বাড়ির তিন দিকে বাগান, একদিকে গাছে ঘেরা সবুজ মাঠ। বিকেলে সেখানে নানা জাতের শৌখিন পুরুষের সমাগম হয়। তারা টেনিস খেলে, চা বা ককটেল খায়, তার পর রম্ভাকে ঘিরে আড্ডা দেয়। এরা সবাই তার প্রেমের উমেদার, কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ কোনও প্রশ্রয় পায় নি, রম্ভা সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করেছে। পূর্বে অনেক মেয়েও এখানে আসত, কিন্তু পুরুষগুলোর একচোখোমির জন্য রেগে গিয়ে তারা আসা বন্ধ করেছে।
এই রকমে কিছুকাল কেটে গেল। যাদের ধৈর্য্য কম তারা একে একে আড্ডা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চেষ্টা করতে গেল। বাকী রইল শুধু আট জন পরম ভক্ত। সাড়ে সাত বলাই ঠিক কারণ একজন হচ্ছে ইস্কুলের ছাত্র, এবারে ম্যাট্রিক দেবে। সে কথা বলে না, শুধু হাঁ করে রম্ভাকে দেখে আর বোকার মতন হাসে।
এই সাড়ে সাত জনের মধ্যে তিন জনের পরিচয় জানলেই চলবে, বাকী সব নগণ্য। প্রথম লোকটি ডক্টর বিদ্যাপতি ঘোষ, বিস্তর ডিগ্রি নিয়ে সম্প্রতি বিলাত থেকে ফিরেছে, সরকারী ভাল চাকরি পেয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে ফ্লাইট—লেফটেনাণ্ট বিক্রম সিং রাঠোর, লম্বা চওড়া জোয়ান, এয়ার ফোর্সে কাজ করে, এখন ছুটিতে আছে। তৃতীয় লোকটি শ্যামসুন্দর ভ্রমরবররায়, উড়িষ্যার কোনও রাজার জ্ঞাতি, অতি সুপুরুষ, সরাইকেলার নাচ জানে।
ক্রমশ সকলের সন্দেহ হল যে বিদ্যাপতি ঘোষের দিকেই রম্ভা বেশী ঝুঁকেছে। কিন্তু দু দিন পরেই দেখা গেল, নাঃ, ওই ষণ্ডামার্কা বিক্রম সিংটার ওপরেই রম্ভার টান। আরও দু দিন পরে বোধ হল, উঁহু, ওই উড়িষ্যার নবকার্তিক শ্যামসুন্দরের প্রেমেই রম্ভা মজেছে।
কারও বুঝতে বাকী রইল না যে ওই তিনজনের মধ্যেই একজনকে রম্ভা বরমাল্য দেবে। অগত্যা আর সবাই আড্ডা থেকে ভেগে পড়ল, কিন্তু সেই ইস্কুলের ছেলেটি রয়ে গেল।
একদিন বিদ্যাপতি ঘোষ এক ঘণ্টা আগে এসে রম্ভাকে যথারীতি প্রণয়নিবেদন করলে। রম্ভা গদগদ স্বরে বললে, এর জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম, অনেকদিন থেকেই তোমাকে আমি ভালবাসি। তবে আজ আর বেশী কথা নয়, দশ দিন পরে তোমার কাছে আমার হৃদয় উদঘাটন করব।
পরদিন বিক্রম সিং রাঠোর এক ঘণ্টা আগে এসে বিবাহের প্রস্তাব করলে। রম্ভা বললে, থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার, তুমি আমার দিল কা পিয়ারা। লক্ষ্মীটি, ন দিন সময় দাও, তার পর পাকা কথা হবে।
তার পরদিন শ্যামসুন্দর ভ্রমরবররায় সকাল সকাল এসে বললে, শুন রম্ভা, তুমার জন্য আমি পাগল, তুমি আমার হও। রম্ভা উত্তর দিলে, আমিও তোমার জন্য পাগল, আট দিন সবুর কর, তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে।
নির্দিষ্ট দিনে সকলে উপস্থিত হলে চা খাওয়ার পর সেই ম্যাট্রিক ছাত্রটিকে রম্ভা বললে, গাবলু, তুমি বাড়ি যাও। গাবলুর পৌরুষে ঘা লাগল। একটু রুখে বললে, কেন?
—দু দিন পরে পরীক্ষা তা মনে নেই? তুমি অঙ্কে বেজায় কাঁচা। যাও, বাড়ি গিয়ে গসাগু লসাগু কষ গে, এখানে ইয়ারকি দিতে হবে না।
গাবলু সকলের দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে চলে গেল।
রম্ভা তার তিন প্রণয়ীকে বললে এখন এখানে কোনও বাজে লোক নেই, আমার মনের কথা খোলসা করে বলছি শোন। তোমাদের তিন জনের সঙ্গেই আমি প্রেমে পড়েছি, তিন জনই আমার বাঞ্ছিত বল্লভ, কান্ত দয়িত, দিলরুবা ডারলিং।
বিদ্যাপতি হতভম্ব হয়ে বললে, তুমি পাগল হয়েছ নাকি? বিয়ে তো একজনের সঙ্গেই হতে পারে।
বিক্রম সিং বললে, মরদের অনেক জোরু হতে পারে, কিন্তু ঔরতের এক শৌহর। এই হল আইন। তুমি আমাদের মধ্যে একজনকে বেছে নাও, নয় তো ভারী গড়বড় হবে।
শ্যামসুন্দর বললে, রম্ভা, তুমি একি বলছ? ছি ছি, হে জগন্নাথ দীনবন্ধু!
রম্ভা উত্তর দিলে, আমি সত্য বলেছি, আমার কথার নড়চড় হবে না। শোন বিদ্যাপতি, তুমি আমার দেশের লোক, বিদ্যার জাহাজ, তোমাকে আমার চাইই। আর বিক্রম সিংহ, রাজপুত জাতটির ওপর আমার ছেলেবেলা থেকেই একটা টান আছে। তোমার মতন নওজওআন বীরকে আমি কিছুতেই ছাড়তে পারি না। আর শ্যামসুন্দর, তুমি ললাটেন্দুকেশরীর বংশধর, তোমরা চিরকাল সৌন্দর্যের উপাসক, তুমি নিজেও পরম সুন্দর। তোমাকে না হলে আমার চলবে না।
শ্যামসুন্দর বললে, তবে আর এদিক ওদিক করছ কেন রম্ভা? তুমি রাধা আমি শ্যাম, আমাকে বিয়া কর।
রম্ভা বললে, রাধার সঙ্গে শ্যামের বিয়ে হয় নি।
বিদ্যাপতি বললে, রম্ভা, তুমি স্পষ্ট করে বল তো কাকে বিয়ে করতে চাও।
—কাকেও নয়। বিবাহের কোনও দরকার নেই, তোমরা তিন জনেই মিলে মিশে আমার কাছে থাকবে। যদি নিতান্ত না বনে তবে নিজের বাড়িতেই থেকো, ডেট ফিকস করে আমার কাছে আসবে।
—সমাজের ভয় কর না?
—আমরা নতুন সমাজ গড়ব। আবার বলছি শোন। তোমাদের তিন জনকেই আমি ভালবাসি। বিনা বিবাহে একসঙ্গে বা পালা করে যদি আমার সঙ্গে বাস কর তবে আমি ধন্য হব তোমরাও নিশ্চয় সুখী হতে পারবে। তাতে যদি রাজী না হও তবে চিরবিদায়, আমি তিব্বতে চলে যাব। আমার আদর্শ বিসর্জন দিতে পারব না।
বিদ্যাপতি বললে, স্ত্রীলোক সপত্নীর ঘর করতে পারে, কিন্তু পুরুষ সপতি বরদাস্ত করবে না, খুনোখুনি হবে।
শ্যামসুন্দর বললে, সে ভারি মুশকিলের কথা। আমরা মরে গেলে তুমি কার সঙ্গে ঘর করবে রম্ভা?
রম্ভা বললে আমার আর একটু বলবার আছে শোন। তোমরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ কর, বেশ করে ভেবে দেখ, সেকেলে সংস্কারের বশে আমার এই মহৎ সামাজিক এক্সপেরিমেণ্টটি পণ্ড করে দিও না। দশ দিন পরে তোমাদের সিদ্ধান্ত আমাকে জানিও, তার মধ্যে এখানে আর এসো না, তাতে শুধু বাজে তর্ক আর কথা কাটাকাটি হবে। এই আমার শেষ কথা।
