আজ এই পর্যান্ত। আর একদিন এসে সব কথা তোমাদের ভাল করে বুঝিয়ে দেব। সভাভঙ্গের আগে সবাই সমস্বরে আওয়াজ তোল—স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক, লোকতন্ত্র জাহান্নামে যাক, ইয়ে আজাদী ঝুটা হৈ, হমারা দাদা মাঙ্গলিক, ভারত—মঙ্গল জিন্দাবাদ!
১৩৬২ (১৯৫৫)
মাৎস্য ন্যায়
বাজারের সামনে দিবাকরের সঙ্গে তার এককালের সহপাঠী গণপতির দেখা হল। গণপতি বলল, কি খবর দিব, আজকাল কি করছ? চেহারাটা খারাপ দেখছি কেন, কোনও অসুখ করেছে নাকি?
দিবাকর বলল, সিকি-পেটা খেলে চেহারা ভাল হতে পারে না। তিনটে ছেলেকে পড়িয়ে পঞ্চান্ন টাকা পাচ্ছি আর চাকরির খোঁজে ফ্যা ফ্যা করে বেড়াচ্ছি। নেহাত একটা বউ আছে, তিন বছরের একটা মেয়েও আছে, নয়তো সোজা পরলোকে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতুম।
দিবাকরের বুকে একটা আঙুল ঠেকিয়ে গণপতি বলল, ভাল রোজগার চাও? ভাল ভাল জিনিস খেতে চাও? শৌখিন জামা কাপড় চাও?
-কে না চায়।
-দেদার ফুর্তি চাও? নারীমাংস চাও?
-নারী একটা আছে, কিন্তু মাংস নেই, শুধুই হাড়।
-কোনও চিত্র নেই, সব ব্যবস্থা হবে। সাহস আছে? বীরভোগ্যা বসুন্ধরা জান তো? রিস্ক নিতে পারবে?
-টাকার যদি আশা থাকে তবে সাহসের অভাব হবে না, রিস্কও নিতে পারব। হেয়ালি ছেড়ে খোলসা করেই বল না। আমাকে করতে হবে কি? জুয়ো খেলতে বল নাকি?
-না। জুয়ো হল অকর্মণ্য বড়লোকের খেলা, তোমার মতন নিঃস্বের কম নয়। বেশ ভেবে চিন্তে বল–বিবেকের উপদ্রব আছে? নরকের ভয়? মিছে কথা বলতে বাধে? এসব থাকলে কিছুই হবে না বাপু।
একটু ভেবে দিবাকর বলল, স্বর্গ নরক মানি না, তবে ধর্ম ভয় একটু আছে, চিরকালের সংস্কার কিনা। দরকার হলে অল্প স্বল্প মিছে কথাও বলি, প্র্যাকটিস করলে হয়তো অনর্গল বলতে পারব। দারিদ্র্য আর সইতে পারি না, এখন মরিয়া হয়ে উঠেছি। বাঁচতে চাই, তার জন্যে শয়তানের গোলাম হতেও রাজী আছি।
দিবাকরের হাত ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গণপতি বলল, ঠিক আছে। শধ বাঁচলে চলবে না, জীবনটা পুরোপুরি ভোগ করতে হবে। আর একবার বল–বুকের পাটা আছে? বিপদকে অগ্রাহ্য করতে পারবে? ধর্মপী জুজুর ভয় ছাড়তে পারবে?
-সব পারব। কিন্তু তুমি তো শাস্ত্রচর্চা করে থাক, গীতাও আওড়াও, তোমার মুখে এসব কথা কেন?
-কৃষ্ণ অর্জনকে বলেছিলেন, সব ধর্ম ত্যাগ করে আমার শরণ নাও, যুদ্ধে লেগে যাও। যদি জয়ী হও তো পৃথিবী ভোগ করবে, যদি মর তো স্বর্গলাভ করবে। আমিও তোমাকে সেই রকম উপদেশ দিচ্ছি–সব ছেড়ে দিয়ে আমার বশে চল। যদি জীবনযুদ্ধে জয়ী হও তবে সব সুখ ভোগ করবে। আর যদি দৈবদুর্বিপাকে নিতান্তই হেরে গিয়ে জেলে যাও তবে বীরোচিত গতি লাভ করবে, তোমার দলের সবাই বাহবা দেবে। জেল থেকে ফিরে এসে পুনর্জন্ম পাবে, আবার উঠে পড়ে লাগবে। আজ সন্ধ্যার সময় আমার বাসায় এসো, পাঁচ নম্বর শেওড়াতলা লেন। আমি তোমাকে দীক্ষা দেব, সকল অভাব দূর করব, সর্বপাপেভ্যো রক্ষা করব।
দিবাকর বলল, বেশ, আজ সন্ধ্যায় দেখা করব।
সন্ধ্যাবেলা দিবাকর পাঁচ নম্বর শেওড়াতলা লেনে উপস্থিত হল। গণপতি অবিবাহিত, একটা চাকর নিয়ে একাই আছে। কি একটা খবরের কাগজে কাজ করে, জমি বাড়ি আর পুরনো মোটরের দালালিও করে। তার বসবার ঘরে একটা তক্তপোশের উপর শতরঞ্জি পাতা, দুটো তাকিয়া আর কতকগুলো পত্রপত্রিকা ছড়ানো। দেওয়ালে একটা র্যাকে কিছু বই আছে।
চাকরকে দু পেয়ালা চায়ের ফরমাশ দিয়ে গণপতি বলল, মাৎস্য সমাজের নাম শুনেছ? তোমাকে তার মেম্বার হতে হবে। ভয় নেই, প্রথম এক বৎসর চাঁদা দিতে হবে না।
দিবাকর বলল, মাৎস্য সমাজের কাজটা কি? ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে হয় নাকি? মৎস্য ধরিবে খাইবে সুখে–এই কি তোমার উপদেশ?
–সত্যিকারের মৎস্য নয়, মনুষ্যরূপী মৎস্যকে খাবলে খেতে হবে। মাৎস্য ন্যায় শুনেছ। মহাভারতে আছে —
নারাজকে জনপদে স্বকং ভবতি কস্যচিৎ।
মৎস্যা ইব জনা নিত্যং ভক্ষয়ন্তি পরস্পরম্।।
অর্থাৎ অরাজক জনপদে কারও নিজস্ব কিছু নেই, লোকে মংস্যের ন্যায় সর্বদা পরস্পরকে ভক্ষণ করে। এদেশে অবশ্য ঠিক অরাজক অবস্থা এখনও হয় নি, তবে মাৎস্য ন্যায়ের সূত্রপাত হয়েছে, পরস্পর ভক্ষণের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। এখানে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বা হারুন অল রসিদের নির্মম দণ্ডবিধি নেই, কমিউনিস্ট বা ফাসিস্টদের দুর্দান্ত শাসনও নেই, পাঁচ ভূতের লীলাখেলা চলছে। এরই সুযোগ আমরা মাৎস্য সমাজীরা নিয়ে থাকি।
–মাৎস্য সমাজের তুমি একজন কর্তা ব্যক্তি নাকি?
–আমি একজন কর্মী, হাঁপানির বেয়ারাম আছে তাই হাতে কলমে কাজ করতে পারি না, মুখের কথায় যতটুকু সম্ভব করি। বড় বড় মাতব্বর লোক হচ্ছেন এর নির্বাহসমিতির সভ্য, সভাপতি, সচিব আর উপসচিব। তাঁরা আত্মপ্রকাশ করেন না, আড়ালে থাকেন। আমি হচ্ছি মাৎস্য সংস্কৃতির একজন ব্যাখ্যাতা আর প্রচারক। যারা আমাদের সমাজে ঢুকতে চায় তাদের আমি যাচাই করি, বাজিয়ে দেখি। যদি দীক্ষার উপযুক্ত মনে হয় তবে মাৎস্য সমাজের ফিলসফিও তাদের বুঝিয়ে দিই।
-ফিলসফিটা কি রকম?
-গোটা কতক মূল সূত্র বলছি শোন।–জোর যার মুলুক তার। উদ্যোগী পুরুষসিংহ অর্থাৎ যোগাড়ে গণ্ডকে লক্ষ্মী বরণ করেন। দু-চার জন রোগা-পটকা গণ্ডা হাজার জন বলবান সজ্জনকে কাবু করতে পারে। দুর্জনরা একজোট হতে পারে কিন্তু সজ্জনরা পারে না, তারা কাপুরুষ, তাদের নীতি হচ্ছে, চাচা আপনা বাঁচা। মাৎস্য সমাজী জনসাধারণের উদ্দেশে বলে মানতে হবে, মানতে হবে, কিন্তু নিজের বেলায় বলে–মানব না, মানব না। পাপ পূণ্যে সব মিথ্যে, শুধু দেখতে হবে পুলিসে না ধরে, আর আত্মীয় বন্ধুরা বেশী না চটে।
