তিন প্রণয়ী সাপের মতন ফোঁস ফোঁস করতে করতে চলে গেল।
এই পর্যন্ত লেখার পর রামধন একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গল্পের প্রথম খণ্ড শেষ হয়েছে, কিন্তু আসল জিনিস সমস্তই বাকী। এর পরেই প্লট জমে উঠবে, পাত্র—পাত্রীর সম্পর্ক জটিলতর হবে, রামধন ভানুমতীর খেল দেখাবেন। তিনি তাঁর চমৎকার প্লটটির সমধান মামুলী উপায়ে কিছুতেই হতে দেবেন না। দুজন নায়ককে মেরে ফেলে লাইন ক্লিয়ার করা অতি সহজ, কিন্তু তাতে বাহাদুরি কিছুই নেই। নায়িকাকেও তিনি মারবেন না অথবা দেশের কাজে বা ধর্মকর্মে তার জীবন উৎসর্গ করবেন না। রামধন প্রতিজ্ঞা করেছেন যে রম্ভার পরিকল্পনাটি বাস্তবে পরিণত করবেনই। কিন্তু শুধু তিন নায়কের একমুখী প্রেম এবং এক নায়িকার ত্রিমুখী প্রেম দেখালেই চলবে না, অন্য নরনারীর সঙ্গেও তাদের প্রেমলীলা দেখাতে হবে, তবেই তাঁর গল্পটি একেবারে অভাবিতপূর্ব বৈচিত্র্যময় রসঘন চমকপ্রদ হবে। প্রথম ধাক্কায় ঘাবড়ে গেলেও সমঝদার পাঠকরা পরে ধন্য ধন্য করবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিন নায়কের সঙ্গে এক নায়িকার মিলন ঠিক কি ভাবে দেখাবেন, তাদের যৌথ জীবনযাত্রার ব্যবস্থা কি রকম করবেন, সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কি ভাবে বজায় থাকবে—এই রকম নানা সমস্যা তাঁর মনে উঠতে লাগল। রামধন দমবার পাত্র নন। এতটা যখন গড়তে পেরেছেন তখন শেষটাই বা না পারবেন কেন। তাড়াতাড়ি করা ঠিক হবে না, তিনি দিনকতক লেখা বন্ধ রেখে বিশ্রাম নেবেন। তার মধ্যে সমাধানের একটা প্রকৃষ্ট পদ্ধতি নিশ্চয় তার মাথায় এসে পড়বে।
রামধন কলকাতা ছেড়ে কোন্নগরে গঙ্গার ধারে তাঁর এক বন্ধুর বাগানবাড়িতে এসে বিশ্রাম করতে লাগলেন। বিশ্রাম ঠিক নয়, একরকম তপস্যা। তিনি তার মনের বলগা ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁর কল্পনা এলোমেলো নানা পথে সমস্যার সমাধান খুঁজছে।
রাত বারোটা, রামধন বিছানায় শুয়ে সশব্দে ঘুমুচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর নাক ডাকা থেমে গেল। জাগা আর ঘুমের মাঝামাঝি অবস্থায় তিনি মশারির ভিতর থেকে দেখলেন, তিনটে ছায়ামূর্তি। মূর্তি ক্রমশ স্পষ্ট আর জীবন্ত হয়ে উঠল। রামধন তাদের চিনতে পারলেন, তাঁর গল্পের তিন নায়ক। তারা একটা গোল টেবিল বৈঠকে বসে তর্ক করছে।
বিদ্যাপতি বলছে, এই যে বিশ্রী বিপরিস্থিতি, এ থেকে উদ্ধার পাবার উপায় তো আমার মাথায় আসছে না।
বিক্রম সিংহ উত্তর দিলে, উপায় আছে। ডুয়েল লড়লে সহজে ফয়সালা হতে পারবে। এই ধর, প্রথমে তোমার সঙ্গে শ্যামসুন্দরের লড়াই হল, তুমি মরে গেলে। তার পর শ্যাম আর আমার লড়াই হল, শ্যাম মরল। তখন আর কোনও ঝঞ্ঝাট থাকবে না, আমার সঙ্গে রম্ভার শাদি হবে।
শ্যামসুন্দর বললে, তুমার মুণ্ড হবে, মানুষ খুন করার জন্য তুমাকে ফাঁসিতে লটকে দেবে। তা ছাড়া এখন হচ্ছে গান্ধীরাজ, খুন জখম চলবে না। আমি বলি কি—লটারি লাগাও।
বিদ্যাপতি বললেন, রম্ভা তাতে রাজী হবে না, ভারী বেয়াড়া মেয়ে। ওকে ছেড়ে দেওয়াই ভাল।
এমন সময় রম্ভা হঠাৎ এসে বললে, তোমরা কি স্থির করলে? তিন জনে একমত হয়েছ তো?
শ্যামসুন্দর বললে, হাঁ, তুমার নাক কাটি দিব। তুমাকে চাই না, আমার দু—গোটা ভাল ভাল বহু দেশে আছে, বিক্রম সিংএর ভি ওমদা ওমদা জোরু আছে। আর বিদ্যাপতিবাবুর বহু তো মজুত রয়েছে, উনি ইচ্ছা করলেই তেলেনা সরকারকে বিয়া করতে পারেন।
নায়কদের এই বিদ্রোহ দেখে রামধন আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। শুয়ে থেকেই হাত নেড়ে বললেন, না না, ওসব চলবে না।
শ্যামসুন্দর বললে, তু কোনরে শড়া? তুই কে?
রামধন উত্তর দিলেন, আমিই গল্পলেখক, তোমাদের স্রষ্টা আর ভাগ্যবিধাতা। তোমরা নিজের মতলবে চলতে পার না, আমি যেমন চালাব তেমনি চলবে। আমার মাথা থেকেই তোমরা বেরিয়েছ।
বিক্রম সিংহ বললে, এই ছুছুন্দরটা বলে কি? এই আমাদের পয়দা করেছে? আমাদের বাপ দাদা পরদাদা নেই?
রম্ভা বললে, কেউ নেই, কেউ নেই, আমরা সব ঝুটো।
বিক্রম সিংহ একটানে খাটের ছতরি খুলে ফেলে একটা কাঠ হাতে নিয়ে রামধনকে বললে, এই, আমরা সব ঝুটা?
রামধন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলেন, তা একরকম ঝুটা বই কি—যখন আমারই কল্পনাপ্রসূত আপনারা।
—তুই সাচ্চা না ঝুটা?
—আজ্ঞে আমি তো ঝুটা হতে পারি না।
—এই ডান্ডা সাচ্চা না ঝুটা?
—আজ্ঞে এও ঝুটা নয়।
অনন্তর তিন নায়ক আর এক নায়িকা ছতরির কাঠ দিয়ে বেচারা রামধনকে পিটতে লাগল। স্বামীর আর্তনাদ শুনে রামধন—পত্নী ননীবালার ঘুম ভেঙে গেল, তিনি একটি চিৎকার ছেড়ে মূর্ছিত হলেন। তার পর চার মূর্তি তাণ্ডব নাচতে নাচতে অদৃশ্য হল।
রামধন বেশী জখম হন নি। একটু পরে তিনি প্রকৃতিস্থ হয়ে কোনও রকমে বিছানা থেকে উঠলেন এবং ননীবালার মুখে চোখে জলের ছিটে দিয়ে তাঁকে চাঙ্গা করলেন।
ননীবালা ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, গেছে?
–গেছে।
–ডাকাত?
–ডাকাত নয়।
–সাহিত্যিক গুণ্ডা?
—তাও নয়। বেতাল জান? নিরাশ্রয় প্রেত মরা মানুষের দেহে ভর করলে বেতাল হয়।
শুনেছি, যদি পছন্দ মতন লাশ না পায় তবে তারা গল্পের খাতায় ঢুকে গিয়ে নায়ক—নায়িকার ওপর ভর করে। এ তাদেরই কাজ।
—তোমার ওপর ওদের রাগ কেন?
—বোধ হয় সেকেলে প্রেতাত্মা, আমার প্লটের রসগ্রহণ করতে পারে নি।
—তুমি আর ছাই ভস্ম লিখো না বাপু।
