সকাল বেলা হংসেশ্বর বললেন, দেখ বংশী, রাজমহিষীকে খাওয়াবার সময় তুমি আমার পিছনে থেকে প্রমট করবে, আমার সঙ্গে থাকলে তোমাকে গুঁতিয়ে দেবে না। আর একটা কথা—শুধু তুমি আর আমি থাকব, আর কেউ থাকলে আমি গাইতে পারব না।
বংশীধর বলল, ঠিক আছে, অন্য কারও থাকবার দরকারই নেই।
দু বালতি রাজভোগ বংশীধর রাজমহিষীর জন্যে বয়ে নিয়ে গেল, হংসেশ্বর তা গামলায় ঢেলে দিলেন। বংশীধর পিছনে গিয়ে বলল, কাকাবাবু, এইবার গানটা ধরুন।
মোষের পিঠে হাত বুলুতে বুলুতে হংসেশ্বর মধুর স্বরে বললেন ; লক্ষ্মী সোনা আমার, পেট ভরে খাও, নইলে গায়ে গত্তি লাগবে কেন, দুধ আসবে কেন, সেই মুলতানীটা যে তোমাকে হারিয়ে দেবে। হঁ হঁ হঁ—
সোনামুখী রাজভঁইসী পাগল করেছে,
জাদু করেছে রে হামায় টোনা করেছে—
মোষ ফোঁস করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। বংশীধর ফিসফিস করে বলল, থামবেন না কাকাবাবু, বেশ দরদ দিয়ে বারবার গাইতে থাকুন, শেষ লাইনের সুরে ভুল করবেন না, ঝমে ঝমে ঝঁয় ঝঁয় ঝমে ঝমে ঝঁয়—নিনি ধাপপা পা মা মাগগা গা রে সা।
তাল—মান—লয় ঠিক রেখে হংসেশ্বর তিনবার গানটা শেষ করলেন, তারপর চতুর্থবার ধরলেন—সোনামুখী রাজভঁইসী ইত্যাদি।
সহসা মোষ মাথা নামিয়ে গামলায় মুখ দিল। তারপর সেই নির্জন প্রাঙ্গণের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মৃদু মন্দ আওয়াজ উঠল—চবৎ চবৎ চবৎ। রাজমহিষী ভোজন করছেন।
পরবর্তী ঘটনাবলী সবিস্তারে বলবার দরকার নেই। পনরো দিনের মধ্যেই রাজমহিষীর বপু গজেন্দ্রাণীর তুল্য হল, গায়ে স্বল্প লোমের ফাঁকে ফাঁকে নিবিড় আলতা, কালির রঙ ফুটে উঠল, বিপুল পয়োধর থেকে প্রত্যহ পঁচিশ সের দুধ বেরুতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গ—গবাদি—পশু—প্রদর্শনীতে সে মহিম বাঁড়ুজ্যের মুলতানী এবং অন্যান্য প্রতিযোগিনীদের অনায়াসে হারিয়ে দিল। রাজ্যপাল তার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিলেন, কৃষিমন্ত্রী সন্তর্পণে এক ছড়া রজনীগন্ধার মালা তার গলায় পরিয়ে দিলেন। রাজমহিষী প্রসন্ন হয়ে সেই অর্ঘ্যটি গ্রহণ করে চিবুতে লাগল।
বংশীধরের নতুন আবদার শুনে হংসেশ্বর বললেন, আবার চাকরির শখ হল কেন? আমার বুকে বাঁশ দিয়ে তো যত পেরেছে বাগিয়ে নিয়েছ।
বংশীধর বলল, আজ্ঞে, একটা ভাল পোস্ট না পেলে সে আমার সেলফ—রেসপেক্ট থাকবে না। লোকে বলবে, ব্যাটা শ্বশুরের বিষয় পেয়ে নবাবি করছে।
১৮৭৯ শক (১৯৫৭)
(একটি ইংরেজি গল্পের প্লটের অনুসরণে। লেখকের নাম মনে নেই।)
রাতারাতি
শহরে আবার ছেলেধরা উপদ্রব শুরু হইয়াছে। বিকালে বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় তাহারই কথা হইতেছে। বংশলোচনের ভাগনে উদয় মহা উৎসাহে হাত নাড়িয়া বলিতেছিল—’আজকের খবর শুনেছেন? পঞ্চাশটা ছেলে হারিয়েছে। কাল পঁচাত্তরটা। কিন্তু আশ্চর্য এই, যারা নিরুদ্দেশ হচ্ছে তাদের নামধাম কেউ টের পায় না। এদিকে লোকে খেপে উঠেছে, মোটর গাড়ি পোড়াচ্ছে, রাস্তার মানুষকে ধ’রে ঠেঙাচ্ছে, পুলিশ কিছুই করতে পারছে না। ওঃ, হুলস্থূল ব্যাপার।’
বংশলোচনবাবু বলিলেন—’কাগজে কি লিখছে?’
তাঁহার শালা নগেন বলিল—’এই শুনুন না, আজকের ধূমকেতু খুব জোর লিখেছে।—আমরা জানিতে চাই দেশের এই অরাজক অবস্থার জন্য দায়ী কে? অজ্ঞ লোকে রটাইতেছে বালি ব্রিজের বনিয়াদ পোক্ত করিবার জন্য দশ হাজার ছেলে পুঁতিবে। বিজ্ঞ লোকে বলিতেছেন ছেলেরা সংসারে বীতরাগ হইয়া বানপ্রস্থ অবলম্বন করিতেছে। কাহার কথা বিশ্বাস করিব? দেশনেতৃগণ এখন দলাদলি বন্ধ রাখুন, গর্ভনমেণ্ট উঠিয়া পড়িয়া লাগুন, আমরা তারস্বরে প্রশ্ন করিতেছি, তাহার উত্তর দিন—কোন দুরাত্মা দেশমাতৃকাকে সন্তানহারা করিতেছে?’
বংশলোচনের ছোট ছেলে ঘেণ্টু বলিল—’বাবা, ছেলেধরা বাবা ধরে? বল না বাবা!’
উকিল বিনোদবাবু বলিলেন—’তেমন তেমন বাবা হ’লে ধরে বই কি। কিন্তু তুমি ভেবো না খোকা, আমরা রক্ষা করব।’
বৃদ্ধ কেদার চাটুজ্যে মহাশয় নিবিষ্ট হইয়া তামাক খাইতেছিল। নগেন তাঁহাকে বলিল—’চাটুজ্যেমশায়, আপনি সাবধানে চলাফেরা করবেন।’
বংশলোচন। উনি তো প্রবীণ লোক, ওঁকে ধরবে কেন?
নগেন। মনেও ভাববেন না তা। চ্যবনপ্রাশ খাইয়ে তরুণ বানাবে, তারপর চালান দেবে।
উদয় সভয়ে বলিল—’তরুণদেরই ধরছে বুঝি?’
চাটুজ্যে হুঁকা রাখিয়া বলিলেন—’উদো, তুই কি রকম লেখাপড়া শিখেছিস দেখি। জোয়ান যুবক আর তরুণ—এদের মধ্যে তফাত কি বল তো?’
উদয়। জোয়ান হচ্ছে যার গায়ে খুব জোর। যুবক মানে যুবা, যাকে বলে ইয়ং ম্যান। তরুণ হল গিয়ে মানে যাকে বলে—দাঁড়ান, অভিধান দেখে বলছি—
চাটুজ্যে। অভিধানে পাবি না, আজকাল মানে বদলে গেছে। আমি অনেক ভেবে চিন্তে যা বুঝেছি শোন। যার দাড়ি গোঁফ দু—ই আছে তিনি হলেন জোয়ান, যেমন রবিঠাকুর, পি. সি. রায়। যার দাড়ি নেই শুধুই গোঁফ তিনি যুবক, যেমন আশু মুখুজ্যে, গান্ধীজী। আর যার দাড়িও নেই গোঁফও নেই তিনি তরুণ, যেমন বঙ্কিম চাটুজ্যে, শরৎ চাটুজ্যে, আর কেদার চাটুজ্যে।
উদয়। আর আমি? নগেন মামা?
চাটুজ্যে। তোরা হলি ওই তিনের বার, যাকে বলে অপোগণ্ড। ধরতে হয় তোদেরই ধরবে।
উদয় চিন্তা করিয়া বলিল—’আমি দাড়ি রাখতুম, কিন্তু বউ বলে—’
নগেন। খবরদার উদো, ফের যদি বউ—এর কথা পাড়বি তো কান ম’লে দেব।
চাকর আসিয়া বংশলোচনের হাতে একটা টেলিগ্রাম দিয়া গেল। বংশলোচন দেখিয়া বলিলেন—’এ যে চাটুজ্যে মশায়ের নামে তার!’
