ম্যানেজার বলিল—’আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, দু—নম্বরে বসুন দয়া করে।’
চাটুজ্যে ঠোঁটে আঙুল দিয়া বলিলেন—’চুপ, আস্তে আস্তে।’
ম্যানেজার সহাস্যে বলিল—’লজ্জা কি মোসাই, এখানে কত বুড়ো থুত্থুড়ে জজ মেজিস্টর মহামহোপাধ্যায় পায়ের ধুলো দেন। আপনারা বরঞ্চ পর্দাটা টেনে নিয়ে বসুন। কি খাবেন মোসাই?’
চাটুজ্যে। অ, এখানে বুঝি অমনি বসা যায় না?
ম্যানেজার। হেঁ হেঁ। খান—দুই কাটলেট দেব কি? অ্যাংলো—মোগলাই—এর নবতম অবদান—মুরগির ফ্রেঞ্চ মালপো, কচি ভাইটোপাঁটার ইস্টু—দেখুন না একটু ট্রাই করে।
চাটুজ্যে। না বাপু, অবদান খাবার আর বয়স নেই।
ম্যানেজার চরণ ঘোষের টিকি আর কণ্ঠি লক্ষ্য করিয়া বলিল—’ঠাকুরমোসাই আপনাকে খান—দুই ডবল ডিমের রাধাবল্লভি দেবে কি?’
চরণ। দেবে আমার মাথা। ডাক ঐ রাক্ষসটাকে।
ম্যানেজার। রাক্ষস—টাক্ষস এখানে পাবেন না মোসাই, সব জেন্টেলম্যান।
চাটুজ্যে। আরে কর কি চরণ, চুপ চুপ। নিজের ছেলেবেলার কীর্তিকলাপ সব ভুলে গেলে? সেই যে কাবাবের ঠোঙা নিয়ে গাব গাছে চড়ে খেতে আর কোকিল ডাকতে তা কি মনে নেই? এখন না—হয় গোঁসাই মহারাজের কাছে মন্তর নিয়ে কণ্ঠি ধারণ করেছ, মাংসের গন্ধে কানে আঙ্গুল দাও। ছেলের খাওয়া শেষ হক, তারপর একটু—আধটু ধমক দিও। আপাতত এদিকে চুপটি ক’রে বস, একটু শরবৎ খেয়ে ঠাণ্ডা হও, আর শ্রীমানরা কি আলোচনা করছেন তাই আড়ি পেতে শোন, বিস্তর জ্ঞান লাভ করবে। যদি কিছু অশ্রাব্য অলৌকিক কথা কর্ণ গোচর হয় তখন না—হয় গলা খাঁকার দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা যাবে। ওহে ম্যানেজার, দুটো ঘোল দাও তো।
কাত্তিক এবং তাহার তিন বন্ধু বাঁটলো, গোপাল ও ঘনেন কিছু দূরে একটা পর্দার আড়ালে বসিয়া আছে। তাহাদের খাওয়া শেষ হইয়াছে, এখন তর্ক চলিতেছে।
গোপাল। আইডিয়াল একটা চাই বইকি, নয়তো লাইফটা কমনপ্লেস মনোটোনাস হয়ে পড়ে। আইডিয়াল হচ্ছে মাইণ্ডের জুস, তাতেই জীবন সরস থাকে।
ঘনেন। মানলুম না। আইডিয়াল মানুষকে করে স্লেভ টু অ্যান আইডিয়া। আমি চাই ভ্যারাইটি, নো কমিটমেণ্ট। লোথারিওর সেই লাইনটা কি রে?—টু পিক অ্যাণ্ড চূজ, প্লে ফাস্ট অ্যান্ড লুজ—তারপর কি যেন। বাঁটলো, তোর আইডিয়াল আছে নাকি?
বাঁটলো। রামো কস্মিনকালে নেই।
চরণ ঘোষ চুপি চুপি বলিলেন—’এ সব কি বলছে হে চাটুজ্যে? কিছু বুঝতে পারছি না।’
চাটুজ্যে। চুপ চুপ।
কার্তিক টেবিল চাপড়াইয়া বলিল—’আইডিয়াল টাইডিয়াল বুঝি না। আমি চাই বাস্তবের একটা সিনথেসিস—এমন নারী, যে বল্লরী বাঁড়ুজ্যের মতন রূপসী, মিসেস চৌবের মতন সাহসী, জিগীষা দেবীর মতন লেখিকা, মেজদির ননদের মতন রসিকা, লোটি রায়ের মতন গাইয়ে, ফাখতা খাঁ—এর মতন নাচিয়ে।’
চাটুজ্যে বলিলেন—’ব্বাস রে! এমন তিলোত্তমা আমাদের চোদ্দ পুরুষ কখনও দেখে নি। চরণ, আর কথাটি নয়, বাবাজীকে এই অঘ্রান মাসেই ঝুলিয়ে দাও, নইলে বেচারা বাড়ি—বাড়ি হ্যাংলা দিষ্টি দিয়ে বেড়াবে।’
চরণ ঘোষ লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন—’দাঁড়াও, হ্যাংলাপনা ঘুচচ্ছি। এই কাত্তিকে, হতভাগা ইস্টুপিড ছুঁচো, কি কচ্ছিস এখানে? ছেলে আমার লেখাপড়া শিখছেন! অধঃপাতে যাচ্ছেন! যত সব বকাটে ছোঁড়াদের সঙ্গে—’
ঘনেন। খবরদার মশায় মুখ সামলে কথা কইবেন।
চরণ। ছুঁচোটাকে পই পই ক’রে বললুম—যাবি আর আসবি। সন্ধে হয়ে গেল, ছেলের দেখা নেই। রাত্তির কাবার হল, ছেলে আর আসে না। ছেলেধরার খপপরেই পড়ল, না মোটর চাপা প’ড়ল, না পুলিসে ধরে নিয়ে গেল—কিছুই জানি না। বাড়ির সবাই ভেবে অস্থির, গর্ভধারিণী কেঁদেকেটে শয্যাশায়ী, আর ছেলে আমার হোটেলে ব’সে ইয়ারকি দিচ্ছেন! হতভাগা ছুঁচো ইস্টুপিড। এই তোদের ইউনিভার্সিটির শিক্ষে? কি হয় সেখানে? যত সব জোচ্চোর মিলে ছেলেদের মাথা খায়। আর অধঃপাতের আডডা হয়েছে এই হোটেল, যত বেহায়া ছেলে বুড়ো জুটে গোগ্রাসে গোস্ত গিলছে। এই বাঁটলোটা হচ্ছে দলের সদ্দার বিশ্ববকাট, ওই গোপলাটা হচ্ছে জ্যাঠার চূড়ামণি, আর এই ঘনাটা একটা আস্ত বাঁদর।
কার্তিক ঘাড় হেঁট করিয়া গালাগালি হজম করিতে লাগিল, কিন্তু বন্ধুরা রুখিয়া উঠল। হোটেলের ম্যানেজার আস্তিন গুটাইতে লাগিল।
বাঁটলো ছেলেটি অতি মিষ্টভাষী ও বিনয়ী। সে খুব মোলায়েম করিয়া বলিল—’দেখুন চরণবাবু, নিজের ছেলেকে আপনি যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু আমরা কি করি না করি আপনার পিতার তাতে কি?’
ম্যানেজার বলিল—’জানেন, আপনাকে পুলিসে দিতে পারি?’
চরণ ঘোষ ভেংচাইয়া বলিলেন—’দাও না।’
ম্যানেজার। জানেন, এটা হচ্ছে অ্যাংলো—মোগলাই কেফ?
বাঁটলো ভুল উচ্চারণ বরদাস্ত করিতে পারে না। বলিল—’কেফ নয়, কাফে।’
ম্যানেজার। ওই হ’ল। জানেন, এটা হেজিপেজি জায়গা নয়, এটা একটা রেসপেকটেবেল রেস্টাউরেণ্ট?
বাঁটলো। রেস্তোরাঁ।
ম্যানেজার। এক—ই কথা। জানেন, এটা হচ্ছে শিক্ষিত লোকের রেন্ডেজভোঁশ।
বাঁটলো। রাঁদেভু।
বার বার বাধা পাইয়া ম্যানেজার চটিয়া উঠিল। বলিল—’আরে থাম ডেঁপো ছোকরা। ডেভিল মামলেট কোপ্তা কোর্মা দেরাই বেচে বুড়িয়ে গেলুম, আর ইনি এলেন উরুশ্চারণ শেখাতে।’
বাঁটলো গর্জন করিয়া বলিল—’খদ্দেরকে অপমান? টেক কেয়ার, তোমার হোটেল বয়কট করব, কেবল কুকুরের ঠ্যাং আর সাপের চর্বি চালাচ্ছ।’
