জিগীষা দেবী কিছুক্ষণ ধ্যানস্ত হইয়া রহিলেন, তাহার পর শিষ দিয়া ডাকিলেন—’সুষ সুষ—’
একটি ছোট্ট প্রাণী গুটগুট করিয়া ঘরে আসিল। কুত্তা নয়। ইনি সুষেণবাবু, জিগীষা দেবীর স্বামী। রোগা, বেঁটে, চোখে চশমা, মাথায় টাক, কিন্তু গোঁফ জোড়াটি বেশ বড় এবং মোম দিয়া পাকানো। সতী সাধ্বী যেমন সর্বহারা হইয়াও এয়োতের লক্ষণ শাঁখা—জোড়াটি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করে, বেচারা সুষেণবাবুও তেমনি সমস্ত কর্তৃত্ব খোয়াইয়া পুরুষত্বের চিহ্ন স্বরূপ এই গোঁফ জোড়াটি সযত্নে বজায় রাখিয়াছেন। ঘরে আসিয়া ঘাড় নীচু করিয়া সবিনয়ে বলিলেন—’ডেকেছ?’
জিগীষা দেবী ছেলেদের দেখাইয়া বলিলেন—’এঁরা বাণী নিতে এসেছেন।’
সুষেণবাবু চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন—’বাণী? এই যে সেদিন ননিসেকরা বিয়াল্লিশ টাকা নিয়ে গেল?’
জিগীষা দেবী ভ্রূকুটি করিয়া বলিলেন—’ঈডিয়ট! সেকরার বাণী নয়, আমার মুখের বাণী। যাও, সবুজ ফাউণ্টেন পেনটা আর এক শীট কাগজ নিয়ে এস।’
সুষেণবাবু কাগজ কলম আনিলেন। জিগীষা দেবী খচখচ করিয়া কয়েকটা লাইন লিখিয়া বলিলেন—’শুনুন।—ওগো ছেলেরা, আমি বুঝেছি তোমাদের ব্যথা, কিন্তু জগৎ পারবে না তা বুঝতে, কারণ স্থবিরের প্রাচীন—প্রস্তর—যুগ শেষ হয় নি এখনও। প্রবীণের রক্ত আর তরুণের খুন, ধনীর রুধির আর শ্রমীর লেহু, রেড়ীর তেল আর ঝরনার জল কখনই মিশ খায় না। অতএব তোমাদের হ’তে হবে স্বাবলম্বী স্বপ্রতিষ্ঠ। বানাও আশ্রম, গ্রামে গ্রামে, দেশে দেশে, নগরে নগরে। বানাও তারুণ্যের তপোবন, নবীনতার নীড়, যৌবনের দুর্গ। তোল চাঁদা—লাখ, দশ লাখ, কোটি। আপাতত এনে দাও আমাকে হাজার দশেক, তাতেই কাজ আরম্ভ হ’তে পারবে।’
চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—’বাঃ অতি চমৎকার, খাসা। বাঁটলো কাগজখানা যত্ন ক’রে রেখে দিস। তবে আজকের মতন আসি মা—লক্ষ্মী।’
বাঁটলো। অসময়ে অনেক উৎপাত করলুম, মাফ করবেন।
জিগীষা। না না, উৎপাত কিসের। আচ্ছা, আমি এখন মিটিংএ যাচ্ছি, নমস্কার।
জিগীষা দেবী প্রস্থান করিলেন। চাটুজ্যে মহাশয়রাও উঠিলেন, কিন্তু সুষেণবাবু বলিলেন— ‘আপনাদের কি বডড তাড়া? বসুন না একটু।’
চাটুজ্যে। আপনিও একটা বাণী দেবেন নাকি?
সুষেণবাবু একবার দরজার বাহিরে উঁকি মারিয়া বলিলেন—’বাণী—ফানি আমি বুঝি না মশায়, ও হচ্ছে মেয়েলী ব্যাপার। আমি বুঝি শুধু কাজ। বলছিলুম কি—আপনারা কানাই ঘোষালকে চেনেন? চ্যাম্পিয়ান ওআন—লেগার, সেনেট হাউসের চাতালে নাগাড় পঁচাত্তর ঘণ্টা এক পায়ে দাঁড়িয়েছিল? আমার খুড়তুতো ভাই হয়!’
চাটুজ্যে। বটে?
সুষেণ। হাঁ। বলাই বাঁড়ুজ্যের নাম শুনেছেন? যে ছোকরা সেদিন গড়ের মাঠে তিনটে গোরাকে ছাতা—পেটা করেছিল? আমার আপন মাসতুতো ভাই!
চাটুজ্যে। বলেন কি মশায়! আপনারা দেখছি বীরের বংশ, বড় সুখী হলুম আলাপ ক’রে। আর কিছু বলবার নেই তো? আচ্ছা, বসুন তা হ’লে নমস্কার।
সুষেণবাবু সহসা মুখখানি করুণ করিয়া বলিলেন—’পাঁচটা টাকা হবে কি? মাসকাবার হ’লেই শোধ করে দেব।’
বাঁটলো একটা আধুলি ফেলিয়া দিল। ছেলেদের দল ও চাটুজ্যে মহাশয় বাহিরে আসিলেন।
রাস্তায় আসিয়া চাটুজ্যে মহাশয় বলিলেন—’আর ভাবনা কি, কেল্লা মার দিয়া। এখন চটপট আশ্রমের টাকাটা যোগাড় করে জিগীষা দেবীর হাতে দাও। আচ্ছা, আমি এখন চললুম। কাত্তিক, তুমি তা হ’লে আজ রাত্রে বাঁটলোদের বাড়ি থাকছ? বেশ, কাল সকালে আবার দেখা হবে।’
চাটুজ্যে মহাশয় চলিয়া গেলে ঘনেন বলিল—’তাই তো, দ—শ হা—জার টাকা! কিন্তু এর কমে আশ্রম হবেই বা কি করে। অন্তত পঞ্চাশ জনের থাকবার জায়গা চাই, শোবার ঘর ডাইনিং রুম ড্রয়িং রুম লাইব্রেরী টেনিস কোর্ট সমস্তই চাই, জিগীষা দেবী খুব কম ক’রেই এস্টিমেট করেছেন। কিন্তু টাকা পাওয়া যায় কোথায়? বাঁটলো কি বলিস?’
বাঁটলো। আমি বলি কি—কাত্তিক আজ রাত্রে খুব ঠেসে খেয়ে নিয়ে কাল থেকে উপবাস আরম্ভ করুক, আর আমরা চারিদিকে সভা ক’রে বক্তৃতা দিই—হে দেশবাসী, এই যে একটি তরুণ আশ্রম বানাবার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে বসেছে আর তোমরা হেসে খেলে বেড়াচ্ছ, এটা কি ঠিক হচ্ছে? দাও দশ হাজার টাকা তুলে, তাহ’লেই বেচারা চাট্টি ভাত খাবে।
ঘনেন। উপোস ক’রে কাজ উদ্ধার করা হচ্ছে মেয়েলি ট্যাকটিক্স, আমার তাতে সিমপ্যাথি নেই।
বাঁটলো। পুরুষোচিত পন্থা আছে, কিন্তু তাতে কিছু সময় লাগবে। কাত্তিক আমেরিকায় যাক, ঝাঁকড়া চুল রাখুক, স্বামিজী হয়ে জেঁকে বসুক। বিস্তর মেম ওর চেলা হবে, টাকাও আসবে ঢের। সেখানেই আশ্রম খোলা যাবে। আমরাও গিয়ে জুটব।
কার্তিকের এসব যুক্তি পছন্দ হইল না। বলিল—’বাঁটলো, পিস্তলের দাম কত রে?’—
বাঁটলো ফেরিওয়ালার সুরে বলিল—’জাপানবালা দো আনা,জার্মানবালা দো আনা,সস্তাবালা দো আনা। পিস্তল কি হবে রে গাধা?’
কাত্তিক উত্তেজিত হইয়া বলিল—’ডাকাতি করব, খুন করব, জেলে যাব, ফাঁসি যাব, আত্মীয়—স্বজনের নাম ডোবাব, জগৎ আমার শত্রু, কোথাও আমার স্থান নেই।’
বাঁটলো। আপাতত আমাদের বাড়িতে স্থান আছে। রাত্রিটা তো কাটিয়ে দে তার পর সকালবেলা মাথা ঠাণ্ডা হলে যা হয় করিস।
গোপাল ও ঘনেন নিজের নিজের বাড়ি গেল। কাত্তিক নীরবে বাঁটলোর সঙ্গে চলিল। বাড়ি আসিয়া বাঁটলো কাত্তিককে বাহিরের ঘরে বসাইয়া তাহার শুইবার ব্যবস্থা করিতে উপরে গেল। কিন্তু ফিরিয়া আসিয়া দেখিল কাত্তিক পালাইয়াছে।
