নেড়ী বলিল—’পয় রফলা তয় হসসি’ ইত্যাদি। ইত্যবসরে চোর পিছন ফিরিয়া একটা ছোট আরশি পকেট হইতে বাহির করিয়া চট করিয়া মাথার চুল ঠিক করিয়া লইল।
গোবিন্দ। দুই এর স্কোয়ার রুট কত হয় রে?
নেড়ী। 1.41425…
গোবিন্দ। বস বস, ফিফথ প্লেস পর্যন্তই ঢের, কি বল হে ছোকরা। আচ্ছা নেড়ী, তোর মতে আধুনিক লেখকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে?
নেড়ী। যদি ক’তিনতাল অথর বল, তবে আঁরি মব্লাঁর কাছে কেউ দাঁড়াতে পারে না। আধুনিক উপোসী সাহিত্যের ইনিই সবচেয়ে বড় এক্সপনেণ্ট। কেমন একটা করুণ বিশ্বলুট ভাব, যেন একটা দড়িছেঁড়া পিয়াসী বুভুক্ষা—ভারি মিষ্টি লাগে কিন্তু। আর এঁর ঠিক উলটো হচ্ছেন জাপানী রেনেসাঁসের কবি সিমাৎসু ফুজিয়ামা। এঁর লেখায় কেমন একটা ঔদরিক ঔদার্য, যেন একটা পূর্তির পুলক, যেন একটা হৃষ্ট হ্রেষা—ভারি অবাক লাগে কিন্তু।
গোবিন্দ। আচ্ছা শেষের কবিতার শেষ কবিতার মোদ্দা কথাটা কি রে?
নেড়ী। উৎকন্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে,সে—ই ধন্য করিবে আমাকে।
গোবিন্দ। বাঃ। এইবার তুই একটা কিছু বাজা দিকি।
নেড়ী একটা ব্যাঞ্জো লইয়া টুং টাং করিতে লাগিল। চোর গোবিন্দবাবুকে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল—’নাইন্থ সিমফোনি বাজাচ্ছেন বুঝি?’
গোবিন্দ। উহু, ওসব সেকেলে সুর নেড়ীর পছন্দ নয়, বোধ হয় শালা লুট—লিয়া বাজাচ্ছে, নেড়ী, একটা রাশিয়ান ঠুংরি গা তো।
নেড়ী। যাও, এখন আমি পারি না, ঘুম পায় না বুঝি? আচ্ছা মামা, ইনি কে তা তো বললে না।
গোবিন্দ। ইনি একজন চোর। হঠাৎ কোমরে খিল ধরায় বাধা পেয়েচেন।
নেড়ী লাফাইয়া বলিল—’অ্যাঁ—চোর? এতক্ষণ বলতে হয়।’ ঘরের কোণে গিয়া চট করিয়া টেলিফোনটা তুলিয়া নেড়ী বলিল—’পার্ক এট—সেভন—হেলো বালিগঞ্জ থানা—’
গোবিন্দ। খবরদার নেড়ী, টেলিফোন রেখে দে—স্থির হয়ে ব’স।
নেড়ী টেলিফোন রাখিয়া বলিল—’বা রে, চোরকে অমনি ছেড়ে দেবে? তোমার সেই কুকুর—মারা চাবুকটা কোথায়, আমিই না হয় ঘা—কতক লাগিয়ে দিই—’
গোবিন্দ। এ আমার চোর, তুই মারবার কে!
নেড়ী চঞ্চল হইয়া বলিল—’তবে একটা দড়ি,বিছানা—বাঁধা—স্ট্রাপ ,কোথা আছে বল না মামা—বেঁধে ফেলি, নয়তো পালাবে—’
চোর সবিনয়ে বলিল—’আজ্ঞে না না, আমি পালাব না।’
নেড়ী ব্যস্ত হইয়া দড়ি খুঁজিতে লাগিল, কিন্তু পাইল না।
চোর। আমার এই রুমাল দেখুন তো, যদি কাজ চলে।
নেড়ী। নো, থ্যাংক্স।
নেড়ী তাহার শাড়ীর আঁচল দিয়া চোরকে পিঠমোড়া করিয়া বাঁধিল, চোর সুবোধ বালকের ন্যায় স্থির হইয়া রহিল। নেড়ী বলিল—’মামা, বেঁধে ফেলেছি, এইবার থানায় টেলিফোন কর শিগগির।’
গোবিন্দ। আমার এখন ওঠবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু চোরের সঙ্গে তুইও যে বাঁধা পড়লি!
নেড়ী অস্থির হইয়া বলিল—’আমি? কখখনো নয়—উঃ আঁচলটা কি শক্ত ছেঁড়া যায় না—একটা কাঁচি—কাঁচি—’
চোর। দেখুন তো, আমার বুক পকেটে আছে।
নেড়ী চোরের পকেট তল্লাশ করিল, কিন্তু কাঁচি পাইল না।
চোর। আচ্ছা, পাশের পকেট দেখুন তো।
সেখানেও কাঁচি নাই। নেড়ী বলিল—’মিথ্যাবাদী জোচ্চোর।’
চোর বলিল—’আজ্ঞে না না। আচ্ছা আপনি বাঁধন খুলে দিন, আমি কথা দিচ্ছি পালাব না, আপন মাই অনার।’
নেড়ী। আহা কি কথাই বললেন, চোরের আবার অনার।
উপায়ান্তর না দেখিয়া নেড়ী বাঁধন খুলিয়া দিল।
গোবিন্দবাবু বলিলেন—’নেড়ী, যা লক্ষ্মীটি, খানকতক গরম গরম কাটলেট ভেজে আন, আর এক কাপ চা। আর পাশের ঘরে এঁর শোবার ব্যবস্থা ক’রে দে—এত রাত্রে বেচারা যায় কোথা।’
নেড়ী মামার আজ্ঞা পালন করিতে গেল।
গোবিন্দ। কেমন দেখলে কাত্তিক বাবাজী?
কাত্তিক। চমৎকার! আশ্চর্য! এক্সকুইজিট!
গোবিন্দ। মানসী প্রিয়ার সঙ্গে মিলছে?
কাত্তিক। হুবহু। কিন্তু বাবা কি করবেন তাই ভাবছি। এ নেড়ী তো তাঁর মানসী নেড়ী নয়।
গোবিন্দ। কোনও ভয় নেই তোমার, আমার শিক্ষায় মোটেই খুঁত পাবে না। এই নেড়ী যখন শ্বশুরবাড়ি যাবে তখন লাল চেলি প’রে এক হাত ঘোমটা টেনে পঞ্চাশটা গুরুজনকে ঢিপ ঢিপ ক’রে প্রণাম করবে, রান্নাঘরে গিয়ে কোমর বেঁধে দু—শ লোকের শাকের ঘণ্ট রাঁধবে। আবার ওকে যদি সিমলা দিল্লীতে ভাইসরয়ের—ডান্সে নিয়ে যাও তবে লাট—বেলাটের সঙ্গে অক্লেশে বার—কুড়িক নেচে দেবে, জার্মান কনসলের কানে চিমটি কাটবে, সার জম্বুস্বামী আয়ারের টিকি ধরে টানবে।
কাত্তিক। ওঃ।
গোবিন্দ। কিহে, ভয় পেলে নাকি?
কাত্তিক। আজ্ঞে না, আনন্দ আনন্দ!
১৩৩৬—১৩৩৭ (১৯২৯—১৯৩০)
রামধনের বৈরাগ্য
সাহিত্যগগনে উড়ন—তবুড়ির মতন রামধন দাসের উত্থান যেমন আশ্চর্য তাঁর হঠাৎ অন্তর্ধানও সেই রকম। কিন্তু এখন তাঁর নাম কেউ করে না, কারণ বাঙালী পাঠক অতি নিমকহারাম। তারা জয়ঢাক পিটিয়ে যাকে মাথায় তুলে নাচে, চোখের আড়াল হলেই কিছু দিনের মধ্যে তাকে ভুলে যায়। রামধনেরও সেই দশা হয়েছে। এককালে তিনি অদ্বিতীয় কথাসাহিত্যিক বলে গণ্য হতেন, তাঁর খ্যাতির সীমা ছিল না, রোজগারও প্রচুর করতেন। তার পর হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হলেন। তাঁর ভক্তপাঠকরা এবং সপক্ষ বিপক্ষ লেখকরা অনুসন্ধানের ত্রুটি করেন নি, কিন্তু ঠিক খবর কিছুই পাওয়া গেল না। কেউ বলে নোবেল প্রাইজের তদবির করবার জন্য তিনি বিলাতে আছেন, কেউ বলে সাহিত্যিক গুণ্ডারা তাঁকে গুম—খুন করেছে, কেউ বলে সোভিয়েট সরকার তাঁকে মোটা মাইনে দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে গেছে, তিনি কমিউনিস্ট শাস্ত্রের বাংলা অনুবাদ করছেন।
