–আমাকে নাস্তিক হতে হবে নাকি?
-তার দরকার নেই। ভক্তিতে গদগদ হয়ে যত খুশি গুরুভজন করতে পার। ভক্তিচর্চার সঙ্গে মাৎস্য ন্যায়ের বা চুরি ডাকাতি মাতলামি ব্যভিচার ইত্যাদির কোনও বিরোধ নেই।
–তোমার মাৎস্য ফিলসফিতে নতুন কিছু তো দেখছি না।
—আরও বলছি শোন। কলেজে তোমার তো অঙ্কে বেশ মাথা ছিল। সম্ভাবনা-গণিত অর্থাৎ প্রবাবিলিটি মনে আছে?
–কিছু কিছু আছে।
–কলকাতার রাস্তায় যত লোক চলে তাদের মধ্যে জন কতক প্রতি বৎসরে অপঘাতে মারা যায়। সেজন্যে পথে হাঁটা ছেড়ে দিয়েছ কি?
-তা কেন ছাড়ব। বেশীর ভাগ লোকেই তো নিরাপদে যাতায়াত করে, অতি অল্প লোকেই মরে। আমার মরবার সম্ভাবনা খুবই কম।
-ঠিক কথা। যারা হাঁটে তাদের তুলনায় যারা মোটর রেল গাড়ি বা এয়ারোলেনে চড়ে তাদের অপঘাতের হার টের বেশী। প্রাণের ভয়ে এই সব বর্জন করতে বল কি?
–কেন বলব। লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে হয়তো দু-চার জন মারা যায়, কিন্তু তাতে ভয় পেলে চলে না।
–উত্তম কথা। বিনা টিকিটে যারা রেলে যাতায়াত করে তাদের কত জনের সাজা হয় জান?
–হয়তো লাখে এক জন ধরা পড়ে, দণ্ড যা দিতে হয় তাও খুব বেশী নয়। কাগজে পড়েছি, গত বৎসরে সাড়ে চার হাজার বার অকারণে শিকল টেনে ট্রেন থামানো হয়েছিল, কিন্তু খুব অল্প লোকেরই বোধ হয় সাজা হয়েছে।
—অতি সত্য কথা। বিনা টিকিটে রেলে চড়া, শিকল টেনে গাড়ি থামানো, গাড় আর স্টেশন মাস্টারকে ঠেঙানো খুব নিরাপদ কাজ, রিস্ক নগণ্য। পরীক্ষার প্রশ্ন পছন্দ না হলে ছাত্ররা দাঙ্গা করে, চেয়ার টেবিল ভাঙে। ফেল হলে মাস্টারকে ঠেঙায়। কত জনের সাজা হয়?
–বোধ হয় কারও হয় না।
–অর্থাৎ দাঙ্গা করা অতি নিরাপদ। ছেলেরা জানে তাদের পিছনে মা বাবা আছেন, ঠাকুমা আছেন, হরেক রকম দেশনেতাও আছেন। মন্ত্রীরাও কিছু করতে ভয় পান। ছেলেরা হচ্ছে শ্রীরামকৃষ্ণ কথিত বটুক ভৈরব, কার সাধ্য তাদের শাসন করে।
–কিন্তু এসব কাজে লাভ কতটুকু হয়?
—বিনা টিকিটে রেলে চড়লে কিছু, পয়সা বাঁচে। চেন টানলে, গার্ডকে মারলে বা স্কুল কলেজে দাঙ্গা করলে আর্থিক লাভ হয় না, কিন্তু বাহাদুরি দেখানো হয়, সেটাই মস্ত লাভ। আইন লঙ্ঘনে একটা অনির্বচনীয় আত্মতৃপ্তি আছে। আর্থিক লাভের হিসেব যদি চাও তবে পকেটমারদের খতিয়ান দেখ। হাজার বার পকেট মারলে হয়তো এক বার ধরা পড়ে। এক জনের না হয় সাজা হল, কিন্তু বাকী ন শ নিরেনব্বই জন তো বেঁচে গেল, তারা ভয় পেয়ে তাদের পেশা ছাড়ে না।
–আমাকে পকেটমার হতে বলছ নাকি?
না। এ কাজে রোজগার অবশ্য ভালই, কিন্তু ঝাঁকা মুটে রিকশওয়ালা কিংবা পকেটমারের কাজ তোমার মতন ভদ্রলোকের উপযুক্ত নয়। দৈবাৎ যদি ধরা পড় তবে আত্মীয় স্বজনের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না, তোমার পক্ষে তা মত্যুর বেশী। যারা খাবার জিনিসে বা ওষধে ভেজাল দেয়, কালোবাজার চালায়, ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, ঘুষ নেয়, মদ চোলাই করে, নোট বা পাসপোর্ট জাল করে, তবিল তসরপ করে, তাদের অপরাধ গুরতর, কিন্তু পকেটমারের চাইতে তারা ঢের বেশী রেস্পেকটেবল গণ্য হয়।
–আমাকে কি করতে হবে তাই স্পষ্ট করে বল।
–মাৎস্য ফিলসফিটা আর একটু বুঝে নাও। নিরাপত্তার বিপরীত অনুপাতে লাভের সম্ভাবনা। ধরা পড়া আর শান্তির সম্ভাবনা যত কম, লাভও তত কম। রিস্ক যত বেশী, লাভও তত বেশী। যে কাজে লাখে এক জন ধরা পড়ে তা প্রায় নিরাপদ, যেমন বিনা টিকিটে রেলে চড়া। সরকারী বিজ্ঞাপনে আছে, দক্ষিণপূর্ব রেলওয়ের প্রতি বৎসরে ষাট লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়। তার মানে, এই টাকাটা যাত্রীদের পকেটে যায়। তবে মাথা পিছু, লাভ অতির অল্প। যাতে দশ হাজারে এক জন ধরা পড়ে তাতেও রিস্ক বেশী নয়, লাভও মন্দ নয়, যেমন ঘুষ, ভেজাল, ট্যাক্স ফাঁকি। যাতে হাজারে এক জন ধরা পড়ে তাতে লাভ বেশ মোটা, যেমন মদ চোলাই, নোট জাল, ডাকাতি। আর যাতে শতকরা এক জন ধরা পড়ে তাতে প্রচুর লাভ, রিস্কও খুব, যেমন দলিল জাল, বিল তসরুপ। অনেক ধুরন্ধর ব্যবসাদার এই কাজ করে ফেঁপে উঠেছেন, আবার কেউ কেউ ফাঁদেও পড়েছেন।
–সব তো বুঝলম। এখন আমাকে করতে বল কি?
-একটু একটু করে ধাপে ধাপে সাধনা করতে হবে, ভয় ভাঙতে হবে। মুরব্বী অর্থাৎ পঠপোষকও সংগ্রহ করা দরকার, যাঁরা বিপদে রক্ষা করবেন। তুমি দিন কতক বিনা টিকিটে রেলে যাতায়াত কর, মনে সাহস আসবে। সুবিধে পেলেই গাড় আর স্টেশন মাস্টারকে ঠেঙাবে, অতি নিরাপদ কাজ। সরকার করণ ভাষায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন–ভাই সব, ভাড়া না দিলে রেলগাড়ি চলবে কি করে? ও তো তোমাদেরই জিনিস। রেল-কর্মচারীরা নির্দোষ, তাদের মেরো না। এই মিনতিতে কেউ কর্ণপাত করে না। আরও শোন— বিক্ষোভ দেখাবার জন্যে যত সব প্রসেশন বেরয় তাতে যোগ দিয়ে স্লোগান আওড়াবে, সুবিধা হলে দাঙ্গা বাধাবে, ইট ছুড়বে। এর ফলে তুমি এক জন লোকসেবক কেষ্টবিষ্ট হয়ে উঠবে, গণ্ডােচিত আত্মপ্রত্যয় লাভ করবে, প্রভাবশালী মরুব্বীদের সুনজরে পড়বে।
–তাঁরা আমার কোন উপকারটা করবেন?
–কি না করবেন? যদি ইলেকশনে সাহায্য কর, তোমার চেষ্টার ফলে যদি তাঁরা কৃতকার্য হন তবে কেনা গোলাম হয়ে থাকবেন, পুলিসও তোমাকে খাতির করবে।
–সংসার চলবে কি করে?
–আপাতত তোমাকে একটা খয়রাতী কাজ জুটিয়ে দেব, দুঃস্থ লোকদের সাহায্য করতে হবে। বরাদ্দ টাকার সিকি ভাগ দান করবে, সিকি ভাগ আত্মসাৎ করবে আর বাকী টাকা মাৎস্য সমাজের ফণ্ডে জমা দেবে। এ কাজে রিস্ক কিছুই নেই। কালোবাজার আর ঘুষের দালালিও উত্তম কাজ, তোমাকে তাও জুটিয়ে দেব। তার পর ভেজালওয়ালা আর চোলাইওয়ালাদের সঙ্গেও ভিড়িয়ে দেব। মনে বেশ সাহস এলে একটু আধটু দোকান লুট আর রাহাজানিও অভ্যাস করবে। তার পর তোমাকে আর শেখাবার দরকার হবে না, মাথা খুলে যাবে, বড় বড় অ্যাডভেঞ্চারে নামতে পারবে।
