রাম বল, আর লিখব! দেখছ না, আমার সমস্ত খাতা কুচি কুচি করে ছিঁড়েছে, দামী ফাউনটেন পেনটা চিবিয়ে নষ্ট করেছে, ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে দিয়েছে। তোমার দিদিমার গুরুদেব বিষ্ণুপ্রয়াগে থাকেন না? তাঁর আশ্রমেই বাস করব ভাবছি। ভোরের গাড়িতে কলকাতায় ফিরে যাই চল, তার পর দিন দুইয়ের মধ্যে সব গুছিয়ে নিয়ে চুপি চুপি বিষ্ণুপ্রয়াগ রওনা হব।
১৩৫৮ (১৯৫১)
রামরাজ্য
জেলা জজ সুবোধ রায় সম্প্রতি অবসর নিয়ে কলকাতায় বাস করছেন। তিনি এখন গীতা পড়েন, সস্ত্রীক ঘন ঘন সিনেমা দেখেন, বন্ধুদের সঙ্গে ব্রিজ খেলেন এবং রাজনীতি নিয়ে তর্ক করেন। তাঁর আর একটি শখ আছে—প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে একটি সেয়াঁস বা প্রেতচক্রের অধিবেশন হয়। এই চক্রের সদস্য সাত জন, যথা—
সুবোধ রায় নিজে,
বিপাশা দেবী—তাঁর পত্নী,
হরিপদ কবিরত্ন—অধ্যাপক,
কানাই গাঙ্গুলী—প্রবীণ দেশপ্রেমী,
ভুজঙ্গ ভঞ্জ—নবীন দেশপ্রেমী,
অবধবিহারী লাল—কারবারী দেশপ্রেমী,
ভূতনাথ নন্দী—বিখ্যাত মিডিয়াম।
ভূতনাথ গুণী লোক। তিন মিনিট আবাহন করতে না করতে তার উপর পরলোকবাসীর ভর হয় এবং তার মুখ দিয়ে অনর্গল অলৌকিক বাণী বেরুতে থাকে। ভূতনাথের বয়স ত্রিশের মধ্যে। শোনা যায় পূর্বে সে স্কুলমাস্টার নিয়ে, তার পর গল্প নাটক ও কবিতা লিখত তারপর থিয়েটার সিনেমায় অভিনয় করত। এক কালে তার একটা কুস্তির আখড়াও ছিল। সম্প্রতি নিজের আশ্চর্য ক্ষমতা আবিষ্কার করে সে পেশাদার মিডিয়ম হয়েছে, সুবোধবাবু তাঁর একজন বড় মক্কেল।
প্রেতচক্রের মামুলি পদ্ধতি হচ্ছে—অন্ধকার ঘরে সদস্যগণ টেবিলের চারিধারে বসেন এবং সকলে হাত ধরাধরি করে কোনও পরলোকবাসীকে একমনে ডাকেন। কিন্তু সুবোধবাবু খুঁতখুঁতে লোক। অন্ধকারে অন্য পুরুষ—বিশেষ করে ওই ভুজঙ্গ ছোকরা—তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর হাত ধরে থাকবে, এ তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। ভাগ্যক্রমে ভূতনাথকে পেয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হয়েছেন। লোকটির আশ্চর্য ক্ষমতা, প্রেতাত্মার দল যেন তার পোষমানা। সে যেখানে মিডিয়ম হয় সেখানে হাত ধরার দরকার হয় না। অন্ধকার না হলেও চলে। এমন কি, প্রেতাত্মার কথার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে গল্প করা চলে, চা সিগারেট পান খেতেও বাধা নেই।
আজ শনিবার সন্ধ্যাবেলায় নীচের বড় ঘরে যথারীতি প্রেতচক্রের বৈঠক বসেছে, সকল সদস্যই উপস্থিত আছেন। ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু সব দরজা জানালা বন্ধ, পাছে কোনও উটকো লোক এসে বিঘ্ন ঘটায়।
পূর্বে কয়েকটি অধিবেশনে চন্দ্রগুপ্ত সিরাজুদ্দৌলা নেপোলিয়ন হিটলার প্রভৃতি নামজাদা লোক এবং পরলোকগত অনেক আত্মীয় স্বজন ভূতনাথের মারফত তাঁদের বাণী বলেছেন। সুবোধবাবু প্রশ্ন করলেন, আজ কাকে ডাকা হবে?
ভুজঙ্গ ভঞ্জ বললে, আমার দাদামশাইকে একবার ডাকুন। তাঁর ভিক্টোরিয়া মার্কা গিনিগুলো কোথায় রেখে গেছেন খুঁজে পাচ্ছি না।
অবধবিহারী লাল বললে, দাদা চাচা মামু মৌসা উ সব ছোড়িয়ে দেন, মহাৎমাজীকে বোলান। দেখছেন তো, দেশ জহান্নমে যাচ্ছে, তিনি একটা সলাহ দেন জৈসে তুরন্ত রামরাজ হইয়ে যায়।
কানাই গাঙ্গুলী বললে, তাঁকে আর কষ্ট দেওয়া কেন, ঢের করে গেছেন, এখন বিশ্রাম করুন।
ভুজঙ্গ ভঞ্জ বললে, মহাত্মাজীকে ডেকে লাভ নেই, তিনি কি বলবেন তা তো জানাই আছে। —চরকা চালাও, মাইনে কম নাও, হুইস্কি ছাড়, বান্ধবীদের তাড়াও, ব্রহ্মচর্য পালন কর। এসব শুনতে গেলে কি রাজ্য চালানো যায়! কি বলেন কানাই—দা?
বিপাশা দেবী বললেন, আচ্ছা মহাত্মাজীর যিনি ইষ্টদেব সেই রামচন্দ্রকে ডাকলে হয় না?
অবধবিহারী। বহুত অচ্ছি বাত বোলিয়েছেন, রামচন্দ্রজীকোই বোলান।
সুবোধ। সেই ভাল, রামরাজ্যের ফার্স্টহ্যাণ্ড খবর মিলবে।
ভুজঙ্গ। তাঁকে কোথায় পাবেন? তিনি ঐতিহাসিক পুরুষ কিনা তারই ঠিক নেই। ভূতনাথবাবু কি বলেন?
ভূতনাথ। চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
বিপাশা দেবীর প্রস্তাব সোৎসাহে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল। তখন সকলে গুনগুন করে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ গাইতে লাগলেন। দু মিনিট পরে ভূতনাথ চোখ কপালে তুলে মুখ উঁচু করে চেয়ারে হেলে পড়ল এবং অস্ফুট গোঁ গোঁ শব্দ করতে লাগল। সুবোধবাবু সসম্ভ্রমে বললেন, কনট্রোল এসে গেছেন,—অর্থাৎ মিডিয়মের উপর অশরীরী আত্মার আবেশ হয়েছে। অবধবিহারী বলে উঠল, রাজা রামচন্দ্রজীকি জয়!
ভূতনাথের মুখ থেকে শব্দ হল—খ্যাঁক খ্যাঁক। সুবোধবাবু বললেন, কে আপনি প্রভু?
অবধবিহারী। রাষ্ট্রভাষা হিন্দীমে পুছিয়ে, রামচন্দ্রজী বাংলা সমঝেন না। অপ কৌন হৈঁ মহারাজ?
আবার খ্যাঁক খ্যাঁক। কবিরত্ন হাতজোড় করে সবিনয়ে বললেন, প্রভু, যদি আমাদের অপরাধ হয়ে থাকে তো মার্জনা করুন। কৃপা—পূর্বক বলুন কে আপনি।
ভূতনাথের মুখ থেকে উত্তর বেরুল—অহম্মারুতিঃ।
অবধবিহারী। আরে, ই তো চীনা বোলি বোলছে!
কবিরত্ন। চীনা নয়, দেবভাষায় বলছেন—আমি মারুতি। স্বয়ং পবননন্দন শ্রীহনুমানের আবির্ভাব হয়েছে।
অবধবিহারী। জয় বজরঙ্গবলী মহাবীরজী!—
রাম কাজ লগি তব অবতারা।
কনক বরন তন পর্বতাকারা।।
প্রভু অপ হিন্দীমে কহিয়ে, রামরাজ্যকি ভাষা।
ভূতনাথের জবানিতে মহাবীর আর একবার সজোরে খ্যাঁক করে উঠলেন, তার পর বললেন, রামরাজ্যের ভাষার তুমি কি জানো হে? এখন গন্ধমাদনে থাকি, কিন্তু আমার আদি নিবাস কিষ্কিন্ধ্যা, মাইসোরের কাছে বেলারি জেলায়। আমার মাতৃভাষাই জগতের আদি ও বুনিয়াদি ভাষা। যদি সে ভাষায় কথা বলি তবে তোমাদের রাজাজী আর পট্টভিজী হয়তো একটু আধটু বুঝবেন, কিন্তু জহরলালজী রাজেন্দ্রজী আর তোমরা বিন্দুবিসর্গও বুঝবে না।
