, ভাইপো—ভাগনে—শালা—শালী—পিসতুতো—মাসতুতো—ভরণতন্ত্র–
কানাই। বিদেশী গুরুর প্ররোচনায় স্বদেশদ্রোহিতা, ভারতের আদর্শ বিসর্জন, স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিথ্যার প্রচার, কিষান—মজদুরকে কুমন্ত্রণা, বোকা ছেলেমেয়েদের মাথা খাওয়া, পিস্তল, বোমা–
মহাবীর। থাম থাম। কি চাও তাই বল।
অবধবিহারী। হামি বোলছি, শুনেন মহাবীরজী।–চারো তরফ ঘুস—খবৈয়া, সব মুনাফা ছিনিয়ে লিচ্ছে। বড় কষ্টে রহেছি, যেন দাঁতের মাঝে জিভ। বিভীখনজী জৈসা বোলিয়েছেন–
সুনহু পবনসুত রহনি হমারী।
জিমি দসননহি মহু জীভ বিচারী।।
প্রভু, এক মুক্কা মার কে ইয়ে সব দাঁত তোড়িয়ে দেন।
কবিরত্ন। তুমি একটু চুপ কর তো বাপু। মহাবীরজী, আমরা কেবল রামরাজ্য চাই, তা হলেই সব হবে। সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতদের বিনাশ, প্রজার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল।
কানাই। পণ্ডিত মশাই, ব্যস্ত হলে চলবে না, রাষ্ট্র—শাসনের ভার কদিনই বা আমরা পেয়েছি। মহাবীরজীর কৃপায় যদি দেশ—দ্রোহীদের জব্দ করতে পারি তবে দেখবেন শীঘ্রই কিষাণ—মজদুর—রাজ হবে।
কবিরত্ন। কিষাণ—মজদুর সেক্রেটারিয়েটে বসে রাজকার্য চালাবে?
ভুজঙ্গ। শোনেন কেন ওসব কথা, শুধু ভোট বজায় রাখবার জন্য ধাপ্পাবাজি।
কানাই। ভাই হে, ধাপ্পাবাজির ওস্তাদ তো তোমরা, তোমাদেরই গুটিকতক বুলি আমরা শিখেছি।
সুবোধ। থাম, এখন ঝগড়া করো না। মহাবীরজী, দলাদলিতে দেশ উৎসন্নে যাচ্ছে, আপনি প্রতিকারের একটা উপায় বলুন। আমরা চাই বিশুদ্ধ ডিমোক্রাসি অর্থাৎ গণতন্ত্র, কিন্তু নানা দলের নানা কথা শুনে লোকে ঘাবড়ে যাচ্ছে, ডিমোক্রাসি দানা বাঁধতে পাচ্ছে না।
মহাবীর। একটা প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন।–গোনর্দ দেশের রাজা গোবর্ধনের এক— লক্ষ গরু ছিল, তারা রাজধানীর নিকটস্থ অরণ্যে চরে বেড়াত, জনকতক গোপ তাদের পালন করত। কি একটা মহাপাপের জন্য অগস্ত্য মুনি শাপ দেন, তার ফলে রাজা এবং বিস্তর প্রজার মৃত্যু হল, অবশিষ্ট সকলে পালিয়ে গেল। রাজার গরুর পাল রক্ষকের অভাবে উদভ্রান্ত হয়ে পড়ল এবং হিংস্র জন্তুর আক্রমণে বিনষ্ট হতে লাগল। তখন একটি বিজ্ঞ বৃষ বললে, এরকম অরাজক অবস্থায় তো আমরা বাঁচতে পারব না, ওই পর্বতের গুহায় পশুরাজ সিংহ থাকেন, চল আমরা তাঁর শরণাপন্ন হই। গরুদের প্রার্থনা শুনে সিংহ বলল, উত্তম প্রস্তাব, আমি তোমাদের রাজা হলুম, তোমাদের রক্ষাও করব। কিন্তু আমাকেও তো জীবনধারণ করতে হবে, অতএব তোমরা রাজকর স্বরূপ প্রত্যহ একটি নধর গরু আমাকে পাঠাবে। গরুর দল রাজী হয়ে প্রণাম করে চলে গেল এবং সিংহকে রাজকর দিতে লাগল। কিছুকাল পরে সিংহ মাতব্বর গরুদের ডেকে আনিয়ে বললে, দেখ, একটি গরুতে আর কুলচ্ছে না, রাজ্যশাসনের জন্য অনেক অমাত্য পাত্রমিত্র বাহাল করতে হয়েছে। আমিও সংসারী লোক, পুত্রকন্যা ক্রমেই বাড়ছে, তাদেরও তো খাওয়াতে হবে। অতএব রাজকর বাড়াতে হচ্ছে, এখন থেকে তোমার প্রত্যহ দশটি গরু পাঠাও। গরুরা বিষণ্ণ হয়ে যে আজ্ঞে বলে চলে গেল। আরও কিছুকাল পরে সিংহ বললে, ওহে প্রজাবৃন্দ, দশটি গরুতে আর চলে না, রাজ্যশাসন সোজা কাজ নয়। আর তোমরাও অতি বেয়াড়া প্রজা, তোমাদের দমনের জন্য বিস্তর কর্মচারী রাখতে হয়েছে। অতএব এখন থেকে প্রতিদিন কুড়িটি করে গরু পাঠাও। গরুর মুখপাত্ররা উপায়ন্তর না দেখে এবারেও বললে, যে আজ্ঞে মহারাজ; তার পর কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেল। তখন সেই বিজ্ঞ বৃষ বললে, এই অরণ্যের উত্তর প্রান্তে এক মহাস্থবির তপস্বী বৃষ আছেন। পূর্বজন্মে তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন, অখাদ্য ভোজনের ফলে বৃষত্ব পেয়েছেন। এখন তিনি তপস্যা করে গবর্ষি হয়েছেন। তিনি মহাজ্ঞানী, চল তাঁকে আমাদের দুঃখ জানাই। গরুরা গবর্ষির আশ্রমে গিয়ে তাদের দুঃখের কথা বললে। কিছুক্ষণ ধ্যানস্থ থেকে গবর্ষি বললেন, আমি তোমাদের একটি মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি, এটি তোমরা নিরন্তর জপ কর–গোহিতায় গোভির্গবাং শাসনম।
বিপাশা। মানে কি হল?
কবিরত্ন। অর্থাৎ গরুর হিতের নিমিত্ত গরু কর্তৃক গরু শাসন।
বিপাশা। আশ্চর্য! ঠিক যেন government of the people, by the people, for the people.
মহাবীর। তার পর শোন। গবর্ষি বললেন, এই মন্ত্রটি তোমরা সর্বত্র প্রচার করবে, এক মাস পরে আবার আমার কাছে আসবে। গরুর দল মন্ত্র পেয়ে তুষ্ট হয়ে চলে গেল এবং এক মাস পরে আবার এল। গবর্ষি প্রশ্ন করলেন, তোমাদের সংখ্যা কত? গরুরা বললে, প্রায় এক লক্ষ; সিংহ অনেককে খেয়েছে, নয়তো আরও বেশী হত। গবর্ষি বললেন, সিংহ আর তার অনুচরবর্গের সংখ্যা কত? গরুরা বললে, শ—খানিক হবে। গবর্ষি বললেন, মন্ত্র জপ করে তোমাদের তেজ বৃদ্ধি পেয়েছে, এখন এক কাজ কর –সকলে মিলে শিং উঁচিয়ে চারিদিক থেকে তেড়ে গিয়ে সিংহদের গুঁতিয়ে দাও। গরুর দল মহা উৎসাহে সিংহদের আক্রমণ করলে, গোটাকতক গরু মরল, কিন্তু সিংহের দল একেবারে ধ্বংস হল।
