ঘরের এক কোনে একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসিয়াছিলেন। ইনি একজন নীরব কর্মী, দুই প্লেট কোর্মা চুপচাপ শেষ করিয়া এখন রাই—সরিষা ও নেবুর রস দিয়া টোমাটো খাইতেছিলেন। বাঁটলোর কথায় চমকাইয়া উঠিয়া বলিলেন—’কী ভয়ানক, সেইজন্যই তো আমি ওসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি, কেবল জোচ্চুরি, ভাইটামিনের নামগন্ধ নেই।’
হোটেলের ভোক্তার দল আতঙ্কে চঞ্চল হইয়া উঠিল। অনেকে খাওয়া ফেলিয়া উঠিয়া পড়িল। কেহ বলিল—’অ্যাঁ, কুকুরের ঠ্যাং। কেহ বলিল—’সর্বনাশ, ভাইটামিন নেই।’ ম্যানেজার ব্যস্ত হইয়া করজোড়ে বলিতে লাগিলেন—’বসুন মোসাই বসুন, ওসব মিথ্যে কথায় কান দেবেন না—আমার কি ধর্মভয় নেই!’
চাটুজ্যে মহাশয় উঠিয়া চারিদিকে চাহিয়া বলিলেন—’মহাশয়রা যদি অনুমতি দেন তো আমি ভাইটামিন সম্বন্ধে দু—চারটে কথা নিবেদন করি।’
কয়েকজন প্রবীণ ভদ্রলোক চোপ চোপ করিয়া ধমক দিয়া গণ্ডগোল থামাইয়া দিলেন। তাহার পর চাটুজ্যে মহাশয়ের দিকে চাহিয়া বলিলেন—’হাঁ, তার পর মশাই, ভাইটামিনের কথা কি বলছিলেন?’
চাটুজ্যে বলিতে লাগিলেন—’বাল্যে দুগ্ধ, যৌবনে লুচি—পাঁঠা, বার্ধক্যে একটু নিমঝোল আর প্রচুর হরিনাম—এই হল আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রসম্মত পথ্য। কিন্তু অ্যাদ্দিনে আমরা জানতে পেরেছি যে ওসব কেবল উদর পুরণের উপাদান মাত্র, ভাইটামিনই হচ্ছে আসল জিনিস, ভবনদীতে ভাসবার একমাত্র ভেলা, শিশু যুবা বৃদ্ধ সকলের পক্ষেই। অতএব ভাইটামিন যদি চান তো কাঁটাল খান।’
টোমাটো—ভোজী বাবুটি বলিলেন—’কাঁটাল?’
চাটুজ্যে। আজ্ঞে হাঁ, কাঁটাল। কবি লিখেছেন—আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি, মরি হায় হায় রে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো মশায়। এই ধরুন, হিমালয় পর্বত, যার জোড়া দুনিয়ায় নেই। তারপর ধরুন রয়াল বেঙ্গল টাইগার—কে লড়বে তার সঙ্গে—সিংহ? সাধ্য কি। তারপর ধরুন কাঁটাল।
টোমাটো—ভোজী। কাঁটাল কি একটা ফল হ’ল মশাই?
চাটুজ্যে। আজ্ঞে হাঁ, বটানি প’ড়ে দেখবেন। ফলের রাজা হচ্ছে কাঁটাল, দু—মণ পর্যন্ত ওজন হয়, আবার কাঁটালের রাজা ওতরপাড়ার বঞ্জুলবাবুদের গাছের রসখাজা। এক—একটি কোয়া এক—এক পো, কাঁচা সোনার বর্ণ, ভাইটামিনে টইটম্বুর। গালে দিয়ে বার পাঁচেক এদিক ওদিক চালিয়ে রস অনুভব করুন, তার পর চক্ষু বুজে একটু চাপ দিন, অবলীলাক্রমে গন্তব্য স্থানে পৌঁছে যাবে। কোথায় লাগে আপনাদের কালিয়া কোপ্তা কোর্মা।
টোমাটো—ভোজী। কোন ক্লাসের ভাইটামিন মশায়, এ বি সি না ডি?
চাটুজ্যে। এ—বি—সি—ডি, বি—এল—এ—ব্লে, এ স্লাই ফক্স মেট এ হেন—যা বলেন, ডাক্তারী শাস্ত্রে কোনও বারণ নেই। হেন বস্তু নেই যা কাঁটালে পাবেন না। গুঁড়ি চিরুন তক্তা হবে, হোগনি কাঠ তার কাছে তুচ্ছ। পাতা পাকিয়ে নিন, হুঁকোয় পরাবার উত্তম নল হবে। আর ফলের তো কথাই নেই। কোলে তুলে নিয়ে বাজান, পাখওয়াজের কাজ করবে। কাঁচার কালিয়া খান, যেন পাঁটা। বিচি পুড়িয়ে খান, যেন কাবুলী মেওয়া। পাকা কোয়ার রস গ্রহণ করে ছিবড়েটা চরকায় চড়িয়ে সুতো কাটুন, বেরোবে সিল্ক।
টোমাটো—ভোজী মুখ বাঁকাইয়া বলিলেন—’ননসেন্স।’
চাটুজ্যে। বিশ্বাস হ’ল না বুঝি? তবে মরুন ঐ কাঁচা টোমাটো খেয়ে। আমরা চললুম, নমস্কার। ওঠ হে চরণ।
ম্যানেজার। ও মোসাই, দুটো ঘোলের দাম দিলেন না?
চাটুজ্যে। আরে মোলো, আবার দাম চায়! এত বড় একটা কুরুক্ষেত্র থামিয়ে দিলুম সেটা বুঝি কিছু নয়? আচ্ছা বাবা, নাও এই সিকি।
চাটুজ্যে মহাশয় চরণ ঘোষকে একটু আড়ালে টানিয়া আনিয়া বলিলেন—’ছেলেকে ধমক তো ঢের দিয়েছ, এইবার মিষ্টি কথায় শান্ত করে ডেকে নিয়ে যাও। বাবা কাত্তিক, এস তো এদিকে একবার।’
চরণ ঘোষ বলিলেন—’শোন কার্তিক, এই অঘ্রান মাসে তোর বিয়ে দেব। সেই রাখাল সিংগির মেয়ে নেড়ী, ছোটবেলায় তাকে দেখেছিলি, মনে আছে তো?’
কার্তিক মুখ ভার করিয়া বলিল—’নেড়ী—টেড়ীকে আমি বিয়ে ক’রব না।’
চরণ ঘোষ আবার খেপিয়া উঠিয়া বলিলেন—’করবি না কি রকম? তোর ঘাড় ধ’রে বিয়ে দেব, অবাধ্য ইস্টুপিড!’
চাটুজ্যে। আ হা হা, কর কি চরণ, তোমার কিছু আক্কেল নেই? এই কি বিয়ের কথা বলবার সময়, না জায়গা? যাও, তুমি আর মিছে দেরি ক’রো না, ন—টার ট্রেন এখনও পাবে। কাত্তিক আজ বাঁটলোদের বাড়িতেই থাকবে। বাবা কাত্তিক, তোমার সঙ্গে দুটো কথা আছে।’
চরণ ঘোষ গজগজ করিতে করিতে প্রস্থান করিলেন। কার্তিক ও তাহার তিন বন্ধুর সঙ্গে চাটুজ্যে মহাশয় রাস্তায় আসিলেন।
ঘনেন বলিল—’এ অপমান কখনই সহ্য করা যায় না, আমরা বানের জলে ভেসে এসেছি নাকি? কাত্তিক, তোর বাপকে এক্ষুনি উকিলের চিঠি দে, পাঁচ—শ টাকার ড্যামেজ। মকদ্দমায় আমরা সাক্ষী হব।’
গোপাল। বাপের নামে নালিশ দেখায় খারাপ, হাজার হ’ক বাপ তো বটে। বরং খবরের কাগজে ছাপিয়ে দে, সমস্ত ছেলের দল খেপে উঠবে, বাছাধন টের পাবেন।
ঘনেন। উহুঁ, তার চেয়ে জিগীষা দেবীর কাছে চল, তাঁকে ব’লে কয়ে আমরা একটা আশ্রম খুলব। কাগজে ছাপাব—এস কে কোথায় আছ বাংলার ছেলেরা, নির্যাতিত উৎপীড়িত অসহায় বুভুক্ষু—
বাঁটলো। ঐ সঙ্গে একটা মেয়েদের বিভাগও খোলা উচিত, কি বলিস কাত্তিক?
