রাত্রি দ্বিপ্রহর। বৃদ্ধ গোবিন্দবাবু দোতলার ঘরে খাটের উপর গভীর নিদ্রায় মগ্ন। সহসা তাঁহার চোখের উপর একটা তীব্র আলোক পড়ায় ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। শুনিলেন, চাপা গলায় কে বলিতেছে—’খবরদার, চেঁচালেই গুলি ক’রব। লোহার আলমারির চাবি—শিগগির।’
গোবিন্দবাবু বুঝিলেন, আধুনিক চোর। একটা স্থবির চাকর ছাড়া বাড়িতে এখন দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই, তিনি নিজেও কয়দিন হইতে বাতে পঙ্গু হইয়া আছেন। অগত্যা বলিলেন—’চাবি তো আমার কাছে নেই, গিন্নীর কাছে, তিনি আবার চন্দননগরে তাঁর ভাই—এর বাড়ি গেছেন।’
চোর। মনিব্যাগ? ঘড়ি—টড়ি? আংটি?
গোবিন্দ। ঐ ড্রেসিং টেবিলটার টানার মধ্যে যা কিছু আছে। কিন্তু চেক বইখানা নিও না বাপু, সেটা তোমার কোনও কাজে লাগবে না।
টর্চের আলো ঘরের চারিদিকে ঘুরাইয়া চোর টেবিল খুঁজিতে লাগিল। অন্ধকারে সহসা টেবিলটায় ধাক্কা খাইয়া মেজেতে বসিয়া পড়িয়া চোর বলিল—’উঃ!’
গোবিন্দবাবু বলিলেন—’কি হ’ল?’
সাড়া নাই। কিছুক্ষণ পরে চোর আবার ‘উঃ’ করিল। গোবিন্দবাবু ভাবিত হইলেন। খাটের পাশেই একটা বাতির সুইচ, সেটা টিপিয়া ঘর আলোকিত করিলেন। দেখিলেন, চোর টেবিলের পাশে মেজেতে বসিয়া আছে, তাহার কোমরে হাত, মুখে কাতর ভঙ্গী।
গোবিন্দবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—’তোমারও বাত নাকি?’
চোর। উঁহু। মাস—দুই আগে ডেঙ্গু হয়েছিল, তার পর থেকে মাঝে মাঝে একটুতেই খিল ধরে। উঃ, উঠতে পারছি না।
গোবিন্দ। উঠতে পারবে একটু পরে। ওষুধপত্র খাচ্ছ?
চোর। ডেঙ্গু যখন ছিল তখন খেতুম। এখন আর খাই না।
গোবিন্দ। অন্যায় করছ, ডেঙ্গু বড় খারাপ ব্যারাম। দিনকতক তুলসীপাতার রস দিয়ে কুইনীন খেয়ে দেখ দিকি, ভারী উপকারী। যদি এ সময় পুরী কি দেওঘর গিয়ে থাকতে পার তো আরও ভাল।
চোর একটু হাসিয়া বলিল—’দেওঘর না শ্রীঘর?’
গোবিন্দ। তাও তো বটে, বুড়ো মানুষ, ভুলেই গিয়েছিলুম যে তুমি একজন চোর। কিন্তু ভয় নেই, আইন—আদালত আমার আর ভাল লাগে না। সাজা যা দেবার আমিই দেব, তবে বাতে কাবু করেছে এই যা মুশকিল।
চোর এইবার একটু সুস্থ হইয়া আস্তে আস্তে উঠিল।
গোবিন্দবাবু বলিলেন—’ব’স ঐ চেয়ারটায়।’
তরুণ চোর। পিছনে ওলটানো বড় বড় চুল, নাক—টেপা চশমা, তাহাতে দু—ইঞ্চি চওড়া কাল ফিতা, কাবুলী ফ্যাশনে ধুতি পরা, গায়ে রেশমী পঞ্জাবি, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতা, হাতে রিস্টওআচ ও পিস্তল।
গোবিন্দ। ও পিস্তলটা কোথা থেকে পেলে?
চোর। মুরগিহাটা থেকে, ছ—আনা দাম।
গোবিন্দ। খেলনা? তবু ভাল, আর্মস অ্যাক্টে পড়বে না। স্বদেশী ডাকাত?
চোর। ভবিষ্যতে তাই হয়তো হতে হবে। আপাতত ঝোঁকের মাথায়।
গোবিন্দ। বাপ নেই?
চোর। আছেন।
গোবিন্দ। তাড়িয়ে দিয়েছেন?
চোর। তিনি ঠিক তাড়ান নি, আমিই গৃহত্যাগ করেছি।
গোবিন্দ। ও, বুদ্ধদেব শ্রীচৈতন্যের মতন! কি হয়েছে বাপু, বৈরাগ্য?
চোর। বৈরাগ্য নয়, পৈতৃক জুলুম। বাবা হচ্ছেন সেকেলে জবরদস্ত পিতা। আজ সন্ধ্যাবেলা বন্ধুদের সঙ্গে অ্যাংলো—মোগলাই হোটেলে খাচ্ছি, হঠাৎ বাবা এসে খামকা যা—তা ব’লে গালাগালি দিলেন—একেবারে দু—শ লোকের সামনে। তার পর বললেন—এই কাত্তিক, অঘ্রান মাসে তোর বিয়ে রাখাল সিংগির মেয়ের সঙ্গে। আমি জবাব দিলুম—কখনই নয়।
গোবিন্দ। আর অমনি সিঁদকাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়লে।
চোর । আমার মনের অবস্থাটা আপনি বুঝতে পারছেন না সার। বাবা তো রেগে শেয়ালদা চলে গেলেন। আমি তখন ফিউরিয়স, বন্ধুরা নিয়ে গেল জিগীষা দেবীর কাছে—বিগ হামবগ। তার পর বাঁটলো আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। থাকতে পারলুম না, চুপি চুপি পালিয়ে এলুম, একটা কিছু ভয়ংকর করতে চাই—চুরি, ডাকাতি, খুন।
গোবিন্দ। রাখাল সিংগির মেয়েটা বিশ্রী বুঝি?
চোর। ভগবান জানেন আর বাবা জানেন। যার দেহের মনের কোনও সংবাদ আমি জানি না তাকে বিয়ে করি কি করে বলুন তো? পাড়াগেঁয়ে বাপ—মার মেয়ে, বিদেশে মামার কাছে মানুষ হয়েছে, মামা শুনেছি একটি আস্ত পাগল, ভাগনীটিকে নাকি বন্য জন্তু বানিয়েছেন। আমার মানসী প্রিয়া অন্য প্যাটার্নের, সিনথেসিস অভ পার্ফেকশন।
গোবিন্দ। কি রকম শুনি।
চোর সোৎসাহে বলিল—’শুনবেন?’ পঞ্জাবির পাশের পকেট হইতে একটা মোটা খাতা টানাটানি করিয়া বাহির করিল।
গোবিন্দ। কি ওটা, সিঁদকাঠি?
চোর। উহুঁ, কবিতার খাতা। শুনুন।—জানতে চাও কি হৃদয়রানী, অদেখা ঐ মূর্তিখানি, রূপে গুণে কলচরেতে কেমন হ’লে ধন্য মানি—
গোবিন্দ। থাক থাক, আমি বুঝে নিয়েছি। সেই মেয়েটার নাম কি?
চোর। ডাকনাম নেড়ী, ভাল নাম জানি না।
গোবিন্দ। আর তোমার নাম?
চোর। কাত্তিক ঘোষ।
গোবিন্দ। বল কি হে? কাত্তিক ঘোষের হৃদয়রানী হবে নেড়ী। নেলী হলেও বা কথা ছিল।
নীচে মোটর থামার অস্ফুট আওয়াজ হইল, তাহার পর ঘরের বাহিরের বারান্দায় খুট খুট পদশব্দ। গোবিন্দবাবু হাঁকিলেন—’কে রে নেড়ী এলি? এত রাত হল যে?’
বীণাবিনিন্দিত কণ্ঠে উত্তর আসিল—’মামা, এখনও জেগে আছ? ওঃ, কি ভোজটাই খাইয়েছে, পঞ্চাশটা কোর্স, একেবারে টপিং!’
একটি সালংকারা অনবদ্যাঙ্গী তরুণী ঘরে প্রবেশ করিয়া একজন অপরিচিত লোক দেখিয়া চিত্রার্পিতাবৎ দাঁড়াইল। চোর হাঁ করিয়া দেখিতে লাগিল।
গোবিন্দবাবু বলিলেন—হাঁ, তার পর কি বলছিলে হে ছোকরা—রূপে গুণে কলচরেতে? রূপ তো দেখতেই পাচ্ছ। গুণ আর কলচর? নেড়ী, বানান কর তো প্রতিদ্বন্দ্বী।’
