চাটুজ্যে। আমাকে তার করলে কে? দেখ তো পড়ে কি ব্যাপার?
বংশলোচন। কার্তিক মিসিং—
উদয়। অ্যাঁ, বলেন কি?
বংশলোচন। চরণ ঘোষ টেলিগ্রাম করেছেন মজিলপুর থেকে—কাত্তিককে পাওয়া যাচ্ছে না, পুলিসে খবর দিতে বলছেন। পাঁচটার ট্রেনে চরণবাবু নিজেও আসছেন। ছ—টা তো বেজে গেছে, তা হলে এসে পড়লেন বলে। ওঁর কাছে সব শুনে পুলিসে খবর দেওয়া যাবে। কাত্তিকটি কে?
চাটুজ্যে। চরণের বড় ছেলে, এখানে হোস্টেলে থেকে পড়ে, প্রতি শনিবারে দেশে যায়। এখন তো কলেজ বন্ধ, মজিলপুরেই তার থাকবার কথা।
নগেন। কাত্তিককে চুরি করবে এমন ছেলেধরা জন্মায় নি। ও সব বাজে খবর।
চাটুজ্যে। চিনিস নাকি কাত্তিককে?
নগেন। বিলক্ষণ চিনি, আমার সেজো শালা বাঁটলোর সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। বিখ্যাত ছোকরা, শিশুকাল থেকেই বেশ চৌকস। যখন দশ বৎসর বয়েস তখন সে তার বান্ধবীদের বলত—মেয়েগুনো আবার মানুষ! মাথায় একগাদা চুল, আবার ফিতে বাঁধা, আবার শুধু শুধু দাঁত বার করে হাসে! মারতে হয় এক ঘুঁষি! তার পর চোদ্দ বছর বয়সে তার প্রাণের বন্ধু বাঁটলোকে লিখলে—নারীর প্রেম? কখনই নয়। ভাই বাঁটুল, এ জগতে কারও থাকবার দরকার নেই, শুধু তুমি আর আমি। কিন্তু দু—বছর যেতে না যেতে তার যৌবননিকুঞ্জের পাখি কা কা করে উঠল। কাত্তিক তার কবিতার খাতায় লিখলে—নারী, বুঝিতে না পারি কবে, একান্ত আমারি তুমি হবে, কত দিনে ওগো কত দিনে, পারছি নে আর পারছি নে।
বংশলোচন। এ সব তো ভাল কথা নয়। চাটুজ্যেমশায়, চরণবাবু ছেলের বিয়ে দেন না কেন?
চাটুজ্যে। বলেছি তো অনেকবার, কিন্তু চরণ বড় একগুঁয়ে। অন্য বিষয়ে সেকেলে হ’লেও ছেলের বিয়ে দেবার বেলায় সে একেলে। বলে, লেখাপড়া সাঙ্গ করুক, তারপর বিয়ে। তবে কাত্তিকের জন্যে কনে ঠিক করাই আছে, চরণের বাল্যবন্ধু রাখাল সিংগির মেয়ে। তের—চোদ্দ বছর আগে দুই বন্ধুতে কথা স্থির হয়। তারপর রাখালবাবু মারা গেলেন, কিছুকাল পরে তাঁর স্ত্রীও গত হলেন, মেয়েটার ভার নিলেন তার মামা। মামা শুনেছি কোথাকার জজ, সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন।
নগেন। রাখাল সিংগির মেয়ে তো? কাত্তিক কখখনো তাকে বিয়ে করবে না, সে মেয়ে নাকি জংলী ভূত।
এমন সময় চরণ ঘোষ আসিয়া পৌঁছিলেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক, মাথায় একটি ছোট টিকি, কাঁচা—পাকা ছাঁটা গোঁফ, গলায় কণ্ঠি, এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ছোট একটি ব্যাগ। চরণ হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিলেন—’পাজী হতভাগা!’
চাটুজ্যে। তা হলে ছেলের খোঁজ পেয়েছ? দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।
চরণ। বকাটে মিথ্যুক ছুঁচো!
চাটুজ্যে। বিপত্তৌ মধুসূদনম, ভগবান রক্ষা করেছেন।
চরণ। ব্যাটা আমার লেখাপড়া শিখছেন!
বংশলোচন। চরণবাবু একটু শান্ত হন।
চাটুজ্যে। আরে রাগ পরে ক’রো এখন। খবর কি আগে বল।
চরণ। খবর আমার মাথা। এখন কলেজ বন্ধ, গুডফ্রাইডের ছুটি, কাত্তিক ক—দিন আমার কাছেই ছিল, আমরাও নিশ্চিন্ত, মজিলপুরে তো আর ছেলেধরার উপদ্রব নেই। কাল সকালে বললে—ফিলসফির খান—দুই বই বাঁটলোর কাছে রয়েছে, কলকাতায় গিয়ে নিয়ে আসি। আমি বললুম—যাবি আর আসবি, দুপুরের গাড়িতে ফিরে আসা চাই। বেলা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু কাত্তিক ফিরল না, রাত্রি কাবার হল তবু ছেলের খবর নেই। তার মা কান্নাকাটি শুরু করলেন, কারণ পরশু নাকি কলকাতায় তেষট্টিটা ছেলে চুরি গেছে। অগত্যা তোমায় একটা জরুরী তার করে দিলুম, তারপর বিকেলের গাড়িতে চলে এলুম। প্রথমেই গেলুম বাঁটলোদের ওখানে। তার ছোটভাই শাঁটলো বললে—বাঁটলো আর কাত্তিক কজন বন্ধুর সঙ্গে ওভারটুন হলে বক্তৃতা শুনতে গেছে। কিন্তু বাঁটলোর বোন বললে—শোনেন কেন, সব মিথ্যে কথা, বাবুরা অ্যাংলো—মোগলাই হোটেলে খেতে গেছেন, তারপর যাবেন সিনেমায়, তার পর অনেক রাত্রে ফিরে এসে দরজায় ধাককা লাগাবেন। হতভাগা, এই তোর ফিলসফির বই আনতে যাওয়া! এখন ছোঁড়াটাকে খুঁজে বার করি কি করে?
বিনোদ। খবর যখন পেয়েছেন তখন আর খোঁজবার দরকার কি। ছেলে কলকাতায় এসেছে একটু ফুর্তি করতে, যথাকালে বাড়ি যাবে।
চরণ। ফুর্তি বার করব। হতভাগা এখানে এসেছে ইয়ারকি দিতে, আর আমরা ভেবে মরছি। কান ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যাব। চাটুজ্যে, চল।
চাটুজ্যে। যাব কোথায়?
নগেন। ধর্মতলার মোড়ে অ্যাংলো—মোগলাই। ট্যাকসিতে চড়ে সোজা চলে যান দশ মিনিটে পৌঁছবেন।
চরণ ঘোষ ও চাটুজ্যে মহাশয় বাহির হইলেন।
অ্যাংলো—মোগলাই হোটেলটি ছোট কিন্তু সুবিখ্যাত। আলোয় গন্ধে কলরবে ভরপুর। খোপে খোপে নানা লোক খাইতেছে, কেহ একলা, কেহ সদলে। দরজার পাশে একটা ডেস্কের সামনে ম্যানেজার কখনও বসিয়া কখনও দাঁড়াইয়া চারিদিকে নজর রাখিতেছে এবং মাঝে মাঝে হাঁকিতেছে—তিন নম্বরে এক প্লেট কোর্মা, ছ নম্বরে দুটো চা, চারটে কাটলেট শিগগির, পাঁচ নম্বরে আরো দুটো ডেভিল ইত্যাদি।
চরণ ঘোষ ও চাটুজ্যে প্রবেশ করিলেন। চাটুজ্যে চুপি চুপি বলিলেন—’আস্তে, চেঁচিও না—ঐ যে বাবাজীরা ঐখানে খাচ্চেচন।’
চরণ ঘোষ নাক টিপিয়া বলিলেন—’রাঁধামাধব, এমন জায়গায় ভঁদ্রলোক আসে। য’তসব রাঁক্ষস জুটে অখাদ্য খাচ্ছে।’
চাটুজ্যে। আরে চুপ চুপ। বেচারাদের অপরাধ নেই, হাজার বছর ধরে শুনে এসেছে এটা খেয়ো না, ওঠা খেয়ো না। এখন যখন ভগবান সুবুদ্ধি আর সুবিধে দিয়েছেন তখন জন্মজন্মান্তরের অতৃপ্তি চটপট মিটিয়ে নিতে হবে। আহা, এদের ভোজন সার্থক হ’ক। এই যে এরা বাঘের মত গবগব করে খাচ্ছে সেই সঙ্গে যেন বাঘের সদগুণও কিছু পায়। এদের গায়ে গত্তি লাগুক, মনে সাহস হ’ক, খোঁচা দিলে যেন খ্যাঁক করে নির্ভয়ে তেড়ে যেতে পারে?
