দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে দিবাকর বলল, রাজী আছি, আমাকে মাৎস্য সমাজের মেম্বার করে নাও।
গণপতি বলল, তোমার সমতি হয়েছে জেনে সুখী হলম। খয়রাতী কাজটা দিন তিনেকের মধ্যে পেয়ে যাবে। আপাতত এই এক শ টাকা হাওলাত নাও, মাস দুই পরে শোধ দিলেই চলবে। কালীধন। মণ্ডলের সঙ্গে তোমার আলাপ হওয়া দরকার, চৌকশ লোক, অনেক। রকম মতলব আর সাহায্য তার কাছে পাবে। কাল সন্ধ্যাবেলা আবার এখানে এসে, কালীধনও আসবে।
বাকরের নতুন জীবন আরম্ভ হল, বিচিত্র অভিজ্ঞতাও হতে লাগল। প্রথম প্রথম একটু বুক ধড়ফড় করত, কিন্তু তার পর সয়ে গেল। বছর দুই ভালই চলল, তার পর কালীধন এক দিন তাকে বলল, এ কিছুই হচ্ছে না দিব-দা, যা বলি শোন। সমাজের সব চাইতে বড় শত্র, হল ধনীদের মেয়েরা, তাদের গহনা যোগাবার জন্যেই বড়লোকরা গরিবদের শোষণ করে। সেকরার দোকান হচ্ছে প্রলোভনের আড়ত, মেয়েদের মাথা খাবার আস্তানা। তাই আমাদের ধংস করতে হবে।
দু দিন পরে সন্ধ্যার সময় খিদিরপরে একটা গহনার দোকান লুট হল। লুটের মাল নিয়ে কালীধন পালাল, কিন্তু দিবাকর ধরা পড়ল। সাজা হল দু বছর জেল। তার মুরব্বী বললেন, এহেহে, বড়ই কাঁচা কাজ করে ফেলেছ হে দিবাকর, এ বুদ্ধি তোমার কেন হল! ভেবো না, দু বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে, তার পর বেরিয়ে এসে নামটা বদলে ফেলবে আর খুব হশিয়ার হয়ে চলবে।
দু বছর পরে দিবাকর যখন খালাস হয়ে ফিরে এল তখন তার বউ আর মেয়ে বেচে নেই, সে বন্ধনহীন দায়িত্বহীন মক্তপুরুষ। নিজের নামটা বদলে সে রজনীকান্ত হল এবং অতি সতর্ক কঠোর সাধনার ফলে অল্প কালের মধ্যে মাৎস্য সমাজের শীর্ষে উঠল। এখন সে একজন রাঘব বোয়াল, সামান্য লোকের মত তাকে ‘সে’ বলা চলবে না, ‘তিনি’ বলতে হবে।
শ্রীরজনীকান্ত চৌধুরী এখন স্বহস্তে কোনও তুচ্ছ কম করেন না, চুরি ডাকাতি তবিল ভাঙা ইত্যাদির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগ নেই। গুণ্ডা বললে তাঁকে ছোট করা হয়। রাজার উপরে যেমন অধিরাজ, কতার উপরে যেমন অধিকত, রজনীকান্ত তেমনি অধিগণ্ডা, অর্থাৎ গুণ্ডাদের উপদেষ্টা নিয়ন্তা প্রতিপালক ও রক্ষক। ভূতপূর্ব গর, গণপতি এখন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারী। এক কালে যাঁরা মুরব্বী ছিলেন তাঁরাই এখন রজনীকান্তের সাহায্যের ভিখারী। তাঁর কৃপা
হলে ইলেকশনে জয়লাভ হয় না, উঁচুদরের দুষ্কর্ম নিবিঘে করা যায় না, আইনের জাল কেটে বেরিয়ে আসা যায় না। মিথ্যা প্রচারে কোনও জননেতাই তাঁর কাছে দাঁড়াতে পারেন না। রাম যদি শ্যামকে খুন করে তবে শ্রীরজনীকান্ত অম্লান বদনে ঘোষণা করেন যে শ্যামই রামুকে খুন করেছে। তিনি একটু অন্তরালে থাকলেও তাঁর মতন ক্ষমতাশালী লোক আর কেউ নেই। দেশনেতারা সকলেই নিজের নিজের দলে টানবার জন্যে তাঁকে সাধাসাধি করছেন।
যদু ডাক্তারের পেশেণ্ট
ক্যালকাটা ফিজিসার্জিক ক্লাবের সাপ্তাহিক সান্ধ্য বৈঠক বসেছে। আজ বক্তৃতা দিলেন ডাক্তার হরিশ চাকলাদার, এম ডি, এল আর সি পি, এম আর সি এস। মৃত্যুর লক্ষণ সম্বন্ধে তিনি অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা বললেন। চার—পাঁচ ঘণ্টা শ্বাস—রোধের পরেও আবার নিঃশ্বাস পড়ে, ফাঁসির পরেও কিছুক্ষণ হৃৎস্পন্দন চলতে থাকে। দুই হাত দুই পা কাটা গেলে এবং দেহের অর্ধেক রক্ত বেরিয়ে গেলেও মানুষ বাঁচতে পারে, ইত্যাদি। অতএব রাইগার মর্টিস না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রলালের ভাষায় কুঁকড়ে আড়ষ্ট হয়ে না গেলে একেবারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না।
বক্তৃতা শেষ হলে যথারীতি ধন্যবাদ দেওয়া হল, কেউ কেউ নানা রকম মন্তব্যও করলেন। বক্তার সহপাঠী ক্যাপ্টেন বেণী দত্ত বললেন, ওহে হরিশ, তুমি বড্ড হাতে রেখে বলেছ। আসল কথা হচ্ছে, ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা না হলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। শিবপুরের দশরথ কুণ্ডুর কথা শোন নি বুঝি? বুড়ো হাড়—কঞ্জুস, অগাধ টাকা, মরবার নামটি নেই। ছেলে রামচাঁদ হতাশ হয়ে পড়ল। অবশেষে একদিন বুড়ো মুখ থুবড়ে পড়ে গেল, নিঃশ্বাস বন্ধ হল, নাড়ী থামল, শরীর হিম হয়ে সিটকে গেল। ডাক্তার বললে, আর ভাবনা নেই রামচাঁদ, তোমার বাবা নিতান্তই মরেছেন। রামচাঁদ ঘটা করে বাপকে ঘাটে নিয়ে গেল, বিস্তর চন্দন কাঠ দিয়ে চিতা সাজালে, তার পর যেমন খড়ের নুড়ো জ্বেলে মুখাগ্নি করতে যাবে অমনি বুড়ো উঠে বসল। অ্যাঁ এসব কি?—বলেই ছেলের গালে এক চড়।
সবাই ভয়ে পালাল। বুড়ো গটগট করে বাড়ি ফিরে এসে ঘটককে ডাকিয়ে এনে বললে, রেমোকে ত্যাজ্যপুত্তুর করলুম, আমার জন্যে একটা পাত্রী দেখ।
সভাপতি ডাক্তার যদুনন্দন গড়গড়ি একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। এ’র বয়স এখন নব্বুই, শরীর ভালই আছে, তবে কানে একটু কম শোনেন আর মাঝে মাঝে খেয়াল দেখে আবোল—তাবোল বকেন। ইনি কোথায় ডাক্তারি শিখেছিলেন, কলকাতায় কি বোম্বাই—এ কি রেঙ্গুনে, তা লোকে জানে না। কেউ বলে, ইনি সেকেলে ভি এল এম এস। কেউ বলে ওসব কিছু নন, ইনি হচ্ছেন খাঁটী হ্যামার—ব্র্যাণ্ড, অর্থাৎ হাতুড়ে। নিন্দুকরা যাই বলুক এককালে এ’র অসংখ্য পেশেণ্ট ছিল, সাধারণ লোকে এঁকে খুব বড় সার্জেন মনে করত। প্রায় পঁচিশ বৎসর প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে ইনি এখন ধর্মকর্ম সাধুসঙ্গ আর শাস্ত্রচর্চা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ক্লাবের বাড়িটি ইনিই করে দিয়েছেন, সেজন্য কৃতজ্ঞ সদস্যগণ এঁকে আজীবন সভাপতি নির্বাচিত করেছেন। সকলেই এঁকে শ্রদ্ধা করেন, আবার আড়ালে ঠাট্টাও করেন।
