কার্তিক করুণ স্বরে বলিল—’বাঁটলো, হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিডের দাম কত রে?’
বাঁটলো। বিস্তর দাম, তার চেয়ে কেরোসিন তেল ঢের সস্তা, দশ পয়সাতেই কাজ সাবাড়।
কার্তিক। কিন্তু বডড জ্বালা করবে যে?
বাঁটলো। সে কতক্ষণ? একবার মরতে পারলে মোটেই টের পাবি না।
চাটুজ্যে মহাশয় কার্তিকের গায়ে হাত বুলাইয়া বলিলেন—’ছিঃ বাবা কার্তিক, দুঃখু করো না! একে বাপ, তায় বয়সে বড় বললেই বা একটু কড়া কথা। বাপের সুপুত্তুর হলে সব দেবতা খুশী হন। এই দেখ রামচন্দ্র পিতৃআজ্ঞায় বনে গিয়েছিলেন।’
ঘনেন। জব্দও হয়েছিলেন তেমনি। মাথায় জটা, গায়ে জামা নেই, পায়ে জুতো নেই, চোদ্দ বছর ভ্যাগাবণ্ড, বউ গেল চুরি। চল রে কাত্তিক আমরা একবার জিগীষা দেবীর বাড়ি গিয়ে তাঁর বাণী নিয়ে আসি।
চাটুজ্যে। এত রাত্রে কেন আর তাঁকে বিরক্ত করা, তার চেয়ে এখন নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে ঘুমুও গে। বাণী নিতে হয় কাল নিও।
ঘনেন। কোথায় রাত, এই তো সবে সাড়ে আটটা। আর করলা বাগান ফার্স্ট লেন তো পাশেই।
চাটুজ্যে। আচ্ছা চল বাবা। বড়োদের রাজত্ব শেষ হয়েছে, এখন ছোকরাদের পিছু পিছু দৌড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঘনেন। আপনি আবার কি করতে যাবেন?
বাঁটলো। চলুন না উনিও, একজন মুরুব্বি লোক ডেপুটেশনে থাকা ভাল।
জিগীষা দেবীর বসিবার ঘরটি ছোট। মাঝে একটি টেবিল, তাহার পাশে গোটা কয়েক চেয়ার এবং একটা বেঞ্চ। ছেলেরা এবং চাটুজ্যে মহাশয় ঘরে প্রবেশ করিলে নাকে ঝুমকো পরা একজন নেপালী দাসী তাঁহাদের সম্মুখে দাঁড়াইল।
বাঁটলো বলিল—চাটুজ্যে মশায়, আপনি হচ্ছেন আমাদের দলের সর্দার, দিন আপনার কার্ড পাঠিয়ে।
চাটুজ্যে। কার্ড—ফার্ড আমার কোনও কালে নেই। ওগো ঝি, মাইজীকে গিয়ে খবর দাও কেদার চাটুজ্যে আর চার জন ছোকরা মোলাকাত করনে মাংতা!
ঘনেন। ছোকরা নয়, বলুন তরুণ।
চাটুজ্যে। হাঁ হাঁ, বোলো চারঠো তরুণ আর একঠো বুডঢা মাইজীর সাথ দেখা করেগা।
দাসী চোখ কুঁচকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—’মেম—সাবকা সাথ?’
চাটুজ্যে। হাঁরে বাপু, জিঘাংসা দেবী।
ঘনেন ধমকাইয়া বলিল—’জিগীষা দেবী। চাটুজ্যে মশায়, আপনার ভীমরতি ধরেছে, ভদ্রমহিলার সামনে অসভ্যতা করবেন দেখছি।’
চাটুজ্যে। দেখ ঘনা, তুই আমার কাছে সভ্যতার বড়াই করিস নি। কটা মহিলা দেখেছিস তুই? জানিস, আমার তিন খুড়শাশুড়ী, চার শালাজ, সাত শালী আর গিন্নী তো আছেনই, এই চল্লিশ বৎসর তাঁদের সঙ্গে কারবার ক’রে আসছি!
দাসী খবর দিতে গেলে। বাঁটলো বলিল—’চাটুজ্যে মশায়, আপনি আমাদের ডেপুটেশনের মুখপাত্র, আমাদের বক্তব্যটা আপনিই বেশ গুছিয়ে বলবেন। ঘাবড়ে যাবেন না তো?’
চাটুজ্যে। ঘাবড়াবার ছেলে কেদার চাটুজ্যে নয়।
জিগীষা দেবী ঘরে প্রবেশ করিলেন। রাশভারি মহিলা, দশাসই চেহারা, পাউডারের প্রলেপ ভেদ করিয়া সুগোল মুখের নিবিড় শ্যামকান্তি উঁকি মারিতেছে। কালিদাস যদি দেখিতেন তো লিখিতেন—’খড়িপড়া ছাঁচি কুমড়া ইব।’
জিগীষা দেবী বলিলেন—’আমাকে এখনি একটা কমিটি—মিটিংএ যেতে হবে, আপনারা একটু তাড়াতাড়ি বক্তব্য শেষ করলে বাধিত হব।’
বাঁটলো। বলুন চাটুয্যে মশায়।
চাটুজ্যে মহাশয় গলা সাফ করিয়া আরম্ভ করিলেন—’মা—লক্ষ্মী, এই যে দেখছেন চারজন ছোকরা, এরা হচ্ছে চারটি তরুণ। এটির নাম কাত্তিক, হীরের টুকরো ছেলে। এর বাপ চরণ ঘোষের হচ্ছে পিত্তির ধাত, তাই মেজাজটা একটু তিরিক্ষি। দু—সন্ধ্যে ত্রিফলার জল খায়, কিন্তু কিছুই হয় না। চরণ ঘোষ কাত্তিককে বলেছে ছুঁচো, তাতে এঁরা—
ঘনেন তাহার নোটবুকস দেখিয়া বলিল—’তিন বার ছুঁচো বলেছে!’
চাটুজ্যে। ঠিক, তিনবারই ছুঁচো বলেছে বটে। তাতে এ বাবাজীরা সকলেই বড় মর্মাহত হয়েছেন। আমরা ছেলেবেলায় বাপ—জ্যাঠার গালাগাল বিস্তর খেয়েছি, সোনাপারা মুখ ক’রে সমস্ত সয়েছি। কিন্তু সে দিন আর নেই মশায়। তখন এই কলকাতায় ঘোড়ার ট্রাম চ’লত, ছেলেরা গোঁফ রাখত, কোটের ওপর উড়ুনি ওড়াত, মেয়েরা নোলক পরত আর নাইবার ঘরে লুকিয়ে গান গাইত, গবরমেণ্টকে লোকে তখন বলত সদাশয় সরকার বাহাদুর। যাক সে কথা। এখন আমি বলি কি— বাপ যদি ছেলেকে ছুঁচো বলেই থাকে তাতে ক্ষতিটা কি। ছুঁচো ভগবানের সৃষ্ট জীব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তার একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে। ছুঁচো তুচ্ছ প্রাণী নয়, ইঁদুরের চাইতে তার স্বভাব ভাল, মুখশ্রী ভাল, বুদ্ধিও বেশী। ইঁদুরের সম্বন্ধে কবি বলেছেন—কাঠ কাটে বস্ত্র কাটে কাটে সমুদায়, কিন্তু ছুঁচোর বদনাম কেউ দিতে পারবে না। কি বলেন মা—লক্ষ্মী?
জিগীষা দেবী ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন—’তরুণদের দলে আপনি কেন?’
চাটুজ্যে মহাশয় একটু চিন্তা করিয়া উত্তর দিলেন—’সে একটা সমস্যা বটে, কিন্তু কথা হচ্ছে কি জানেন, আমি একজন প্রবীণ তরুণ।’
বাঁটলো। ওঁর বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু মনটি একদম কাঁচা।
জিগীষা দেবী কিন্তু খুশী হইলেন না। চাটুজ্যে মহাশয় বিষয়টি পরিষ্কার করিবার জন্য বলিলেন—’কি রকম জানেন? এই গুজরাটী ডাব আর কি, ওপরটা ঝুনো, ভেতরটা নেয়াপাতি।’
ঘনেন ততক্ষণ চটিয়া আগুন হইয়াছে। ধমকাইয়া বলিল—’চুপ করুন চাটুজ্যে মশায়, কেবল আবোল তাবোল বকছেন। আমাকে বলতে দিন।—দেখুন, আমরা বড়ই অপমানিত নির্যাতিত হয়েছি, একেবারে পবলিক হোটেলে দু—শ লোকের সামনে। কেন? যেহেতু আমরা পরাধীন, অভিভাবকের অন্নদাস। এই অবস্থা আর সহ্য হয় না, নিজেদের একটা স্বাধীন আশ্রম বানাতে চাই। পিঁজরে ভাঙা চন্দনা চায় পাখনা মেলে বাঁচতে রে, অরুণ—রাঙা মুক্তাকাশের তক্তাপোশে নাচতে রে। আপনি যদি একটু চেষ্টা করেন তবে অনায়াসে একটা আশ্রম গড়ে উঠবে। এখন এ সম্বন্ধে একটি বাণী আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করি।’
